পড়েছি, ঈশ্বর নাকি বাস করেন ব্যথিত মানুষের হৃদয়ে। আমার হৃদয়ে তাহলে বড়সড় একজন ঈশ্বর খুব কষ্টে-সৃষ্টে বসবাস করে যাচ্ছেন।

ভিড় লোকাল বাসের হাতল ধরে কিলোমিটার এর পর কিলোমিটার দাঁড়িয়ে থেকে আমি এবং আমার ঈশ্বর উভয়েই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।সিলেটে ইদানিং প্রতিনিয়তই বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশ মেঘে মেঘে কালো। ঈশ্বরের ক্লান্তি দূর করতে ঘন্টা দুয়েক বৃষ্টিতে ভিজি, বৃষ্টিতে ভিজে টনসিলের ব্যাথায় সারারাত কাতরাই।

সেদিন আবার হলো কি, ভোরের দিকে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখলাম, আমার প্রেমিকার বিয়ে হয়ে গেছে (ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়!)। সে তার পুত্র সন্তানকে কোলে নিয়ে আমার সাথে লুকিয়ে দেখা করতে এসেছে। পুত্রের নাক দিয়ে সর্দি পড়ছে। পুত্রের মাতা সর্দি মোছার জন্য ভ্যানিটি ব্যাগে টিস্যু খুঁজছে, টিস্যু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সে আমাকে অভিযোগ করে বলল, আমার ছেলেটা কেন যেনো তোমার মত হইছে। খালি বৃষ্টিতে ভিজে। দেখো না, ঠান্ডা লেগে গেছে।

টনসিলের ব্যাথায় আমার রাতে অর্ধেক ঘুম চলে গিয়েছিলো, এই ভয়াবহ স্বপ্ন দেখার পর আমার ঘুম পুরোপুরি চলে গেলো। আমি সারারাত জেগে থেকে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ শুনি।

অবশ্য ভোরের দিকে বৃষ্টি হলে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। আমি একজন মানুষকে চিনি যিনি সারারাত দারোয়ানের কাজ করে ভোরে ঘুমুতে যান, এই মানুষটা গত চল্লিশ বছর ধরে রাতে ঘুমোন না। একাত্তর সালে যখন তিনি যুদ্ধে যান তখন থেকেই এই নির্ঘুম রাত কাটানো। মধ্যরাতে প্রায়ই আমার চা’য়ের তেষ্টা পায়। আমি চা খেতে এই মানুষটার যুদ্ধের গল্প শুনি। তিনি চোখ বড় বড় করে আমাকে গল্প শোনান, বুঝলা, আমি যখন যুদ্ধে যাইতেছি, তোমার চাচি তো কিছুতেই যাইতে দিবে না, সেই কি কান্দন…

সারারাত হাইওয়েতে গাড়ি চালানো ড্রাইভারটা ভোরে ঘুমুতে যান,সিলেট থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে এই ড্রাইভারের সাথে আমার পরিচয়। তিনি তার ক্লাস টু’তে পড়া মেয়েটাকে অনেকদিন দেখেন নি। এই বার বাড়ি যাওয়ার সময় মেয়েটার জন্য একটা ‘বিলাই’ কিনতে হবে। তিনি বললেন, আমার মেয়েটা আবার পাইছে তার মায়ের স্বভাব। পশুপাখির প্রতি অত্যধিক মহব্বত। আইচ্ছা বিলাইয়ের দাম কেমুন?

ভোরে বৃষ্টি হলে এই মানুষগুলোর যদি ঘুমের সমস্যা হয়! আহারে!

হৃদয়ে বসবাসকৃত ঈশ্বরের সাথে এইসব নিয়েই আলাপ আলোচনা করতে করতেই কেটে যাচ্ছে আমার দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী।

এক বিকেলের বৃষ্টিতে প্রেমিকা ফোন দিয়ে আদুরে গলায় বলল, তোমার সাথে বৃষ্টিতে ভিজার আমার খুব শখ।
আমি বললাম, আমার শখ নাই।
সে অবাক হয়ে বলল, কেন?
আমি বললাম, তুমি পাশে থাকলে তো আমি বৃষ্টি উপভোগ করতে পারবো না। সব মনযোগ তোমার দিকেই থাকবে। এটা তো হতে পারে না।

কিছু কিছু মানুষ থাকেন, যারা সারাজীবন একা একাই বর্ষা দেখে গেছেন (যেমন জীবননান্দ দাশ, এলান পো, ভ্যান গগ প্রমুখ)। চতুর আষাঢ় তাদের ভেজাতে পারে না। আমিও মনে হয় ঐ দলেরই লোক। ঈশ্বরের পাশে বসে বৃষ্টি দেখতে দেখতে ব্যথিত হবো। আমার ঈশ্বর বৃহৎ থেকে বৃহত্তর হবেন। তিনি বলবেন, বৃষ্টি সংক্রান্ত তোমার প্রিয় ঐ গানটা গাও তো, শুনতে ইচ্ছা হচ্ছে।

আমি বেসুরে গলায় গাইবো, তুমি নাই বলে মোর কাছে, তাই কি বিরহ বরষাতে, এই বারিধারা আজ রাতে , অঝরে ঝরে প্রিয়………

১৭২জন ৭৩জন
5 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য