আমার যত কল্পনাঃ শেষ পর্ব

শামীম চৌধুরী ২০ আগস্ট ২০১৯, মঙ্গলবার, ১২:৪৯:৫৫পূর্বাহ্ন গল্প ১৪ মন্তব্য

এক যুগ পর কুদ্দুস বয়াতীর পরিবার এবার ঈদের আনন্দ  নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে পালন করলো। ফারাহ অসুস্থ থাকায় ননদ বানু ও শ্বাশুড়ি মা’ রান্না থেকে শুরু করে সব কিছু নিজেরাই করেছেন। রহিমের অফিস কলিগ ও বন্ধু-বান্ধবদের আপ্যায়নের সময়টায় ফারাহ উপস্থিত থেকে মনোযোগ সহকারে সকলের প্রতি নজর রেখেছেন। ফারাহ কখনই অনুভব করেনি তাঁর একটি অঙ্গ দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন। সবসময় মনে করেছেন তার ছয়টি হাত। আর এটাই হচ্ছে একান্নবর্তী পরিবারের মূল হাতিয়ার। সন্ধ্যার দিকে রহিমের শ্বশুড়বাড়ির লোকজন আসেন। শুধু মাত্র সৌজন্যমূলক আচরনের মধ্যেই ফারাহ সীমাবদ্ধ ছিলো। কিন্তু রহিমের মা তাঁর সর্বাত্বক দিয়ে বেয়াইন সাহেবাকে আপ্যায়ন করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু রহিমের শ্বশুড় বাড়ি গং সৌজন্য সাক্ষাত করেই চলে যান। নামাজ পড়েই আমি গিন্নীকে সঙ্গে নিয়ে রহিমের বাসায় চলে আসি। দাদার সাথে দেখা করাটাই ছিলো মূল উদ্দেশ্য। ঘরে ঢুকেই দেখি দাদা আরাম কেদারায় ধবধবে সাদা আদ্দির সোনালী সুঁতোয় কাজ করা পাঞ্জাবী পড়ে গা ছেড়ে বসে আছেন। সালাম ও কোলাকুলির পর নিজেই হাত ধরে টেনে নিয়ে বসালেন খাবার টেবিলে। আমাকে দেখে ফারাহ, বানু, জলিল শেখ, রহিম, ফাতু সকলেই এসে বসলো খাবার টেবিলে। ভাবী নিজ হাতে পরাটা মাংস তুলে দিচ্ছেন সবাইকে। ভাবী ফারাহ’র মাথার সামনে দাঁড়িয়ে  রুটি ছিঁড়ে দিচ্ছেন আদরের বউ’মাকে। খাবারের ফাঁকে অপলক চোখে তাকিয়ে দেখছি দাদার পরিবারের সকলকে। দাদার চেহারায় ফুঁটে উঠেছে পূর্নিমা চাঁদের জোৎস্নার মত চিকচিক করা রূপালী সুখ।

ঈদের ছুটির পর সরকারী সফরে রহিম যাচ্ছেন সিঙ্গাপুর । সরকারী কাজের ফাঁকে সেখানে ডাক্তারের সাথে দেখা করবে ফারাহ’র কৃত্রিম হাত লাগানোর জন্য। এমনটাই বলছিলো রহিম। কথার ফাঁকে রাহিমের আদরের মেয়ে দাবী করে বসলো বাবার কাছে। তার জন্য যেন, একটি বড় পান্ডা নিয়ে আসে। বাবা মাথা নেড়ে বললো আর কি আনবো মা’? ফাতুর এক উত্তর পান্ডা আমার চাই-ই। এবার ঈদে ফারাহ’র কোন চাহিদা ছিলো না। ঈদের আগের দিন রহিমের কাছে দাবী করে কাঁচের চূঁড়ির জন্য। রহিম সাভারের বেঁদে পল্লীতে নিয়ে যায় ভালোবাসার বউকে। ফারাহ বেঁছে বেঁছে বেঁদেনীদের কাছ থেকে নানান রঙের চূঁড়ি কিনে। সেই চূঁড়িই পড়ে আছে ফারাহ এক হাতে। কব্জি থেকে কুনুই পর্যন্ত কাঁচের চূঁড়ি দিয়ে ঢেকে রেখেছে হাতখানি। নানান রঙের বাহারি চূঁড়িতে ফারাহকে অপরূপ সুন্দর দেখাচ্ছে। ফাতু আর ফুফু বানুর মাঝে খুঁনসুটি লেগেই আছে। দুপুরে আমার শ্বশুড় বাড়িতে নিমন্ত্রন থাকায় আমি সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসি। আসার সময় দাদাকে বলি তোমরা পরের দিন সবাইকে নিয়ে আমার বাসায় দুপুরের আহার করবে। দাদা খুশী মনে বললেন-

আসবো, জর্জ আসবো।

সবাইকে সাথে করে নিয়ে আসবো।

বাসা থেকে বের হবার সময় ফারাহকে দেখি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে বলে চাচা আমার ঈদের সেলামী দিয়ে যান। বাঁধভাঙ্গা চিত্তে ফারাহকে এক হাজার টাকার একটি নোট সেলামী দিয়ে বিদায় নেই।

গত ১৬ তারিখ রহিম সকাল বেলায় বাসা থেকে বের হয় বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে। সবাই রহিমকে হাসিমুখে বিদায় দেয়। শুধু ফারাহ লিফট পর্যন্ত আসে রহিমকে উষ্ণ ভালোবাসা দিয়ে বিদায় জানাতে। সিঙ্গাপুরে পৌছেই রহিম ফোনে ফারাহকে বলে নিরাপদে সিঙ্গাপুরে পৌছেছে। প্রাপ্ত সংবাদ পেয়ে সবাই নিশ্চিন্ত মনে যার যার কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। প্রতি রাতেই মা’ ও ফারাহ’র সাথে রহিমের ভাইবারে কথা হচ্ছে। সবার কুশলাদি সহজেই জেনে নিচ্ছে প্রযুক্তির যুগে। মেয়ের সাথে, বানুর সাথে ভিডিওতে কথা বলছে। প্রযুক্তির এই সুযোগ ষোল আনাই আদায় করে নিচ্ছে যার যার মতন। কেউ ভাবতেই পারছে না রহিম তাদের কাছ থেকে অনেক দূরে। ১৯ তারিখ রহিম সরকারী কাজ শেষে বিকেলে যায় মোস্তফা সেন্টারে বাড়ির সবার জন্য কেনা-কাটা করতে। টুকিটাকি সবার জন্যই কম বেশী উপহার নেয়। রহিম খুব খুশী বাড়ির সবার জন্য কিছু নিতে পারায়। মা’র জন্য উন্নত মানের একটি জায়নামাজ নেয়। বানু,জলিল শেখ ও কুদ্দুস বয়াতির জন্যও নেয়। সবশেষে আদুরের মেয়ে ফাতু’র পছন্দ বিশালাকার পান্ডা ক্রয় করে মোস্তফা সেন্টার থেকে বের হয় উবারের জন্যে। গন্তব্য হোটেল।

রাস্তার ওপারে ট্যাক্সি অপেক্ষা করতে থাকে। রহিম এপার থেকে ওপারে যাবার জন্য রাস্তা পার হতে যায়। বিশালাকার পান্ডায় রহিমের চোখ আড়ালে পড়ে যায় রাস্তায় চলমান যন্ত্রদানবের উপর। খেয়াল করেই পার হচ্ছিল। হঠাৎ দ্রুত গতিতে আসা একটি পিক-আপ ভ্যান রহিমকে চাপা দিয়ে চলে যায়। ছিটকে পড়ে রহিম। তার হাতের সমস্ত উপহার সামগ্রী ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে রাস্তার উপর। স্থানীয় পথচারীরা রহিমকে নিয়ে আসে হাসাপাতালে। কর্তব্যরত চিকিৎসক রহিমকে মৃত ঘোষনা করে। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাহি রাজিউন) যাবতীয় আইনী কার্যাদি শেষ করে রহিমের মৃত দেহ দেশে আনার ব্যাবস্থা করে বাংলাদেশ দূতাবাস। রহিমের সাথে থাকা অন্য সরকারী কর্মকর্তারা পরের দিন ফারাহকে রহিমের মৃত্যুর সংবাদটি জানায়। ফারাহ সংবাদটি পেয়ে আমাকে জানায়। আল্লাহগো বলে এক চিৎকারে ফারাহ হাতে পড়া কাঁচের চূঁড়িগুলি টেবিলের উপর সজোড়ে আঘাত করলে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। রক্তাক্ত হয়ে উঠে হাত। রক্ত ঝরতে থাকে। কিছু বুঝার আগেই রহিমের মা দৌড়ে আসে বউমার কাছে।

শ্বাশুড়িকে দেখে ফারাহ চিৎকার করে বলে “মাগো আমার সব শেষ হয়ে গেছে“। আপনার ছেলে আমাকে ক্ষমা না করেই চলে গেছে স্বর্থপরের মতন।

আমি রহিমের বাসায় যেয়ে দেখি সবাই শোকার্ত। কুদ্দুস বয়াতী আরাম কেদারায় চুপ করে বসে বসে দুলছেন। কাছে যেয়ে দাদা বলে ডাক দেয়ায় উত্তরে বলে জর্জ এ কি হলো? “আল্লাহ কষ্ট দিলে সুখ দেয় ক্যারে? আর সুখ দিলে কষ্টই বা দেয় ক্যারে? কইতে পারোস? আমি নিরুত্তোর। পাশের এক মাদ্রাসা থেকে কয়েকজন হাফেজ ডেকে  কোরআন তেলাওয়াতের ব্যাবস্থা করি। এদিকে রহিমের অফিসের সকল কর্মকর্তা একে একে রহিমের বউকে সমবেদনা জানানোর জন্য ছুটে আসে। রহিমের মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয় স্ব-স্ত্রীক উপস্থিত হয় রহিমের বাসায়। এ যেন এক নিদারুন শোক ও দৃশ্য। যা সহ্য করা কোন পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়।

আজ রহিমের মৃত দেহ আসছে কফিনে করে। দাদা, আমি, জলিল শেখ ও রহিমের সহকর্মীরা বিমানবন্দরে উপস্থিত রহিমের কফিন সমেত লাশ গ্রহন করার জন্য। সকাল ১০.৩০ মিনিটে লাশের কফিন আমাদের হাতে পৌঁছে। কফিনের ডান দিকের হাঁতল আমার কাঁধে। বাঁ দিকের হাঁতল দাদার কাঁধে।

এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বোঝা কি জানেন? যে বোঝার ভার সহ্য করা সবচেয়ে কষ্টকর? সেই বোঝাটি হচ্ছে- “বাবার কাঁধে পুত্রের লাশ“। কোন বাবার ভাগ্যে যেন এত ভারী বোঝা বইতে না হয় সেই দোয়াই করছি। প্রত্যেক বাবাই যেন এই বোঝা মুক্ত হন। আল্লাহ যেন এতটুকু রহমত দান করেন সকল বাবাকে। আমীন।

রহিমের মৃত্যুর সাথে সাথে আমার কল্পনারও মৃত্যু হলো। প্রতিটি মানুষের নিজ নিজ কৃত কর্মের পর অনুশোচনা আসে। আর মানুষ যখন সেই অনুশোচনা থেকে নিজেকে সংশোধন করতে পারে তখন সেই মানুষটি হয়ে উঠে সকলের কাছে প্রিয়। সকলের কাছে তার গ্রহনযোগ্যতাও বাড়ে। ফারাহ’রও অনুশোচনা থেকে পরিবর্তন এসেছিলো। সবাইকে নিয়ে সুখে থাকার অনুশোচনা। কিন্তু বিধি বাম। বসুন্ধরার অমোঘ নিয়তি ফারাহ’র সেই সুখটি সহ্য করতে পারলো না। বিদায় নিলো রহিম। বিদায় নিলো আমার কল্পনা। আবারো সংগ্রামী জীবন নতুন করে শুরু করতে হবে কুদ্দস বয়াতীর শেষ জীবনে। সবাই রহিমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করবেন। আল্লাহ যেন আমার গল্পের নায়ক রহিমকে শান্তিতে রাখেন। আবার হয়তো কোনদিন নতুন কল্পনা নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হবো। সে পর্যন্ত

সবাই ভালো থাকুন। সুস্থ্য থাকুন।

(সমাপ্ত)

১২৭জন ২১জন
18 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য