আমি তোমার জন্য এসেছি (পর্ব-চব্বিশ)

 

– জানি না দাদাভাই। বউমা প্রিয়ার স্কুল কখন ছুটি হবে, আরাফ জানতে চেয়েছে.?

-মা, প্রিয়ার স্কুল ছুটি হবে বিকাল ৪ টায়।

আরাফের দেয়াল ঘড়িতে চোখ পড়ল সময় ১.৩০ মিনিট আরো প্রায়২.৩০মিনিট বাকি। মিরার কথা শোনে আরাফের মনটা খারাপ হয়ে গেল। ওহ্ তাহলে আমার সাথে আজ প্রিয়ার দেখা হবে না, আমাকে রাতেই ঢাকা ফিরতে হবে।

একদম না তোমার আঙ্কেলের সাথে দেখা না করে গেলে ওনি কষ্ট পাবেন। আর প্রিয়াকে তো চেন, পাগলিটা রাগ করে বসে থাকবে আর কথা বলবে না বলেই হাসলো মিরা।

 

-না আন্টি একটা খাতা দেন আমি পিচ্চিটাকে একটা চিরকুট লিখে রেখে যাই। তাহলে আর রাগ করবে না, মিরা প্রিয়ার রুমে গেল একটা ডাইরি হাতে ফিরে আসলো….

 

স্নেহের প্রিয়া।

কেমন আছো পিচ্চি?

…….!

………..!

………….!

 

স্কুল থেকেই প্রিয়া দাদুমনির কাছে জানতে পারল আরাফ আসছিলো।

কথাটা শোনে যতটা খুশি হলো ততটাই কষ্ট পেল। অভিমানে বললো আমার জন্য একটু অপেক্ষা করলে কি এমন ক্ষতি হতো! ভাবতে ভাবতে প্রিয়ার চোখে পানি চলে আসলো, সে বুঝতে পারল না এটা ভালোবাসা না বন্ধুত্বের অভিমান গুন্ডা ছেলেটার প্রতি!!

 

আজাদ রাতে বাসায় ফিরেই জানলো আরাফ আসছিলো দেখা হয়নি বলে খুব আফসোস করলো। মিরা কাজের ব্যস্ততায় প্রিয়াকে চিরকুট লেখা আরাফের ডাইরি কথা একদম ভুলে গেল। আরাফের সাথে আর প্রিয়ার কথা হয়নি এদিকে আরাফ প্রতিদিন অপেক্ষা করে এই বুঝি প্রিয়ার কল আসবে..!

 

অনেকদিন পর স্কুল মিরার প্রিয়ার বই গোছাতে টেবিলে যায় হঠাৎ আকাশি রঙ এর ডাইরিটা চোখে পড়ে।

সাথে সাথে মনে পড়ে প্রিয়াকে লেখা ডাইরিতে আরাফের চিঠির  কথা, প্রিয়া!  প্রিয়া বলে প্রিয়ার হাতে ডাইরিটা তুলে দেন। সেদিন যখন

আরাফ আমাদের বাসায় আসছিলো তুমি স্কুলে ছিলে তখনি আরাফ তোমাকে এই ডাইরিতে কি জানি লিখে গিয়েছিলো।

 

প্রিয়া ডাইরিটা হাতে নিল এখনি খোলবে কিনা ভাবতে লাগলো! আচ্চা মম পড়াটা শেষ করে নেই! পরে দেখব।

আচ্চা পরে দেখে নিও! আমি কাজে গেলাম বলেই মিরা চলে আসলো। প্রিয়া ডাইরি বা চিরকুটের ব্যাপারট নিয়ে খুব বেশি ভাবে না কারন সবার আগে তার পড়াশোনা। জীবনে প্রতিষ্টিত হওয়া বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান হিসাবে তাদের স্বপ্ন পূরন করার পর অন্যকিছু নিয়ে ভাববে।

 

আকরাম সাহেবের ছেলেরা সবাই বিয়ে করেছে সবার ছোট আরাফের বিয়েটা বাকি! কিন্তু আরাফের মতামত না পেয়ে আপাতত সবাই বিয়ে নিয়ে কিছু বলছে না।অনেক বছর পর আরাফ পুরনো ক্যাম্পাস,পুরনো শিক্ষাঙ্গনের আঙিনায়, পরিচিত সবকিছু, প্রিয় চিরচেনা জায়গা ঢাকা ইউভার্সটিতে আসলো।

 

তার কলেজের একটা কাজে ভিতরে গিয়ে পুরনো স্যারদের সাথে কথা বলে আবেগে আপ্লুত হলো, আরাফকে কাছে পেয়ে সবাই খুব খুশি।

পুরনো ক্লাসমেন্টরা কে কোথায় আছে সে কথাও স্যারদের সাথে শেয়ার করে আরাফ স্মৃতিচারনে সবাই মুগ্ধ হয়। তারপর কাজ শেষ করে সবার কাছে বিদায় নিয়ে আরাফ কলেজ থেকে বেরিয়ে আসল রাস্তায়।

 

হাঁটতে হাঁটতে পাশের পরিচিত একটা কন্ঠস্বর শুনে ফিরে তাকাল আরে!!

-রাহাত না! হ্যাঁ রাহাতেই তো।

কেমন আছিস দোস্ত..

-কে? ফিরে দেখল লোকটা।

ও দোস্ত বলেই বুকে জড়িয়ে ধরল কত বছর পর দেখা।

-আমি ভালো আছি দোস্ত তুই কেমন আছিস আরাফ.?

-ভালো।

-তোর কি খবর রাহাত..?

চলছে জীবন জীবনের গতিতে।

-তুই.?

-বেশ ভালোই আছি।

-জাপান থেকে কবে ফিরলে দেশে।

-এই তো ৪ বছর হলো, কিছুদিনের জন্যই আবার জাপান চলে যাব বললো আরাফ।

 

-আরাফ হাতের ঘড়িটা চেয়ে দেখল, পৌনে দুটো বাজে। রাহাত ‘চল দোস্ত পরে কথা বলবো তার আগে চল ক্যান্টিন থেকে খেয়ে নেই।

-নারে দোস্ত আজ আর খাব না! বাসায় ফিরে মায়ের হাতের রান্না খাব।

-প্রতিদিন তো মায়ের সাথেই খাস আজ বন্ধুর সাথে খাবে চল।

 

দু’জনেই বের হল ক্যান্টিনের উদ্দেশ্যে ওখানেই দুজনে লাঞ্চ করলো অনেকদিন পর পেট ভরে খেল রাহাত। কিন্তু! সংসারের অভাবের কথাটা আরাফকে বলতে পারে নাই। যে ঘরে দুপুরে চাল নেই মা হয়ত এক গ্লাস পানি খেয়েই দিন পার করে দিবেন। রাহাত রাতে কোন একটা ব্যবস্থা করতে পারলেই রাতের খাবার জন্য কিছু পেটে পড়বে।

 

হাঁটতে হাঁটতে ওরা রোকেয়া হলের সম্মুখে পৌঁছল। একটা ইতালি হোটেলের সম্মুখের বেঞ্চে পশ্চিম মুখী  হয়ে বসল আরাফ ও রাহাত! দু’জনে দু’ কাপ চা পান করতে করতে আরাফ জানতে চাইল।

– রাহাত তোর কি খবর নিজের কথা বলতে গিয়ে তোর কিছুই জানা হলো ন। আচ্ছা চাকরির জন্য চেষ্টা করিস না!

-করি তো দোস্ত কিন্তু আমার মামা চাচা নেই বলে, চাকরি হয়না।

বাবা মারা যাবার পর জমি বিক্রি করে দু’বোনের বিয়ে দিয়েছি মাকে নিয়েই আমার সংসার বলেই মন খারাপ করলো রাহাত।

 

বলিশ কি! তুই এত মেধাবী ছাত্র ছিলি তারপরও এখনো বেকার

-আচ্ছা তুই ব্যবসা করবি.? -দোস্ত ব্যবসা করলেও টাকার দরকার আমি এত টাকা কোথায় পাব বল? তুই তো আমার অবস্থা জানিস নুন আনতে পানতা ফুরাত।

-শোন তোর কিছুই লাগবে না আমার দুটো ব্যব্যসা আছে একটা ব্যবসার দেখাশোনা তুই করবি। লাভ যা আসবে দুজনেই ভাগ করে নিব।

 

আরাফের কথা শুনে রাহাতের চোখে পানি চলে আসল।

-দোস্ত সারাজীবন তোর সাহায্য নিয়ে পড়াশোনা জীবন শেষ করলাম আবার তুই বলেই আরাফকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলো আরাফ।

-পাগল কাঁদছিস কেন! তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড! তোকে সাহায্য করতে পারলে আমার ভালো লাগবে। কাল সন্ধ্যার পর একবার আমার অফিসে আসবি বলেই রাহাতের দিকে কার্ডটা এগিয়ে দিল আরাফ বাকিটা আমি দেখব।

-আসি দোস্ত।

 

রাহাত আরাফকে হাত নেড়ে বিদায় দিল আচ্ছা আমি তো নির্বোদের মতো মাকে ছেড়েই খেয়ে নিলাম, একবারও ভাবলাম না মা খেয়েছে কি না। ফোনটা ভেজে উঠল রাহাত দেখল আরাফ কল করেছে কিন্তু ৫ মিনিট আগেই তো আরাফের সাথে কথা হলো, আড্ডা দিলাম মাত্র বিদায় জানালাম। তাহলে এখনি কি দরকার হলো কোন সমস্যা না তো! তাড়াতাড়ি কল রিসিভ করলো হ্যালো আরাফ দোস্ত বল ..?

-দোস্ত প্যান্টের ডান পাশে পকেটে হাত ঢুকা।

-কেন দোস্ত।

 

-যা বলছি এখনি তাই কর।

-আচ্ছা দোস্ত, রাহাত পেকেটে হাত দিয়ে যা দেখল তাতে তার বুক ফেটে কান্না আসছিলো। আরাফ এটা তুই কি করলি, কেন করছিস?

-পাগল আমার সাথে তেমন বেশি টাকা নেই, থাকলে আরো বেশি দিতাম। যা ছিলো তাই দিলাম ২০০০ টাকা দিয়ে মায়ের জন্য কিছু বাজার করে নিস। আর কাল আমার অফিসে আসলে আন্টির জন্য কয়েক পিচ কাপড় দিয়ে দিব।

-রাহাত অবাক হয়ে গেল, আরাফ দোস্ত একটা কথা বলবো।

-বল।

 

-আমার ঘরে খাবার নেই, মায়ের পরনের কাপড়টা ছিঁড়ে গেছে। টাকার অভাবে নতুন কাপড় কিনতে পারি না এসব তুই বুঝলি কেমন করে বললো রাহাত।

-আমরা যখন ক্যান্টিনে খেতে যাই বেসিনে হাত ধুতে গেলে তখন তোর মোবাইলটা ভেজে উঠল। অনেকক্ষন অপেক্ষা করে রিং হয়ে লাইটা কেটে গেল।

 

তারপর আবার কল আসলো আমি রিভিস করতেই আন্টি আমাকে রাহাত ভেবে বললো।

– বাবা দুপুরে বাইরে কিছু খেয়ে নিস ঘরে রান্নার মতো কিছুই নেই। আমি একগ্লাস পানি খেয়ে নিব, পেটে একদম ক্ষিদে নেই।

আর শোন বাবা পরনের কাপড়টা আর পরার মতো অবস্থায় নেই। সেলাই করে পড়তে পড়তে সবটা আরো ছিঁড়ে গেছে ভাবছিলাম তোর একটা চাকরির ব্যবস্থা হলে জানাব। কিন্তু আজ আর না বলেও পারছি না।

 

আচ্ছা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরিস বলেই লাইনটা কেটে দিল, তোকে কথাটা লুকিয়ে ছিলাম দোস্ত সরি। এই টাকার তোর জন্য না! আন্টিকে দিয়েছি বুঝছিস বললো আরাফ…

 

….চলবে।

২৭৫জন ১৮৬জন
0 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য