সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

“আমি তোমার জন্য এসেছি (পর্ব-তিন)

লং জার্নিতে সুন্দরী মহিলা পাশের সীটে থাকলে পুরুষরা সচরাচর এটেনশান এ থাকে- কিন্তু সেদিকে আরাফের খেয়াল নেই। ট্রেনে একজন ভিক্ষুক হরেক রকম গান গেয়ে ট্রেন যাত্রীদের মন আকৃষ্ট করতে ব্যস্ত, আরাফ পকেটে হাত দিয়ে দেখল খুরচা নেই তাই ১০ টাকা দিল। পাশেই অল্প বয়সী ১০-১২ বছরের একটা ছেলে শসা একপিচ ৫ টাকা হারে বিক্রি করছে, কেউ কেউ গরম থেকে বাঁচতে কিনে খাচ্ছে, এত চিৎকার চেঁচামেতির মাঝেও আরাফ ক্লান্ত মনকে বিশ্রামে পাঠিয়ে চোখ বন্ধ করলো।

ট্রেন আপন গন্তব্যে চলে যাচ্ছে, প্রিয়া হাঁটতে হাঁটতে বাসায় ফিরল, ততক্ষনে ট্রেনটাও প্রিয়ার শহর ত্যাগ করলো। প্রিয়া ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে পড়তে বসলো কিন্তু মন বসাতে পারল না।একটু অসময়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল, তারপর অল্পক্ষণেই গভীর ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেল।

রুমের লাইটের আলো জ্বলছে, মিরা দেখতো প্রিয়া ঘুমিয়ে পড়লো নাকি, মেয়েটার মনটা মনে হয় ভালো নেই, সেই বিকাল থেকে কেমন জানি শান্ত দেখাছে, অনেক বেশি চুপচাপ- আজাদ কথা শেষ না হতেই মিরা বললো-
সামনে পরীক্ষা প্রিয়া তা নিয়েই একটু চিন্তিত। মেম এর বাসা থেকে আসার সময় তেমনটাই বলছিলো।আচ্চা তুমি শুয়ে পড়, আমি মায়ের রুম থেকে আসছি। প্রেশারের ঔষধটা খেয়েছে কিনা চেক করে আসি।
মিরা শ্বাশুড়ীর রুমে গেল, আজাদ ভাবছে সত্যি ভাগ্য করে এমন স্ত্রী পাওয়া যায়, না হলে সৎ ভাবে বেঁচে থাকা যেত না। কোন বাড়তি চাহিদা না,অকারনে বায়না নেই, যা পায় তাতেই সুখি! পরিবারের সবার কত খেয়াল রাখে, ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ করলেন।

মিরা শ্বাশুড়ীর রুম হয়ে প্রিয়ার রুমে গেলেন, মেয়েটার জ্বরটা বেড়েছে কপালে হাত দিয়ে বুঝলেন কিছু করার নেই। পড়াশোনাটা অনেক পিচিয়ে গেছে, এবার এগুতে হবে।
তাই প্রিয়াকে মিরা চাপে রাখছে। প্রতিদিন ৪টা বিষয়ে প্রাইভেট, তারপর স্কুল, কোচিং মেয়েটা রিতিমতো হাঁপিয়ে উঠেছে। মিরা হাতের কাজ গুলো শেষ করে ঘুমাতে গেল দেখলো আজাদও ঘুমিয়ে পড়ছে।মিরা রুমের লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ল।

শিশির থাক বা না থাক- প্রতিটি সূর্যোদয় সুন্দর। ভেজা নীলচে কালো আকাশে সূর্যের দেখা পেলে যাদের মন ভালো হয় না, তাদের হয়ত মন’ই নেই। আজ তেমনি গা কাঁপানো বিশুদ্ধ বাতাস আর পাখির কুহু কুহু শব্দে আরাফের ঘুম ভাঙ্গল। সকালে গ্রামে রাস্তায় হাঁটছে মনটা একটু ভালো, নাহ আসলে মনটা অনেক ভালো।
আজাদ আঙ্কেলের কথা শুনার পর বাবা বলছে বিকালে ময়মনসিংহ হয়ে আজাদের সাথে দেখা করে রাতে ঢাকা ফিরবে। এই উছিলায় দু-চোখ ভরে একবার প্রিয়াকে দেখতে পারবে, সম্ভব হলে প্রিয়াকে তার মনের কথা জানাবে। বাকিটা আল্লাহ্ ভরসা।

ঠান্ডা মমতাময়ী একটা হাতের স্পর্শে আজাদের ঘুম ভাঙ্গল। চোখ খুলে দেখেই বলল, মা তুমি!
হ্যাঁ বাবা জ্বরটা কমেছে..?
রাতে ঔষধ খেয়েছিলাম এখন শরীরটা ভালো লাগছে।
মিরা…. ও মিরা…. প্রিয়ার ঘুম ভেঙ্গেছে কি না দেখতো,

আব্বু তোমরা শুধু টেনশন করো আমি ঠিক আছি বলতে বলতে খালি পায়ে হেঁটেই প্রিয়া বাবার বিছানায় উঠে বসলো।

ও প্রিয়া তোমাকে আরাফ খোঁজছিলো বললেন দাদুমনি,
প্রিয়া খুশিতে উজ্জল চোখে বললো, কখন দাদুমনি..?
-সেইতো, ও ফিরে যাবার আগে এসেছিলো।
তুমি আমাকে ডাকলেনা কেন.?
-আরে তুমি তখন মেম এর কাছে প্রাইভেটে ছিলে।
প্রিয়া মন খারাপ করে বললো ওহ্ আচ্ছা, তবে মনে মনে খুশি হলো এই ভেবে যে, গুন্ডাটা আমাকে মিস করছিলো।
প্রিয়া টেবিলে খাবার রেডি বাবা, দাদুকে নিয়ে খেতে আস বাবা আজ স্কুলে যাবে না, হালকা জ্বর, আমি তোমাকে স্কুলে দিয়ে আসবো।

বাইরে চিৎকরের আওয়াজ, আজাদ সাহেব বলে কেউ ডাকছে, আজাদ বিছানা ছেড়ে উঠতে যাবে মিরা ওকে টেবিলে খেতে বসতে ইশারা করে রুম থেকে বের হলো-
-কি হয়েছে..?
জ্বী, ভাবি আপনি কেন আজাদ সাহেব বাসায় নেই..?
-জ্বী, প্রিয়ার বাবার একটু জ্বর শুয়ে আছে।
ওহ্ একটু দরকার ছিলো, আজাদ সাহেবের বিল্ডিং এর কাজ চলছে, স্যার আবার এখানের সব দ্বায়ীত্ব আজাদ সাহেবের উপর দিয়ে রেখেছেন, তিনি না থাকলে জায়গাটা মাপা যাচ্ছে না বুঝেনই-তো ভাবি। মানুষ সন্তানের চেয়ে সম্পদের মূল্যায়ন বেশি করে, কেউ এক ইঞ্চি জায়গা ছাড় দিতে নারাজ।
জমি মাপার জন্য সাবরেজিস্টার অফিস থেকে লোক আসছে।
-ওহ্, আচ্ছা আপনি যান প্রিয়ার বাবা যাবে, লোক গুলো চলে গেল।

বাইরে কোন সমস্যা আজাদ জানতে চাইল, দরজা লাগাতে লাগাতে মিরা বললো- আরাফদের জায়গাটা’ বলতেই মা (শ্বাশুড়ী) বললেন বউমা কি হয়েছে..?
ওনি আবার হাই প্রেশারের রোগী তাই মিরা শান্ত ভাবে বললেন তেমন কিছু না মা, আরাফদের বিল্ডিং কাজ হচ্ছে সেটার মাপ ঠিক আছে কিনা দেখার জন্য সবাই ওখানে হাজির হয়েছে, তাই আরাফদের পক্ষ থেকে প্রিয়ার বাবার উপস্থিতি সবাই কামনা করছে।
ওহ্ তাই বলো তোমরা খেতে বসো আমার ওখানে যাওয়াটা খুব দরকার। বলেই আজাদ রুম থেকে বের হয়ে গেল, প্রিয়া দাদুমনির সাথে টেবিলে খেতে বসল।

আরাফ গ্রামে এসেও দেখছে সবাই অনেক ভালো বড় ভাইয়া কলেজে ভর্তি হওয়ার পর ওরা ঢাকায় পাড়ি জমায় স্কুল ছুটিতে নানার বাসায় বেড়ানো হয়েছে গ্রামে আসা হয়নি। ফসল তুলার সময় মা,বড় ভাবি আসতেন, ওদের আসা হতো না। বড় হওয়ার পর এই প্রথম গ্রামে আসা- তাই সবার ভালোবাসা অনেক বেশি পাচ্ছে, আরাফ বাবার পাশেই খেতে বসল,দুই চাচা,চাচী,ভাই বোন সবাই একসাথে খেতে বসল। যৌথ পরিবার বলতে যা বুঝায়, আরাফ মজাদার সব খাবার খেল।
আরাফ বুঝল গ্রামের মানুষ গুলো সহজ-সরল হতে পারে তবে লোভী না, এরা প্রাণ ভরে অন্যকে ভালোবাসতে জানে আরাফ বাবা – চাচাদের সাথে জমি নিয়ে আলোচনায় যোগ দিল। সামনে পান সুপারির বাটা, আরাফ অল্প পান মুখে দিল, ভিষণ ঝাল.. থুক করে ফেলে দিল।
ইশশ সবাই কেমন মজা করে চিবুচ্ছে- ভাবছে আরাফ।

সকালে গড়িয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে আরাফ ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওনা হলো, রাস্তায় কিছুক্ষন দাঁড়াতেই রিক্সা পেয়ে গেল। রাস্তার দু-পাশে সরষে ক্ষেত, দারুন প্রকৃতি। রাস্তার পাশেই মাঠ, চিকচিকে রোদে উঠতি বয়সী ছেলের দল ক্রিকেট খেলায় ব্যস্ত। মাঠের পাশে একজন কৃষক দাঁড়িয়ে আছে, তার সামনেই বিশাল সিং ওয়ালা একটা ঘন কালো রংয়ের গরু ঘাস খাচ্ছে।
আরাফ ভারছে প্রিয়া নিশ্চয় প্রাইভেট পড়তে গিয়েছে, আমরা সন্ধ্যার পর পরেই যাব- তখন প্রিয়া বাসায় থাকবে। আজ দেখা হবেই, ভাবতে ভালো লাগছে।
হঠাৎ স্যার নামুন, সামনে বাস স্টেশন ওই যে বাস দাঁড়িয়ে। আরাফ প্যান্টের পকেটে হাত দিল ততক্ষনে আরাফের বাবা রিক্সা ভাড়া মিটিয়ে সামনে এগুলো আরাফ চুপচাপ বাবার পথ অনুসরন করলো। বাস পুরাই খালি কয়েকজন বসে আছে আরাফ বাবার সাথে পাশাপাশি সিটে বসল, কিছুক্ষের মধ্যেই বাস ছেড়ে গেল, আরাফ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।
আকাশের দিকে চেয়ে থাকে খন্ড খন্ড মেঘের দল স্থান পরিবর্তন করে চলছে, আরাফ দু-চোখ ভরে তা অবলোকন করছে। ভাবছে কেমন তাদের সখ্যতা, মেঘের সাথে হাওয়া ভেসে বেড়ায়।

মিরা শোনছো..? আমার ফোনটা বাজছে একটু এনে দাও না প্লী…জ- আল্লাদের সুরে বললো আজাদ।
বুড়ো বয়সে আর এসব বলতে হবে না, বলেই মিরা মোবাইলটা এগিয়ে দিল,
-স্যার আসসালামু আলাইকুম।
জ্বী স্যার।
সব ঠিক আছে।
জ্বী, কোন সমস্যা নেই।
জ্বী, আলহামদুলিল্লাহ্ আম্মা ভালো আছেন।
ওহ্, আপনি আমাদের এখানে আসছেন খুব ভালো তো।
আসতে রাত হবে?
কোন সমস্যা নেই, আপনি কোন চিন্তা করবেন না। আমি এখানে সব ম্যানেজ করবো।
আচ্ছা, আল্লাহ্ হাফেজ।

বউমা, (শাশুড়ী) মায়ের ডাক- কে ফোন দিল,
-মা আরাফের বাবা মানে স্যার কল দিয়েছিলেন। আরাফকে নিয়ে আসতেছে। বাসার কাজ কতদূর হলো সেটা দেখার জন্য। রাতে আমাদের বাসায় খাবেন বললো আজাদ।

মম তোমার কাজ বেড়ে গেল- আরাফ ভাইয়া, আঙ্কেল বাসায় আসতেছে রাতে খাবে হি হি হি হি।
– প্রিয়া থামো তোমার মা মেহমান দেখে ভয় পায় না। রান্নাটা আমি শখের বসেই করি- বলেই কিচেনে ঢুকলেন মিরা।
আমি কি এক কাপ চা পেতে পারি ? যদি সম্ভব হয় বলে আজাদ সাহেব টিভির রিমোট হাতে নিলেন,

বউমা আমাকেও দিও –

হি হি হি হি হি দাদুমনি
মনে হচ্ছে আজ দুপুরে বাসায় ভাত রান্না হয়নি, সবাই চা খেতে চাচ্ছো।

আজাদ সাহেব হা হা হা হা মেয়ের মুখের হাসি দেখে তিনিও খুশি,
মিরা হাসতে হাসতে- চা বসাতে গেলাম, বলেই পাগলি একটা।

দাদুমনি প্রিয়ার হাতটা টেনে ধরে বললো, বুঝলাম! আমরা দুপুরে খাবার কম খেয়েছি বলে চা চেয়েছি- কিন্তু আমার সোনাদাদুটার এত হাসির কারন কি..!?
প্রিয়া দাদুমনির নাকের সাথে নাকটা ঘষা দিয়ে বললো কিছু না…!
কিন্তু দাদুমনি বুঝলো আরাফ আসবে বলেই প্রিয়ার মন ভালো। যাইহোক দাদুমনিও খুশি আরাফ আসবে বলে। কারন দুদিনের পরিচয় তিনি আরাফকে আপন নাতীন ভেবে নিয়েছেন।

এই দিনেও আবার বৃষ্টি, সবাই জানালা আটকিয়ে দেন বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে বাসের হেলপার এর চিৎকারে আরাফের বাবা জানালাটা লাগিয়ে দিল, আরাফ বাচ্চাদের মতো বাবার কাঁধে মাথা রাখলো, পরম মমতায় বাবা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।

মিরা সবাইকে চা দিয়ে কিচনে সবজি কাটছিলেন, পিছন থেকে জড়িয়ে ধরাতে বুঝতে পারল প্রিয়া আজ প্রাইভেটে যেতে চায় না।
-মম
বলো,
-আজ তোমার ব্যস্ততা,আব্বু অসুস্থ, প্রাইভেটে কে নিয়ে যাবে..? আমারও না শরীরটা ভালো লাগছে না, বাসায় বসেই পড়াশোনা করবো।
আচ্ছা যাও, এখন পড়তে বসতে হবে না, দাদু,বাবার কাছ থেকে চায়ের কাপ গুলো কিচেনে দিয়ে যাও আর মেহমান আসবে বিছানা গুলো গোছিয়ে রাখ।
-লক্ষ্মী মা আমার, তুমি পৃথিবীর সেরা মা, বলেই মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো প্রিয়া।
মেয়ের কপালে একটা চুমু দিয়ে আদর করলেন মা- শরীরে জ্বর নেই, তবু একটা দিন মেয়েকে পড়াশোনা থেকে ছুটি দিলেন।
আজাদ ঘুমিয়ে পড়ছে, মিরার রান্না প্রায় শেষ, ঘড়িতে চেয়ে দেখল সন্ধ্যা ৬টা বাজে। হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠল প্রিয়া দেখ তো দরজায় কে আসছে দাদুমনি ডাকল…?
প্রিয়া যেন তৈরী ছিলো দরজা খোলার জন্য, দশ সেকেন্ডের ও কম সময়ে প্রিয়া দরজা খুলল…

…চলবে।

৪৬৮জন ২৬৭জন
135 Shares

১৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য