আমার বাড়ি

জিসান শা ইকরাম ৬ অক্টোবর ২০১৫, মঙ্গলবার, ১০:৪৯:৩৭অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৬২ মন্তব্য

12077515_720519921386422_1699271977_n
১৯৪৭  এর দেশ বিভাগের পরেও আমি পূর্ব বাংলায়ই থেকে যেতে চেয়েছিলাম। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত আমার জমিদারী, আমার প্রজারা এবং সর্বোপরি আমার নির্মিত বাড়িটির প্রতি আমার ভালোবাসা, মায়া আমাকে ভারতে নিয়ে যেতে পারেনি। প্রজারাও আমাকে যথেষ্ঠ ভালোবাসেন। হিন্দু মুসলমান সবাই কান্না কাটি করে রোজ, আমি যেন তাদেরকে পূর্বের মতই ছায়া দিয়ে রাখি, ভারতে চলে না যাই। অনেক যত্নে আমি নতুন বাড়িটি নির্মাণ করেছিলাম। এর প্রতিটি ইট, দরজা, জানালা, সিড়ি, বারান্দা, কার্নিস যেন আমার হৃদয়ের কথা বোঝে, আমিও বাড়ির সাথে কথা বলি, এর ওয়ালে হাত বুলাই, কান পাতি ওয়ালে, অনুভব করি বাড়ির ভালোবাসা। একটি সখের জমিদার বাড়ি কেমন হয় তা সবাই জানেন বলে এর সৌন্দর্য নিয়ে বেশী কিছু লিখলাম না।
বন্ধুবর রূপনগরের জমিদারের কাছে কোলকাতার তার আরাম আয়েশ, ফুর্তি, সন্মান এর কথা শুনে হঠাৎ করেই প্রলোভনের বসে কোলকাতা চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেই। একদিন প্রজাদের কাউকে বুঝতে না দিয়ে, প্রিয় বাড়ি, মায়ার বাড়ির পিঠে কতক্ষণ হাত বুলিয়ে যাত্রা শুরু করি কোলকাতার উদ্দেশ্যে। বাড়িটি আমার পানে তাকিয়ে ছিল যতক্ষণ দেখা যায় আমাকে।
কোলকাতা গিয়ে গড়ে তুলি আমার আর একটি বাড়ি, জৌলুসে ঠাসা। বাঈজি, মুজরা, গান, নাচ, সরাব সে এক অন্য আনন্দের জগৎ। রাজস্থান, মহারাষ্ট্র ও গুজরাট থেকে সেরা সেরা বাইজিদের মাঝে হারিয়ে  যায় আমার প্রিয় বাড়িটির আবেগ, ভালোবাসা, মায়া। তাদের নৃত্য আর সরাবের স্বপ্নিল নেশা আমাকে পেয়ে বসেছিল। জুয়ার আনন্দ এবং উত্তেজনাও ছিল চরম। মাঝে মাঝে বাড়িকে চিঠি লেখি, সেও চিঠি লেখে, তার চিঠিতে অভিমান, এসব অভিমান দেখার মত সময়ও আমার আসলে ছিলনা।
কেন জানি পূর্ব বাংলা হতে ধীরে ধীরে আমাকে পাঠানো অর্থ কমে আসতে থাকে। নায়েব কাকা মাঝে মাঝে আসেন, প্রজারা ঠিকমত জমির খাজনার টাকা দেননা। এমনি আনন্দের মাঝে চলে গিয়েছে কয়েক যুগ। আমার বাড়ির সাথে আত্মিক যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। বাড়ির চিঠি পেলে, দায়সারা উত্তর দিয়ে তাকে সন্তষ্ট করার চেষ্টা করি। আমার চিঠি পড়ে বাড়ি বুঝে ফেলে যে চিঠিতে তাকে মিথ্যে সান্ত্বনাই দেয়া হয়। অভিমান ভরা ফিরতি চিঠি গুলো অনাদরেই রেখে দেই ড্রয়ারে।
আয় যখন বেশ কমে গিয়েছে, তখন জুয়ার নেশা চরমে উঠলো আমার। অবশেষে পরপর কয়েকদিন বড় ধরনের অংক জুয়ায় হেঁড়ে আমি সর্ব শান্ত হয়ে গেলাম। আমার প্রিয় বাড়িতে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম আবার।

প্রায় ৪০ বছর পরে নিজের আত্মা প্রিয় বাড়িতে ফিরে হোঁচট খেলাম। ঝক্‌ঝকে তকতকে বাড়ির একি হাল? দরজা জানালা বিহীন এক কংকাল যেন। বাড়িটি এখন আর একা নেই। ওয়ালে জন্মেছে ছোট বড় অসংখ্য গাছ। বারান্দা গুলো একটিও নেই। ছাদের সিঁড়ি রুমের উপরে যেখানটায় আমার সখের কবুতর থাকতো, সেখানে কাকের বাস। সমস্ত ছাদ এবং ছাদের চওড়া কার্নিস এ পাখিদের বিষ্ঠায় সাদা হয়ে রয়েছে। আমার শয়ন কক্ষে অন্য মানুষের বসবাস। দোতলা বাড়িতে প্রায় ৭ টি পরিবারের বাসস্থান। আমার বাড়িতে আমিই আগন্তক।

একদিন শেষ রাতের ভোরে বিষণ্ন মনে চুপিচুপি আমার মায়ার বাড়িতে গিয়ে ওয়ালে হাত দিয়ে বলি ‘আমি তো ফিরে এসেছি তোমার কাছে, কিভাবে পাই বলো তোমাকে।’
ওয়ালে কান পেতে শুনি বাড়ির উত্তর ‘অবহেলায় আমি তো প্রায় মরেই গিয়েছি, ফিরেই যদি এসে থাকো, আমাকে জাগিয়ে তোলো,দখল মুক্ত করো আমাকে।’

সব পাখি ঘরে ফেরে
ফেরার সময়টি যেন দীর্ঘ না হয়।
===================
আমি আমি না, আমি সে ও না-পর্ব ৩

৪৬৪জন ৪৬০জন
0 Shares

৬২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ