সম্প্রতি ভারতীয় বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল জি বাংলার সারেগামাপা সঙ্গীত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থেকে দ্বিতীয় রানার্স আপ পুরস্কার অর্জন করা শিল্পী গায়ক নোবেলের দেয়া একটি সাক্ষাতকার  নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেন- আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হয়তো রুপক অর্থে দেশের অনেক কিছুই বলে কিন্তু প্রিন্স মাহমুদের লেখা আমার সোনার বাংলা গানটিতে তার চেয়েও বেশী এদেশকে প্রতিফলিত করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র নাকি প্রিন্স মাহমুদের লেখা এবং জেমস এর গাওয়া সেই গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত করার জন্য আন্দোলনও করেছিলেন!

নোবেল কিন্তু একথা বলেননি যে জেমস এর গাওয়া গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত করা হোক। তিনি তার ব্যক্তিগত অভিমত ব্যক্ত করেছেন মাত্র। তবে তার এই বক্তব্য কিন্তু জাতীয় সঙ্গীতের জন্য অবমাননাকর। আর সেটাকেই ইস্যু বানিয়ে অনেকেই নোবেলের বক্তব্য এবং আমাদের জাতীয় সঙ্গীতকে গুলিয়ে ফেলেছেন। শেষ পর্যন্ত দেখা গেলো- যারা নোবেলকে অতিমাত্রায় ভালোবাসেন তারা এমন সব মন্তব্য করছেন যা আমাদের দেশ, মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতীয় সঙ্গীতের জন্য চরম অপমানজনক।

আমার কথা হচ্ছে- নোবেলের এমন বিতর্কিত কথা বলা একজন নব্য ফেম পাওয়া শিল্পী যে কিনা অন্য দেশে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করেছে তার উচিত হয়নি। নোবেলের বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করে সেটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে আবার কিছু মানুষ উঠেপড়ে লেগেছেন। যদি তাদের শেকড় খোঁজেন দেখবেন এরা কিন্তু তারাই যারা বামাতি জামাতি ডামাতি কামাতি গ্রুপ এবং যারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে- অনলি বাঁশের কেল্লা ইজ রিয়েল। বুলশিট!!

তাদেরকেই বলছি শুনুন- জাতীয় সঙ্গীত বুকে ধারণ করুন। এটি কে লিখেছে, সে হিন্দু নাকি মুসলমান এসব ভাবনা মন থেকে বাদ দিন। ফেসবুকে আর অনলাইনে বড় বড় বুলি কপচানো অনেক সহজ। দেশপ্রেম নিজের মধ্যে ধারন করা খুব কঠিন। যে সময় আমার সোনার বাংলা জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মনোনীত হয়েছিল বাংলাদেশের সেই সময়ের প্রেক্ষাপট যদি একবারও অনুধাবন করতে পারতেন তাহলে নোবেল এবং আপনারা কেউই এ ধরনের কথা আজ বলতেননা।

মুক্তিযুদ্ধকে যারা আগেও সমর্থন করেননি আর এখনো সমর্থন করেননা; মুক্তিযুদ্ধ শব্দটিকে যারা এখনো গণ্ডগোল বলেন এবং যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি বা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে লোকমুখে কিছু শুনে ধারনা পোষণ করেন, তাদের আসলে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটগুলি জানা উচিত । কারন অনেককেই না বুঝে না জেনে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত এবং মুক্তিযুদ্ধের মতন মহান একটি বিষয়কে অবহেলা করে নানানরকম বিরূপ মন্তব্য করে বসেন যা মোটেও কাম্য নয়।

নোবেল এবং তাকে, তার বক্তব্যের প্রতিবাদ করে যারা লিখেছেন তাদের লেখায় মন্তব্যে করে অনেকেই বলেছেন- রবীন্দ্র পিরিত আমাদের বেশী, কেন একজন হিন্দুর লেখা গান আমাদের জাতীয় সঙ্গীত করা হবে! সে ভারতীয়, আমরা ভারতের দালাল এরকম আরও অনেক কিছুই।

সুরকার প্রিন্স মাহমুদের সুরে শিল্পী জেমস এর গাওয়া আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি- গানটির জন্ম কিন্তু এই সেদিন। আমি স্বীকার করি এই গানে বাংলাদেশের অনেক কিছুই এসেছে। বঙ্গবন্ধু, জাহানারা ইমাম, সলিল চৌধুরী, সুফিয়া কামাল, নজরুল, জিয়া সহ অনেকেরই নাম এসেছে। দেশের জন্য তাদের অবদানও কম নয়। তাই বলে যারা বলছেন এই গানকে জাতীয় সঙ্গীত করা হোক। তারা কি ভেবে বলছেন না হুজুগে মেতে বলছেন আমার বোধগম্য নয়।

রবীন্দ্রনাথ আমার সোনার বাংলা গানটি লিখেছেন ১৯০৫ সালে। ১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধের ডামাডোল বাজছে গোটা দেশে, সেই সময় এমন একটি জাতীয় সঙ্গীতের প্রয়োজন ছিলো আমাদের যাতে বাংলাদেশের শিশু থেকে শুরু করে তরুণ যুবা সবাই উজ্জীবিত হন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, মানুষ যাতে বাংলাদেশকে বুকে ধারণ করতে পারেন, লালন করতে পারেন। ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ গঠিত হয় স্বাধীন বাংলার কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদ। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানের জনসভাস্থল থেকে ঘোষিত ইশতেহারে এই গানকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে এই গান প্রথম জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাওয়া হয়। পরবর্তিতে ১৩ জানুয়ারি, ১৯৭২ তারিখে মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকে এ গানটির প্রথম দশ লাইন সদ্যগঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে নির্বাচিত হয়। সেই জাতীয় সঙ্গীত কি এখন পরিবর্তন করা সম্ভব?

শ্রোতাদের পছন্দ অনুসারে বিবিসি বাংলার তৈরী সেরা বিশটি গানের তালিকায় এই গানটি প্রথম স্থান দখল করে। দৈনিক গার্ডিয়ান পত্রিকার মতে- ২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিকে অংশ নেয়া ২০৫ টি দেশের জাতীয় সঙ্গীতের তুলনামূলক বিচারে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ২য় হয়। প্রথম হয়েছিলো উরুগুয়ের জাতীয় সঙ্গীত।

আমরা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য লালন করা জাতি। ধর্মকে অবশ্যই মানতে হবে তবে সেই ধর্মকে অসৎ উদ্দেশ্যে কাজে লাগিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ভিন্নপথে পরিচালনা তারাই করেছে যারা কখনওই চায়নি- একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হোক। মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় সঙ্গীত, শহীদ, বীরঙ্গনা এসব শব্দকে তারা আমৃত্যু নিজের বুকে ধারন করেছে এক দগদগে ক্ষতের মতন। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মানচিত্রকে তারা বদলে দিতে চেয়েও পারেনি। এরা তারাই যারা বাংলাদেশকে পরাধীনতার শেকলের বেড়ী পরিয়ে রাজপথে হাঁটতে চেয়ে আজও পারেনি।

আমাদের দেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের প্রথম দাবী তোলেন- দেলোয়ার হোসেন সাঈদি। ১৯৮৬ সালে সিলেটে তাফসিরুল কোরান মাহফিলে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন- এ আকাশ কার? এ বাতাস কার? ধর্মভীরু শত শত মানুষ সেদিন আওয়াজ দিচ্ছিলো – আল্লাহর।
তার পরে তিনি বলেন- তাহলে যে লিখেছে চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রানে বাজায় বাশি সোনার বাংলা.. সে কার সাথে শিরক করেছে?
সাঈদির জামাতি অনুসারীরা উত্তর দিয়েছিলো- আল্লাহ’র সাথে।

যে সব স্কুলে জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয় সে সব স্কুল থেকে নিজের সন্তানকে সরিয়ে নেয়ার আহবান জানিয়ে সাঈদি সেদিন বলেছিলেন- এই জাতীয় সঙ্গীতের সবগুলো লাইনে কুফরি আছে। সিলেট আলিয়া মাঠের এ সমাবেশের দীর্ঘ বক্তৃতায় কবিগুরুর নাম বিকৃত করে অশ্রাব্য গালাগালও করেন পরবর্তীতে জামাতের রোকন হওয়া লইট্যা ফিস নামে খ্যাত জামাত-শিবিরের এই আধ্যাত্মিক গুরু।

জাতীয় সঙ্গীতের প্রতিটি লাইনে যদি কুফরি থাকে তাহলে যারা জেমস এর গাওয়া গানকে জাতীয় সঙ্গীত করার পক্ষে আজকে ওলামারা কি সেখানে কুফরী খুঁজে পাচ্ছেননা? প্রশ্ন রেখে গেলাম। সাহস থাকলে উত্তর দিন। সেইসব তথাকথিত বাঁশেরকেল্লার সমর্থকদের বলছি- মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামিক দেশগুলোতে পুরুষরা বাদ্যবাজিয়ে নেচে গেয়ে যে আনন্দ উৎসব করে আর সে সংগীতও যে আরবী ভাষায় উপস্থাপন করা হয় সেটা কতটুকু জায়েজ? এসব কি কুফরি নয়? আমার প্রশ্নগুলির উত্তর দিন। পারবেন দিতে? জানা আছে কারও?

বারবার দেশের সার্বভৌমত্বকে লুণ্ঠিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা নিজেরা যখন পারেনি তাই এবার ধরেছে অন্যপথ। সর্ষের মধ্যে সেজেছে ভূত। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দল হিসেবে পরিচিত আওয়ামীলীগ এবং তার অঙ্গসংগঠনগুলোতে কৌশলে নিজেদের রুপ বদলে মুখোশধারী দেশপ্রেমীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তারা। ধরাও যাবেনা, ছোঁয়াও যাবেনা তবে দেশের বিরুদ্ধে সুচারুরুপে নিজেদের কার্যসিদ্ধি করা যাবে।

যার ফলাফল হচ্ছে শুধুমাত্র এই একটি কারনেই- দেশে কোন একটা কিছু হলেই আজকের সময়কার কিশোর কিংবা তরুনরা বলেন আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি তবে অমুক দেখেছে তমুক দেখেছি। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য আমরা কেউই এর প্রতিবাদ করিনা যা অবশ্যই করা উচিত। মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় সঙ্গীত এসব কুড়িয়ে পাওয়া বিষয় নয়। অর্জন করতে হয়েছে লাখো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে, মা বোনদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এটা নিশ্চতভাবেই সবার বুঝতে হবে বৈকি!

আমরা হয়তো অনেকেই জানিনা- স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বেতারে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হতো। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৬ সাল হতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে বাণীসহ আমাদের জাতীয় সঙ্গীত বন্ধ করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে বেতারেও জাতীয় সঙ্গীত বন্ধ করা হয়েছিলো। জিয়াউর রহমানের পতনের পরে তা আবার চালু করা হয়।

যারা জাতীয় সঙ্গীতের পরিবর্তন চান তারা কি পরিবর্তনের জন্য আরও একটি ৭১’ চান? আপনারাই ভেবে দেখবেন। পারবেনতো সেই ভয়াল কালরাত্রি কিংবা নৃশংস হত্যযজ্ঞের দিনগুলিকে সহ্য করতে? নিজের মা বোনের সম্ভ্রমহানি চোখের সামনে দেখতে? সাহস হবে কাঁধে অস্ত্র তুলে নেবার? বুকে হাত রেখে বলুন? রবীন্দ্রনাথ কে, কি করেছে এসব বাদ দিয়ে তার মত একটাও গান লিখে প্রমান করুন আপনিই যোগ্য। নতুবা ছাগলের তিননম্বর বাচ্চা আর আপনাদের মধ্যে তফাত কি?

নোবেল কি বলেছে- আগে সেটা বুঝুন। আমার মতে, মেধা আর মননে সে এখনো অপরিপক্ক। সুরকার প্রিন্স মাহমুদ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন- জাতীয় সঙ্গীত আমাদের অস্তিত্বের নাম। এই একটি লাইনেই তিনি অনেক কিছু বুঝিয়েছেন। সামাজিক গনমাধ্যমে নোবেল কি দেখেননি, তার এক মন্তব্যে কত কিছু, কত ভুল বোঝাবুঝি হয়ে যাচ্ছে? এটা নিয়ে তার সামান্য চিন্তা আসলেও এবং তিনি নিজেকে ডিফেন্ড করার জন্য হলেও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ফেসবুকে একটা পোষ্ট দিতে পারতেন যাতে এই ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়। যেহেতু তিনি এটা অদ্যবদি করেননি, তাহলে ধরেই নেয়া যায় হয়তো এই ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে নোবেল নিজেও আরও ফেমাস হতে চাইছেন। এটা অসম্ভব কিছু নয়।

এমন বক্তব্যের জন্য নোবেলের অবশ্যই ক্ষমা চাওয়া উচিত। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অন্যতম ধারক এবং বাহক। অনিচ্ছাকৃত ভুল বুঝে হোক কিংবা নিজের পান্ডিত্য জাহির করবার জন্যই হোক, যেকোন ধরনের বিরুপ মন্তব্য করা থেকে আমাদের সবারই বিরত থাকা আবশ্যক। নিজেরা অহেতুক বিতর্কিত ইস্যু তৈরী করে দেশকে ছোট করবেননা, উচিত নয়।

—————-
তৌহিদ,রংপুর
০৪/০৮/২০১৯

তথ্যসূত্রঃ

১.বিবিসি বাংলা
২.বাংলাপিডিয়া
৩.উইকিপিডিয়া
৪.ফেসবুক এবং গুগোল।

১৭৫জন ১৩জন
73 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য