সবাইকে অতিষ্ট গরমের শুভেচ্ছা।ভাবছেন কেন? আমার মনে হচ্ছে আপনারাও আমার মতই গরমে কাহিল।চারিদিকে শরতবন্দনার এ সময় না পারছি পড়তে,না পারছি লিখতে।

ঘনঘন লোডশেডিং তো নিত্যসঙ্গী।যাও বা একটু মুড আসে ব্লগে ঢুকতে না ঢুকতেই বিদ্যুৎ মিয়া হাওয়া।আর যাই হোক ভাদ্র মাসের গরম আমার সহ্য হয় না। একেবারে জাহান্নামের কাছাকাছি লাগে।

এ রকম তালপাকা গরমের দিনের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। ভাবলাম সেটাই লিখে ফেলি। ভালো না লাগলে আমি না,গরমের দোষ।

আমরা বাঙ্গালীরা সবসময় সবকিছুতে একধাপ এগিয়ে থাকি।হুটহাট চিন্তা ভাবনা ছাড়াই মন্তব্য করে বসি।আমার মনে হয় সবাই এ অবস্থায় একটু হলেও পড়েছেন।যেমন-ইয়াং বাবা ও কিশোরী মেয়ে বাইরে গেছে কেউ একজন দেখে বলেই ফেলল, কি ভাই শালি নাকি?সমবয়সী ভাই-বোন কেনাকাটা কিংবা বাজারে গেছে তাঁকে দোকানী ভাবী বলে বসল।মা মেয়ে গেছে – আপা আপনার ছোট বোন, দেখতে আপনার মতই।

দয়া করে জাজমেন্টে যাওয়ার আগে কষ্ট করে পরিচয়টা জানতে চান তারপর না হয় যা খুশি বলেন।

এসব তবুও চলে।আপনার বাড়িতে এসে কেউ আপনাকে কাজের মেয়ে ভাবলে সেটা কেমন হবে!বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠবে।আল্লাহ কেন তুমি আমার উপর এমন অন্যায় করলে আর একটু সৌন্দর্য দিলে কি এমন ক্ষতি হত।টাকা দিয়ে তো কিনতে হত না?একটু রহম করলেই হত।

যাই হোক এবার ঘটনায় আসি-

***আমার মা হঠাৎ ভীষন অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কোমরের ব্যাথা, হাড় ক্ষয়,এসিডিটি জনিত সমস্যা একদম আলসার পর্যায়ে।তেমন কিছুই খেতে পারেন না।ডাঃ পরামর্শ দিলেন ছোটমাছ,ডিম,দুধ এসব বেশি বেশি খেতে।তাঁকে কোনভাবেই গুড়া দুধ বা দুধের চা,কফি কোনটাই খাওয়ানো যাবেনা।বাজার থেকে সবই নিয়ে আসা হল কিন্তু মা বাজারের দুধ খেতেই পাচ্ছেন না।কি করা যায়।পরিচিত বড়ভাই  পরামর্শ দিলেন তোমার বাড়ির সামনে তো অনেকখানি জায়গা পড়ে আছে তুমি আলাদা ঘর তুলে একটা গাভী কিনে ফেল।গ্রামের মানুষ হিসেবে দেখার অভিজ্ঞতা আছে।এও জানি গরু পালন বেশ কঠিন কাজ।মনে হয় পারব না।

আমেনা বু আমার মায়ের বহু বছরের কাজের মানুষ।সেই সাহস দিয়ে বলল আম্মার তো আগে গাভী ছিল।গোবর তো একসময় পরিস্কার করতামই ।এখনও আমিই করব। কিনে ফেল।

সাহস পেয়ে কালো কুচকুচে বাছুরসহ একটা গাভী কিনে ফেললাম।নাম দিলাম কালি।মা খুব খুশি দুধের জন্য না,গরুর জন্য ।

গরম তাই ফ্যান লাগানো হল গোসল করানোর জন্য মটর বসানো হল। লাইট,মশার জন্য মশারী,খাবারের পাত্র।মোটামুটি কালিরও একটা সাজানো সংসার।

আমেনা বুয়া সব কাজ করে।বিকেলটা আমি একটু আধটু দেখি।এতে কালীর সাথে একটা সখ্যতা তৈরি হয়ে গেল।ভালোবেসে ফেললাম বোধহয়। সন্তানের মত একটা শান্তি অনুভূত হচ্ছিল ভেতরে। তাই ফজরের নামাজের পর তাঁর কাছে না গেলে ভালো লাগত না।

এক সকালে তার ঘরে গেলাম।দেখি শুয়ে আছে।আমাকে দেখলেই সে উঠে দাঁড়ায়।আজ কোনভাবেই দাঁড়াতে পারছে না।চোখ বড় বড় করে অসহায় তাকাচ্ছে আর গোঁ গোঁ শব্দ করছে।আমার মাথা ঘুরে গেল।কি ঘটনা। ভাগ্য ভালো পাশেই পশু হাসপাতাল।ডাক্তারকে না পেয়ে নাম্বার নিলাম।পরিচয় দিয়ে তাঁকে আসতে অনুরোধ করলাম।পশু হাসপাতালের ডাঃ অল্প দুরেই থাকেন।অনেকের মুখে শুনলাম তিনি ভীষন রাগী আর বদমেজাজী তারউপর বিসিএস।আসবেন কিনা তাও জানিনা।

 

আগেই বলেছি ভাদ্র মাসের গরম আমার অসহ্য।গরমে খাওয়া,ঘুমানো, বেড়ানো কোনটাই ভালো ভাবে করা যায় না।তাই পুরোনো ছেঁড়া ফাঁড়া আরামদায়ক জামা বা গেন্জি পড়ে ঘুমানোর অভ্যাস আমার।এটা নিয়ে অনেকেই হাসাহাসিও করেন। আমার তাতে কিছু এসে যায় না।আরামই বড়।

সেদিনও এরকম একটা জামা গায়ে ছিল।বলা যায় আরও খারাপ।দু একজায়গায় ফুটাও আছে।কালোকুলো মানুষ হিসেবে ভালোই মানিয়েছে।বাইরে অপেক্ষা করছি ডাক্তারের জন্য।আরও দুএকবার খোঁজ করার পর তিনি এলেন।

আমিও পিছু পিছু গেলাম।সব দেখেটেখে বিকট চিৎকার-এই গরু দ্যাখে কে?

আমি এগিয়ে গিয়ে- জী ভাই আমি দেখি।

-এই শু…….বাচ্চা,এই গরমে গরুর ঘরে মশারী কেন?এখনি খোল আর পানি ঢালার ব্যবস্হা কর।

আমি রীতিমত হকচকিয়ে গেলাম।পরে বুঝলাম আমার পোশাক এর জন্য দায়ী। টেনশানে চেন্জ করতে ভুলে গেছি।বুঝতে বাকি রইল না অসুন্দর মানুষের পোশাক কত জরুরী।

 

পানি ঢালার ব্যবস্হা করতে গিয়ে আবার ধমক-মালিক তোরে অমনি এমনি টাকা দেয়।পানিও ঢালতে পারিসনা।মাথায় ঢাল।

– জী ভাই।

অল্প সময় পরেই উনি এসিস্ট্যান্ট কে স্যালাইন ওষুধ লিখে বুঝিয়ে দিলেন।বিদেয় হবার সময় আমাকে জিজ্ঞেস করলেন -আমায় যে ম্যাডাম ফোন দিয়েছিলেন তিনি কোথায়?

আমি বললাম-ভাই উনি গরুর চিন্তায় একটু অসুস্থ।

-ও আচ্ছা। তাই বলে আসবেন না?আমি মনে মনে হাসলাম। ম্যাডাম কি আনসোসাল। আহারে!বেচারা কত শখ করেছিলেন সুন্দর একজনের দর্শনের। সেজন্যই বোধহয় এসেছেন।কপালটাই খারাপ!

স্যালাইন লাগানো হবে।একার সংসার আর লোকজন বলতে আমেনা বুয়া।সে সেদিন ছিলনা।গ্রামে গেছে।তাই পানি থেকে শুরু করে সব আমাকেই নিয়ে যেতে হচ্ছে।

এসিস্ট্যান্ট আমায় বলল-লাইট ধরেন?

ধরলাম।সেও মারল ধমক।দেখে দেখে বোধহয় শিখেছে।

-আরে বাহে ভালো করি ধরেন?

কেন যেন যেটা করছি সেটাতেই ভুল হচ্ছে।টেনশানে নাকি অভ্যাস নেই তাই।যা হোক বিকেলের দিকে কালি মোটামুটি সুস্থ হল।চারহাজার স্যালাইন চলার পর খড় খাবার জন্য উঠে দাঁড়ালো।আমি ডাঃ কে মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম।

 

গোসল সেরে কথা হচ্ছিল বরের সাথে।তিনি সব শুনে টুনে মহা গরম।তুমি আমার মানসম্মান কিছু রাখলেনা।সবসময় এমন করে থাক কেন বলত?একটু সুন্দর হয়ে থাকতে পারনা?এতদিনে বুঝলাম বেচারা কতটা কষ্ট আর ক্ষোভ নিয়ে কাটাচ্ছে।শেখসাদীর গল্প খানা তাঁকে শোনাতে মন চাইল। কিন্ত যে ক্ষেপেছে তাতে কাজ হবে না।

এত এত বকাঝকাতে মনটা একটু খারাপই হল।সারাদিনটা সবাই ঝাড়ির উপরেই রাখল।ফোন রাখার মিনিট দশেক পরে আবার ফোন।

– দেখত বিকাশএ দশহাজার টাকা গেছে কিনা?কাল বাজারে গিয়ে ভালো ভালো জামা কাপড় কিনবে।

– ঠিক আছে।

-ঠিক আছে না। অবশ্যই যাবে।

ইশ্ এরা যে কেন অত ভালো হয়।

মা আসছে কফির মগ হাতে-দেখত কফি কেমন হয়েছে?

-মা তুমি তো হাঁটতেই পারনা?এসব কি?লাঠি ভর দিয়ে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে চুমু দিল।

মা মেয়ে বসে আছি।জীবন সারাদিনের সব কষ্ট একেবারে পুশিয়ে দিল।জীবন খারাপ না!

 

কলেজে ডিগ্রী ফাইনাল পরীক্ষা চলছে।আমার ডিউটি ছিল। কোশ্চেন হাতে সামনে দাঁড়িয়ে আছি।মিনিট পাঁচেক বাকি। হুড়মুড় করে ব্যাগ হাতে এক ছাত্র ঢুকল। আমি তাকে চিনে ফেললাম।কালকের এসিস্ট্যান্ট। এমনিতেই দেরি তার উপর আমাকে দেখে সে থতমত খেয়ে অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে আছে আমার মুখের দিকে। আমি কিছুই বুঝতে না দিয়ে পরীক্ষার্থী কিনা জানতে চাইলাম।

– দাঁড়িয়ে কেন,যান?

কোনমতে খাতা নিয়ে  সে পেছন ফিরে দেখছে আর যাচ্ছে।

পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। আমি হাঁটাহাঁটি করছি। তাঁর পাশে দুএকবার গেলাম। আমি গেলেই সে লিখতে পারেনা। শিক্ষক হিসেবে আমার দায়িত্ব তাঁকে স্বাভাবিক করা। আমি পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলাম-

-প্রশ্ন কেমন হয়েছে? সে মাথা নিচু করে ফেলল।

– ভালো।

– আমাকে চেনা চেনা লাগছে?

– হুম।

কালতো আর খোঁজই নিলেন না। আপনার ফোন নাম্বার ও নেই।গরু ভালো আছে।আর একদিন এসে চা খেয়ে যাবেন।কাল যেটা করেছেন আপনার প্রফেশন থেকে করেছেন।ওটা কোন বিষয় না।আর আমি কিছু মনে করিনি।আপনি নিশ্চিতে লিখুন।

মোটামুটি নিশ্চিত হয়েই সে পরীক্ষা দিল।

খাতা নিয়ে বের হবার সময় দেখি দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাঁকে ডিপার্টমেন্টে ডেকে নিয়ে চা খাইয়ে বিদায় করলাম। ছাত্র অনেকবার সরি বলল।

 

২৪০জন ৭০জন
0 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য