আমার যত কল্পনাঃ (কল্পনা-০৯)

শামীম চৌধুরী ৯ জুলাই ২০১৯, মঙ্গলবার, ০১:৪৫:০৩পূর্বাহ্ন গল্প ২০ মন্তব্য

কল্পনা-৯

অনেক চেষ্টা করেও বাবাকে ঢাকায় আনতে পারেনি রহিম। যতবার বাবাকে অনুরোধ করেছে ততোবার কুদ্দুস বয়াতীর সোজা-সাপ্টা উত্তর ছিলো-
”তোর মারে ঈদের আগে বাড়িত পাডায় দে”।
রহিম ছোটবেলা থেকে চুপচাপ থাকতে পছন্দ করতো। বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান হলে রহিম অন্য ঘরের দরজা বন্ধ করে বই পড়ছে। খুব মেধাবী ও পড়ুয়া ছাত্র ছিলো রহিম। বিসিএস এডমিন ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলো। বর্তমানে সরকারের উচ্চ পদস্থ আমলা। চাকুরী জীবনেও রহিম সকলের কাছে বিশ্বাসভাজন ও শ্রদ্ধেয়। কোন নীতিনির্ধারনীর জন্য মন্ত্রনালয় রহিমের উপর আস্থা রাখে।

সব সময় ঝুট-ঝামেলা এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে। হোক সেটা পারিবারিক বা ব্যাক্তি জীবনে। ফারাহ’র অনেক অমানবিক অত্যাচার বা অশোভনীয় আচরন নীরবে সহ্য করে রহিম। সবাইকে সুখে রাখার জন্য রহিম রাতদিন পরিশ্রম করে। কিন্তু ফারাহ’র একগুয়েমি আচরন ও মাতৃ নিবাসের টানে সেটা বাস্তবায়ন হয় না।  সংসারে অশান্তি হবে ভেবে কোনদিন মুখ ফুঁটে  টু-শব্দটি করেনা। ফাতেমার ভবিষ্যত চিন্তা করে সবসময় ফারাহ’কেই প্রাধান্য দিয়েছে। নিজের বাবা-মা’র প্রতি তুচ্ছল্যতা,ছোট বান বানুকে অবজ্ঞা করার পরও কোনদিন জানতে চায়নি কেন তার পরিবারের সাথে এমন আচরন করে? উল্টো শ্বশুড়বাড়ির লোকজনদের সাথে হৈ-হুল্লোড় করে অবসর সময়গুলি পার করেছে।

দায়িত্ব পালনে সে কখনোই আপোষ করেনি। প্রতিমাসে বেতন পেয়ে বাবার হাতে টাকা পৌঁছাতে এক মুহুর্ত দেরী করেনি। বাবা-মা’র চিকিৎসা,ঔষধ, বানুর লেখা-পড়ার খরচ থেকে শুরু করে বিয়ের সব খরচ সে নিজ হাতে করেছে দায়িত্ব নিয়ে। ফারাহ’কে প্রায় সময় বলতে শুনেছে খরচ কমাতে। কিন্তু রহিম কোনদিন ফারাহ’র কথা কর্ণপাত করেনি। বাবা-মা ও বোনকে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যেতে পারতো না। তাই তাদের খরচটা বাবাকে পাঠিয়ে দিয়ে বলতো,

বাবা আমি ওদের নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছি। তোমাদের সঙ্গে নিতে না পারায় তোমাদের জন্য টাকটা পাঠালাম। তুমি বানুকে নিয়ে মফস্বল শহর থেকে বেড়িয়ে এসো।

গোপনে এমন অনেক কাজ রহিম করেছে ফারাহ’কে না জানিয়ে । যেখানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে সেখানে থেমে গেছে নীরবে।
আমি প্রায় সময়ই রহিমকে বলতাম,তোর বৃদ্ধ বাবার মনে যে কষ্ট হচ্ছে বউ’মার আচরনে, সেটা যেন অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায়। উত্তরে বলতো চাচা, দেখবেন একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। ফারাহ আমার পরিবারের সদস্যদের কাছে যেয়ে নিজেক বিলিয়ে দিবে। ফারাহ তার নিজের স্বার্থের জন্য প্রত্যাখান করবে তার বাবার বাড়ির লোকজনদের । ফারাহ’ই হবে আপনার ভাই-ভাবীর প্রিয়জন।

আজ রহিমের সেই কথাগুলিই আমার কানে বাঁজছে। অসুস্থ শরীর ও অঙ্গহানি নিয়ে ফারাহ ফাতেমাকে সঙ্গী করে চলে গেছে রহিমের বাবাকে ঢাকায় আনতে। যাবার সময় রহিমকে বলে, তুমি হাজার বার বললেও বাবা ঢাকা আসবেন না। আমাকেই যেতে হবে বাবাকে আনতে। আমিই যাচ্ছি।

খুব ভোরে শ্বশুড় বাড়িতে রওনা হলো ফারাহ। ধুলা উড়িয়ে গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে দামী পাজারো গাড়ি ছুঁটে যাচ্ছে । মাঝে মাঝে ভ্যান গাড়ি ও মহিষের গাড়ি সাইড দেবার জন্য চালক দুলাল গাড়ি থামাচ্ছে। ফাতেমা এসব দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। গাড়ির জানালার গ্লাস খুলে বাহিরের ছেলে-মেয়েদের পুকুড়ে সাঁতার কাটা, ভ্যান গাড়িতে মানুষের চড়া, ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে মহিষের গাড়ি চলা এসবই যেন ফাতেমার কাছে নতুন এক আবিস্কার। ফারাহ ধমক দিয়ে বললো ফাতেমা গাড়ির গ্লাস তুলো। ধুলা-বালিতে সর্দি-কাশি হবে। ফাতেমা মায়ের ধমককে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে গ্রামীন দৃশ্য দেখছে আর ভাবছে, ইশশশ…!!  আমি যদি ওদরে মত ছুঁটাছুঁটি করতে পারতাম। কতই না আনন্দ পেতাম। ভাবনার শেষ নেই ফাতেমার। এরি মধ্যে শ্বশুড় বাড়ি চলে এসেছে ফারাহ।

কু্দ্দুস বয়াতী যোহরের নামাজ আদায় করে মসজিদ থেকে বাসায় ফিরছে। বাড়ির উঠানে দেখে রহিমের চকচকা দামী গাড়ি। দূর থেকে ভাবছে বানু’র মা’ বুঝি এলো..!! হন্ত-দন্ত হয়ে বাড়িতে আসে কুদ্দুস বয়াতী। ঘরে ঢুকেই দেখে জলচকির উপর বসে আছে তার বউ’মা ফারাহ। চকির উপর দু’পা নাচাচ্ছে তারই যক্ষের ধন আদুরের নাতনী ফাতু। দাদুকে দেখার সাথে সাথেই ফাতেমা চিৎকার দিয়ে বলে দাদাভাই,

আমরা কতক্ষন ধরে বসে আছি। তুমি কোথায় ছিলে?

দৃশ্যপটে কুদ্দুস বয়াতী নির্বাক হয়ে ফ্যঁল-ফ্যাঁল চোখে তাকিয়ে থাকে বউমা’র মুখের দিকে। ফাতু বিছানা থেকে নেমে দাদুর পাঞ্জাবীর আঁচকান টেনে ধরে। ফারাহ অনেক কষ্টে এক হাতে উড়না দিয়ে ঘুমটা টানে। শ্বশুড়কে সালাম করার জন্য উপুড় হতেই বুকে টেনে নিলেন কুদ্দুস বয়াতি। শিশুর মতন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মুখ থেকে কোন শব্দ বের করতে পারছে না। ফারাহ তার শ্বশুড়ের বুকে মাথা রেখে বলছে বাবা, আমি আপনাকে ঢাকায় নিয়ে যাবো। সেখানে বানু,মা, জলিল আপনার ছেলে সবাই আছে। আমরা এক সাথেই থাকবো সুখে-দুখে। আপনিও আমার সাথে থাকবেন বাবা।

বানু ছাড়া এই প্রথম কোন যৌবনা নারীর কন্ঠে বাবা ডাক শুনলো কুদ্দুস বয়াতী। দু’হাত আল্লাহ দরবারে তুলে সেই চিরাচরিত হাঁক ছাড়লো- আ- ল্লা- হ।

দুহাত তুলে দোয়া চাইলেন। হে আল্লাহ, তুমি কখনো নির্দয়, কখনো দয়ার সাগর, আবার কখনো পরীক্ষক। তোমার এই পরীক্ষায় আমি যেন উত্তীর্ন হবার পারি। সেই ক্ষেমতা আমারে দিও।

এই ফাঁকে ফারাহ সব গুঁছাতে থাকে। ফারাহ’র এক হাতে কাজ করার কষ্ট দেখে রহিমের বাবা নিজের থেকে ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে বলে-

মাগো কুনহানে ‍লইয়া যাবা? চলো।  তার আগে রাহো বাড়িডারে তালা মাইরা লই।

ফারাহ সবাইকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। হাইওয়েতে দূর্বার গতিতে গাড়ি ছুঁটছে । গন্তব্য ঢাকা।
আজ যেন ফারাহ’র মুখে শান্তির ছাপ ফুঁটে  উঠেছে । তার শ্বশুড়কে সাথে করে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছে। এই সুখে ফারাহ নিজেক হারিয়ে গাড়ীর সিটের পিছনে মাথা হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

আমি ফারাহ বলছি, আমার বিয়ের পর এই প্রথম শ্বশুড় বাড়ি আসলাম। এটাই আমার নিজের বাড়ি। শহরের ইট পাথরের দালান থেকে বাঁশের বেড়ার ঘরটিই ছিলো আমার বেহেস্ত। গাছ-গাছালির ছায়ায় বড় উঠানে সূর্যের আলো যেন ছড়িয়ে রেখেছে সোনা। আহা কি যে সুখ, প্রকৃতির সেই দৃশ্য। বার বার টানে প্রকৃতির সাথে মিশে থাকতে। চলুন, আমরা বছরের একটি দিন সবাইকে নিয়ে প্রকৃতি ঘেরা এই কুঞ্জের ধুলায় মিশে যাই। দেখবেন; নিজের অজান্তে ক্লান্তভরা দেহটা নিথর হয়ে গেছে মনের সুখে।
আপনাদের সবাইকে আগামী ঈদুল-আযাহার নিমন্ত্রন আমার শ্বশুড়ের ভিটায়।
(চলবে)

২১০জন ৮১জন
17 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য