“আমি তোমার জন্য এসেছি -(পর্ব- ঊনত্রিশ)

আকরাম সাহেবকে নিয়ে কয়েকজন বার্থরুমে প্রবেশ করলো মানুষের ভিড় ঠেলে মিরা, প্রিয়া, আজাদ ভিতরে ঢুকলো। মনোয়ারাকে দেখে আজাদ চিৎকার করে বললো ভাবি আমাকে আরো আগে কেন কিছু জানালেন না!

চোখের দেখাটা একবার দেখতে পারতাম।

এখন তো সব শেষ মিরা শান্ত করার চেষ্টা করলো না, কাঁদুক মনের কষ্ট কমবে বলেই মিরা আঁচলে চোখ মুছল।

প্রিয়া আকরামের পায়ের কাছে বসে কি জানি ভাবতে লাগলো। চোখে থেকে অনবরত পানি পড়ছে কি বলবে প্রিয়া জানে না, ক্ষমা চাওয়ার ভাষা জানা নেই শুধু কেঁদেই চলল।

প্রিয়ার চোখে ভেসে উঠল পুরনো দিনের স্মৃতি আরাফের প্রিয়ার বিয়ের জন্য কত আশা করছিলেন। কিন্তু প্রিয়ার পড়াশোনা, বাল্যবিবাহ্, অবুঝ প্রিয়ার বিয়েতে অমত সব মিলিয়ে বিয়েটা হয়নি।

আজ প্রিয়ার সব মনে পড়লো নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিলো না চুপচাপ রুমের এক সাথে বসে রইল।

আরাফ আসছে সে দেখতে পেল না সারা বাড়িতে মনে হচ্ছে কান্নার প্রতিযোগীতা চলছে কে কত বেশি করুন ভাবে কাঁদতে পারে। কিছুক্ষনের মধ্যেই বাড়ি থেকে হৈ চৈ কান্নার আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল আকরাম সাহেবকে নিয়ে গাড়িটা গ্রামের উদ্দেশ্য রওনা হবে।

মনোয়ারা আরাফকে ডাকল আমি চাই ওনি এ বাড়িতেই থাকুন। আমাকে না দেখে তো একদিনও বাঁচতে পারতেন না গ্রামে এতদূরে থাকবেন কি করে.?

এ বাড়িতে আমার কাছেইরাখ আমি যে তাকে বড্ড ভালোবাসি! তাকে ছেড়ে থাকবো কি রে..!

বলেও আবার জ্ঞান হারালেন।

আরাফ, আরমান, সায়মন,আরাফাত সবার মত নিয়ে বাসার নিচে বাগানের পিচনে মনোয়ারার জানালার পাশেই একটু দূরে আকরামরের জন্য বিছানা রেডি করা হলো।

আকরাম সাহেব মনোয়ারা প্রায় ৩০ বছরে ঢাকা শহরে বসবাস শুরু করছেন, সবাই পরিচিত হয়ে গেছে।  সেখানে হাজার মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে  চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন স্কুল শিক্ষিক,সনামধন্য ব্যবসায়ী আকরাম সাহেব।

রাতের গভীরতা চারদিন নিস্তবতা সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত, আত্মীয় স্বজনরা সবাই একে একে বিদায় নিল। আজাদ,মিরাও রাতের বাসে ময়মনসিংহে ফিরবে বলে মনোয়ারার কাছে বিদায় নিতে গেল। মা বয়স্ক মানুষ বাসায় একা, আমাদের রাতেই ফিরতে হবে বড় ভাবী।

ওই বাড়িতে সবাই প্রিয়াকে চিনে কারন আরাফ তাকে ভালোবাসত এটা সবাই জানতো। আরমানের স্ত্রী রিতাসহ বাড়ির সবাই রাতটা থেকে যেতে জোর করলো দাদুমনির জন্য ফিরতে হলো। বড় ভাবি অনেক জোর করলো প্রিয়া এখানে থাকুক কয়েকদিন পর যাবে আজাদের মত থাকলেও মিরা বললেন না।

মা প্রিয়াকে কাছে না পেলে অসুস্থ হয়ে যাবেন যদিও আরাফের সাথে প্রিয়ার একবার দেখা করার ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু মায়ের অনিইচ্ছায় থাকতে পারল না রাতেই রওনা হলো।

মা অনেক দিন তো হলো এবার আমাকে যেতে দাও। আচ্চা যাও আমি মরলে কবরে শেষ মাটি টুকু দিতে এসো বলেই বাচ্চাদের মতো কাঁদতে শুরু করলেন মনোয়ারা।

মা মা কাঁদছো কেন বলেই আরাফ মনোয়াকে জড়িয়ে ধরলো,মা আমি কথা দিয়েছি তো বছর খানেক পর জাপানের ব্যবসাটা রিহানের হাতে দিয়ে ওখানকার সব কাজ শেষ করে। খুব তাড়াতাড়ি বাংলাদেশে ফিরে আসবো, এবার হাসো তো মা যাবার আগে তোমার হাসি মুখটা দেখে যেতে চাই।

মনোয়ারা থেকে বিদায় নিয়ে আরাফ চলে গেল জাপানে। মনোয়ারা একা হয়ে পড়ে সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রহিমার মেয়েকে নিয়েই কাটে মনোয়ারার সারাদিন মেয়েটার বয়স ৩ বছর হলো একটু একটু ভাঙ্গা ভাঙ্গা কথা বলতে শিখছে রহিমা এ বাড়িতে কাজে আসার পর বাপে আর খোঁজ নেয়নি আকরাম সাহেব বিয়ে দিয়েছেন।

ছেলেটা ভালো আগে ঢাকায় রিক্সা চালাত বিয়ের পর এবাড়িতেই থাকে বাজার করে বাগানের দেখাশোনা করে। আর রহিমা রান্নার কাজ করে, মনোয়ারাকে দেখে রাখে বিনিময়ে প্রয়োজনীয় সব পায়। ব্যাংকে প্রতিমাসে রহিমার নামে আরাফ ৫হাজার টাকা জমা রাখে ভবিষ্যৎ রহিমার মেয়েটার লেখাপড়ার খরচ হিসাবে।

কয়েক বছর পর প্রিয়া এখন অনার্স পড়াশোনা করে দেখতে বেশ সুন্দর হয়ে উঠে। চারদিক দিকে বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করে প্রিয়া রাজি হয় না। মাস্টার্স শেষ করে একটা ভালো চাকরি নিবে তারপর বিয়ে নিয়ে ভাববে মা বাবাও তাই চায়।

একদিন বিকালে প্রিয়া মায়ের হাতে ডাইরিটা দেয় পড় মম,

মিরা দেখে আরাফের লেখা-…

স্নেহের পিচ্চি প্রিয়া।

কেমন আছো…..

…….

……..

……

ইতি তোমার গুন্ডা ছেলে (আরিয়ান চৌধুরী আরাফ)

চিরকুটটা পড়ে মিরার চোখে পানি চলে আসে হাত দিয়ে চোখ মুছে সে প্রিয়া! এত বছর পর এটা বের করলে কেন.?

মম! আমি প্রায়েই গভীর রাতে লেখাটা পড়ি ৪ বছর আগে যদি পড়তাম হয়ত একটু হলেও বুজতে  পারতাম বলেই কাঁদতে থাকে।

-নাম্বারটায় একবার কল দিও যদি সময় পাও।

-মম দু-বছরে ২০০ বার ট্রাই করছি বন্ধ দেখায়।

-ওহ্।

হয়ত বাইরে যাবার আগে এই জিপি নাম্বারটা ব্যবহার করত। জাপানে গিয়ে নতুন সীম নিয়েছে তাই বন্ধ দেখায়।

-প্রিয়া মন খারাপ করে বসে থাকে, মিরা মেয়ের মন ভালো করতে আরাফের সাথে ঘটে যাওয়া ৭ বছর আগের সব ঘটনা প্রিয়াকে শোনায়।

-প্রিয়ার চোখ থেকে অনবরত পানি ঝরতে থাকে।

-মম আমি তো সেদিন অবুঝ ছিলাম, তাই এতকিছু ঘটে গেল। আমার বোকামির জন্য সবাই কষ্ট পেল। নিজের নির্বোধহীনতার জন্য প্রিয়া খুব অনুতপ্ত হয়।

মায়ের কাছে, দাদুমনির কাছে, বাবার কাছে আরাফের গল্প শুনে।

গুন্ডা ছেলেটার প্রতি শ্রদ্ধাটা বেড়ে যায়, মনের ভিতর আরাফের জন্য ভালোবাসা অনুভব করে। আরাফকে হারিয়ে খোঁজে কিন্তু আরাফের ভালোবাসা বুঝতে প্রিয়া অনেক বেশি দেরি করে ফেলছে। এটা ভেবে নিজেকে ধিক্কার দেয়….!

…….চলবে।

১৮৩জন ৯৮জন
0 Shares

১১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ