আমার বন্ধু আশফাক

নাসির সারওয়ার ২৯ অক্টোবর ২০১৫, বৃহস্পতিবার, ০৮:৫৭:৩৫অপরাহ্ন বিবিধ ৩৩ মন্তব্য
আশফাক
আশফাক

আত্মার আত্মীয়রা আমার মনের মানুষ সে হোক রক্তের বা না রক্তের। প্রবাস জীবনে হয়তো এই আত্মীয়দের খোঁজটা একটু বেশী হয়। আমরা সাড়ে পাঁচ ফ্যামিলি থাকি খুব কাছাকাছি যারা সেই রকম আত্মীয়। ওহ, সাড়ে পাঁচ হোল পাঁচটা পূর্ণাঙ্গ ফ্যামিলি আর একজন একা। এই একা বেটাকে তো আর সম্পূর্ণ মর্যাদা দেয়া যায় না। মজার ব্যাপার হোল এই ছয়টি বন্ধুই অনেক ছোট বেলা থেকেই হাঁটছে একসাথে। এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরেফিরে মাসে অন্তত একটা আড্ডা হোতো এই পরিবারগুলোর। ওই আড্ডাগুলো ওই হাফ বেটা আশফাক বেশ জমিয়ে রাখতো। “কিরে, বিয়েটা কি হবে কোনদিন?” সবসময়ের হাসি মুখটা বলতো, “নারে, জেনেশুনে একটা মেয়ের ক্ষতি করতে চাইনা”। ওর কোন কাজই একবারে হতো না। তাই ভয়টা ছিল বিয়ের পরেই যদি আর একটা বিয়ে করতে হয়! পেশায় একজন ডাক্তার। ক্যান্সারের উপরে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে একটা রাজ্য সরকারের গবেষণাগারে কাজ করছিল। ওর পার্ট টাইম জব ছিল আমাদের পাঁচ ফ্যামিলির টুং টাং শব্দগুলো থামিয়ে দেয়া। একদিক থেকে আমি হয়তো কল করলাম তো আরেক দিক থেকে আমার বউ। মাঝে মাঝে বলতো, “তোরা ইদানিং বেশি বেশি বমি করিস, আমি এতগুলো আর পরিস্কার করতে পারবো না”।

এক রবিবার দুপুরের দিকে কল করে ওর বাসায় যেতে বললো। আমি আর আমার বউতো অবাক। এই প্রথম, আমরাই সবসময় ওকে ডাকি। ফুট খানেক তুষারে ডোবা রাস্তায় ১৫ মিনিটের জায়গায় দেড় ঘন্টায় হাজির হলাম। সেই স্বভাব সুলভ হাসিমুখের অভ্যর্থনার সাথে আড্ডা শুরু। একটা বিশেষ গান বারবার বাজে চানাচুর আর কফির সাথে। একসময় রেগে গেলাম, “তুই কি আমার সাপ্তাহিক ছুটিটা ছেলেদের কাছ থেকে নিয়ে নিলি নাকি”? এবার সে আরো বেশি বেশি হাসি মুখ করেই বললো, “আমার লিউকিমিয়া হয়েছে”। মাথাটা আমার নীচু হয়ে গেলো ক্যামন করে জেনো। আরামদায়ক ঘরে আমার ঘাম ঝরছে। একসময় দেখি কে জেনো আমার বি পি মাপছে। জোরে একটা চীৎকার করতে পারছিনা। কখন যেনো বাইরে চলে গেলাম বিরূপের মাঝে স্বস্তি খুঁজতে মনে হয়। একটা কল করা দরকার, কাকে করব জানি? ও হ্যা, ওর বড় বোনটাকে। না, আমার দ্বারা হবেনা। সাবুকে করি। কে শোনে কার কথা। পাঁচ বন্ধু একসাথে কে কি বলছে কে শোনে কার কথা। একসময় নদীর ওপারের রাজ্যের দিকে রওয়ানা দিলাম ওকে নিয়ে। এর মধ্যে অন্য সবাই জড়ো হোল সাবুর অফিসে। এবার তোরা যা করার কর। কে কি করবে! কেউতো কারো দিকেই তাকাচ্ছে না। অনেক নাম করা একটা হাসপাতালে ভর্তি করা হোল পরের দিন। ঐ হাফ বেটা আর আমার দেশে যাবার কথা একটা গবেষণার কাজ নিয়ে। দিন যায় রাত যায়। কিছুদিন পরে হাসপাতাল থেকে ছুটি। আমাদের ভয়টা লুকিয়েই আছে। কিছুদিন পরে আবার ফেরত। চলছে সেই কেমো নামের বিষ। দিন দিন হাসিটা কমে যাচ্ছে। ফারসা মানুষটা ক্যামন জেনো তামাটে হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। ওনার আবার একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে হয়েছে। চলে যাই ৬০ মাইল দূরের হাসপাতালে। বড়ো আপা ধমকায় আমাকে, তাতে আমার কি আসে যায়। মাঝে মাঝে থেকে যাই ওর সাথে। রাতে ফিরে যাই সেই সব দিনে। একবার আমার পা ভাংলো ফুটবল খেলায়। হবূ ডাক্তাররা প্লাস্টার কোরে আমার হোস্টেলে নিয়ে আসল। আমার রুমটা চার তলায়। কত প্লান কি করে আমাকে তুলবে। হটাত ওই হাফ বেটা আমাকে পাঁজা কোলা করে তরতর করে উঠে আসলো আমার রুমে। আরো কত কথা। আমার দেশে আসার সময় ঘনিয়ে এলো। আসার আগের রাতে অনেক কথা। একসময় আমার হাতটা চেপে ধরলো জোড়ে। টেনে আমার কানে কানে বললো, “আমি খুলনা যাবো”। চলে আসার সময় জোড়েই বললাম, “আমি দেশে গিয়ে ঘোছানো শুরু করি, এখান থেকে বের হয়ে তুইও চলে আয়। একসাথে খুলনা যাবো”।

দেশে আসার তার ৩ সপ্তাহ পরে আল্লাহ ওর কষ্ট থেকে মুক্তি দিলেন যা আমরা দোয়ার মাঝেই চাচ্ছিলাম। ওই কষ্টযে কারোই সহ্য হচ্ছিলোনা আর। ও তো খুলনা যাবে তারাতারি করে, তাই হাসপাতাল থেকেই এয়ারপোর্ট। কিন্তূ ওকে ত আবার মরতে হবে। নাহলে ওর পূর্ণতা হবে ক্যানো। বিমান আর এয়ারপোর্ট এর অ্যাকাউন্ট ঝামেলায় ছাড়তে লাগলো দুই দিনের ও বেশি। বন্ধুদের স্বস্তি যাক দুবার ত হয়ে গেলো, এবার যা খুলনাতে তোর মায়ের কাছে। ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে আমরা কজন মিলে ওকে ফুলের মালা দিয়ে খুলনা দিকে যাত্রা সেই শেষ রাতে। যত এগুচ্ছি ততোই যেন গাড়িটা ভারী হচ্ছে। সবাই যেন পণ করে বসে আছে কথা না বলার। স্মৃতির মায়ারা আশেপাশে ঘুরছে অক্লান্ত ভাবে। কি নেই সেখানে। শুধু মনে পরছে না ওর মলিন মুখ। সুজনের কথা মনে পড়ল হঠা্ৎ। অনেক ভাল লাগার একটা ছোট ভাই পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল। জানাজার সময় সবাই যখন সুজনের মুখ দেখছে, আশফাক আমায় বলেছিলো না দেখার জন্য। সুজনের সুন্দর চেহারাটাই যেন মনে থাকে। আজ আশফাকের ওই কথাটা ফেরত দেয়ার সময়। আমি কবরে নেমে ওর বিছানাটা ঘুছিয়ে দিলাম, শুইয়ে দিলাম, দাঁড়িয়ে থাকলাম। ঘুমা তুই।

সময়কে বলি ছাড়না পিছু,
ও বলে তোর থাকবেনা কিছু।
তারপরও বলি যা না চলে,
সময় চলে সময়ের তালে।

কতদিন গেলো, কত ফোন বদলালো, ওর নম্বরটা (১-৯১৭-৫৮৪-১২৪৬) মোছা হলোনা আর।

 

৩০০জন ২৯৯জন
0 Shares

৩৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য