আমার বন্ধু

রিমি রুম্মান ২৫ জানুয়ারী ২০১৫, রবিবার, ১১:১০:৪৪পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৩৬ মন্তব্য

২০১০ এ স্বামী যখন ফেসবুক একাউন্টটি খুলে দেন, তখন এখনকার মত এতো বন্ধু ছিলনা। অনেকদিন ব্যাবহারও হয়নি। অতঃপর যখন টুকটাক ফেসবুক দেখা শুরু করি, তখন একজন বন্ধু হলো। নিখাদ বন্ধুত্ব। হঠাৎ হঠাৎ ম্যাসেজ দেয়___ ও কবি, আমাকে নিয়া একখান কবিতা লেখো না… দোস্ত, কই হারাইয়া যাও… আমার জন্মদিন গেলো, উইশ করলা না…

সে তাঁর বাবার একমাত্র পুত্র সন্তান। তাঁর নিজেরও ছোট দুটি ছেলে-মেয়ে আছে। মা-বাবা, স্ত্রী আর সন্তানদের নিয়ে সুন্দর একটি পারিবারিক গল্প হতে পারতো। হয়নি। আমি বলি, তোমার বউকে আমার ফ্রেন্ডলিস্টে এড করে দিও। তাহলে আমাদের তিনজনের বন্ধুত্বটা আরও সুন্দর হবে। জানলাম, তাদের জটিল সমস্যার কথা। তাঁর তালাকপ্রাপ্তা বোনটি সন্তানসহ তাদের পরিবারেই থাকে। বউ আর বোনের দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। সেই পরিস্থিতিতে তাঁর মা সবসময়ই নিজের কন্যা’র পক্ষাবলম্বন করে থাকে। এতে বউটি রাগ করে তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাবার বাড়ি চলে যায় একাকী। বাচ্চারা বাবার তত্ত্বাবধানে স্কুলে যাতায়াত করে, খায় দায় ঘুমায়। বউ কিছুতেই ফিরবে না যতক্ষণ না আলাদা বাসা নিচ্ছে।

আমার বন্ধুটি পরে বিপাকে। না পারছে মা, বোন’কে কিছু বলতে। না পারছে বউকে বোঝাতে। এমন এক অসহায় অবস্থা ! আমি চুপ থাকি। উৎসাহব্যঞ্জক অবিরত প্রশ্ন করি না। শুধু বলি পাশাপাশি বাসা নিলেও তো পারো। বাবা-মা’কেও দেখা হল… বউও কাছে থাকলো। কিন্তু আমার বন্ধুর ভাষ্য __ বাবা হার্টের রুগী… কখন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পরে… আমি ছাড়া তো বাড়িতে আর কোন পুরুষ নেই। সেই সময় তাকে খুব বিষণ্ণ, অসহায় মনে হল। অতঃপর অনেকদিন পর হঠাৎ একদিন ম্যাসেজ দিলো__বন্ধু, শ্বশুরবাড়ি যাইতাসি বউ’কে আন্‌তে, দোয়া কইরো। এরপর তাঁর টাইমলাইনে তাদের যুগল ছবি… বাচ্চারা সহ তাদের স্বামী-স্ত্রী’র হাস্যোজ্বল ছবি… বাবা-মা সহ পুরো পরিবারের মন ছুঁয়ে যাওয়া সব ছবি দেখে মনটা ভালোলাগায় ভরে উঠে। লাইক দেই। শুভকামনা জানিয়ে কমেন্ট দেই। দেশে গেলে তাঁর পরিবারের সাথে একবেলা খাবারের নিমন্ত্রণ জানায় সে।

২০১২ তে মাত্র উনিশ দিনের জন্য দেশে যাই। সদ্য মাতৃহারা আমি মনখারাপ এবং সময় স্বল্পতার কারনে তাঁর নিমন্ত্রন রক্ষা করতে পারিনি। তবে, তাঁর বাসা আর আমার আত্মীয়ের বাসা কাছাকাছি হওয়ায় মাত্র ১৫ মিনিটের জন্য দেখা করার সুযোগ হয়েছিলো। ব্যস্ততার কারনে এরপর আর কথা হয়নি খুব একটা। মাঝে মাঝে ম্যাসেজ দেয়___ও বন্ধু, কই হারাইলা… ২০১৪ তে আবার দেশে যাই যদিও, সময়গুলো ক্যামন দ্রুত শেষ হয়ে যায়__ কারো সাথেই তেমন যোগাযোগ করা হয়ে উঠে না।

আজ জানলাম, সে স্ট্রোক করে জাগতিক সকল চাওয়া পাওয়ার ঊর্ধ্বে চলে গেছে। মিশে গেছে পৃথিবীর গহীন মৃত্তিকায়। ভেবেছিলাম কারো মৃত্যু নিয়ে আর লিখবো না। কিন্তু আজ অনেকটা সময় ইনবক্সে আমাদের কথোপকথন গুলো দেখলাম। তাঁর টাইমলাইন দেখলাম। আত্মীয়দের শোকগাঁথা লেখাগুলো পড়লাম। আমি কিছুই লিখলাম না সেখানে। লিখলাম আবারো কারো মৃত্যু নিয়ে। আমার টাইমলাইনে আমার বন্ধু আর ফলোআরদের জন্যে। কারন____

পারিবারিক জটিল মুহূর্তগুলোয় একজন পুরুষ কতটা অসহায় থাকে, কেউ কি কখনো ভাবে ? মাঝে শিশুরাই আমাদের বড়দের ভুলের মাশুল গুনে। দু’দিনের পৃথিবীতে সবাইকে নিয়ে সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকা যায় চাইলেই… একটু… শুধু একটু সেক্রিফাইস করলেই…

পরিবার নিয়ে ভাল থাকুন। শুভকামনা সকলকে…

৩৯০জন ৩৮৬জন
0 Shares

৩৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ