আমার বন্ধু সাইকেল

আরজু মুক্তা ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার, ১১:১৬:১৪অপরাহ্ন গল্প ২৫ মন্তব্য

সাইকেল মানে স্মৃতি। স্মৃতি মানে কবিতা। কবি আল মাহমুদ লিখেছেন,

“কবিতা তো কৈশরের স্মৃতি

সেতো ভেসে ওঠা ম্লান

আমার মায়ের মুখ; নিমডালে

বসে থাকা হলুদ পাখিটি

পাতার আগুন ঘিরে রাত জাগা

ছোট ভাই বোন

আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের

ঘণ্টাধ্বনি——-রাবেয়া, রাবেয়া

আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া

দক্ষিণের ভেজানো কপাট!”

‘ দস্যিটা কই গেলো রে? মা চিল্লাচ্ছে।

এই তো আমি এখানে, গাছের মগডাল থেকে বলছি।

মা কখনোই আমাকে মারতে পারেনি। তা তো আগের লাইন থেকেই বুঝতেছেন। আমারও দোষ নাই। পাড়ায় আমার সমবয়সী সব ছেলে, একটা মেয়েও নাই। ওরাও গাছে চড়া শিখে। আমি ওদের আগে শিখে ফেলি। যখন ক্লাস টু এ পড়ি, তখন সব ছেলেরা সাইকেলে হাফ প্যাডেল শিখে। আমিও আব্বারটা নিয়ে শিখি। এরপর রডে চড়া, তারপর ফুল প্যাডেল অর্থাৎ সিটে বসা। এখনকার ছেলে মেয়েরা বুঝবেনা হাফ প্যাডেল আর ফুল প্যাডেল কি? তখন সাইকেল ছিলো ২৪ ইঞ্চি। আমাদের বয়সীদের চালানো কঠিন ছিলো। আব্বা  তো বাসায় সবসময় থাকে না। সাইকেলে চড়াও ঠিকমতো হয়না! আর হাতে পাইলে আসমানের চাঁদ।

আব্বাকে বললাম, সাইকেল কিনে দিতে হবে(ভয়ে ভয়ে)। আব্বা কোন রাগ দেখালো না। বললো, কাল অর্ডার দিবো। তখনকার দিনে সাইকেল আসতো ইন্ডিয়া থেকে। আমি ক্লাস ফাইভের বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে এসে দেখি, লাল একটা সাইকেল আমার জন্য আনা হয়েছে। নাম এভোন। কিসের ড্রেস চেন্জ; কিসের খাওয়া। আব্বাকে ছালাম করলাম। উনি বললেন, “আমার তো ছেলে নাই! আমার অসুখ হলে, তুমি কলেজ মোড় থেকে ওষুধ এনে দিবে।”

তখন আমাদের ছোট্ট মহুকমা শহরে মেয়েদের ঘোরা ফিরায় ভালো চোখে দেখতো না; সেখানে সাইকেলে চড়ে স্কুলে যাওয়া, কেমনে জানি মেনে নিলো। বুঝলো, সিদ্দিক সাহেবের তো ছেলে নাই! মেয়েই ভরসা!

আব্বার ছিলো বাতের ব্যথা। ভল্টারেন ট্যাবলেট এর দাম এখন ১৪ টাকা। অথচ তখন ২৫টাকা করে আমি এনে দিতাম কলেজ মোড় থেকে।

একদিন আমাদের পাশের বাড়ির এক ছেলে আম গাছ থেকে পরে গিয়েছিলো। দুপুর ৩ টা হবে। গ্রীষ্মের ছুটি চলছিলো। আমি তখন ক্লাস টেন এ। মা, এসে ডাকছে ” মুক্তো মুক্তো”

জি, মা—-ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বললাম।

একটু উঠে, সাইকেল নিয়ে যা।  মোফাজ্জল ডাক্তার কে আনতে হবে। রেজাউল গাছ থেকে পরে গেছে।

মা, ওদের তো আরও ছয় ভাই আছে!

কেউ নেই বাসায়। মুখ ধুয়ে, তাড়াতাড়ি যা।

আমি ঝটপট সাইকেল নিয়ে বের হয়ে গেলাম। ডাক্তারের চেম্বার ভর্তি রোগি। উনি এম বি বি এস নন। তখন আমাদের গ্রামে এম বি বি এস ছিলো না। উনিই ছিলেন সব রোগের ডাক্তার।

“চাচা, বাসায় যেতে হবে!”

কেনো রে?

পাশের বাসার এক ছেলে গাছ থেকে পরে গেছে।

তুমি যাও। আমি একটুপর আসতেছি।

আমার তো এগুলো সহ্য হয় না। ওনার ডাক্তারি ব্যাগটা হাতে নিয়ে সাইকেলে উঠে দিলাম টান।

আর উনি যায় কোথায়? চিল্লাইতে চিল্লাইতে ওনার সাইকেল নিয়ে আমার পিছে পিছে আসলো।

উনি এমন ডাক্তার ছিলেন, এক ওষুধে আমাদের অসুখ ভালো হয়ে যেতো। উনি রোগি দেখে, প্রেসক্রিপশন দিলেন। ওনাকে আবার ব্যাগ সহ এগিয়ে দিয়ে এলাম। উনি শুধু মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “লক্ষ্মি মেয়ে!”

কেমনে কেমনে জানি, সাইকেলের সাথে, এমনি করে আমার সাথে সবার একটা মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠলো।

ক্রিং ক্রিং ক্রিং।

রাত হয়েছে, মা ডাকছে খেতে। আজ রাখি। সবশেষে আইনস্টাইন এর মতো বলতে হয়, ” জীবন হলো সাইকেলের মতো, সবসময় চালাতে হয়, তা না হলে পরে যেতে হয়।”

 

৩০৩জন ২জন
43 Shares

২৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য