আমার পরিচয় আমি একজন মানুষ

নিতাই বাবু ১ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার, ০৪:৪২:৩১পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২২ মন্তব্য

আমাকে অনেক সময় অনেক লোকে বলে, ‘বাবু মুসলমান হয়ে যান’। আপনাদের এটা একটা ধর্ম হলো? কী যে করেন আপনারা? বুঝি না! এসব কথা শুনে আমি মনে মনে বলি, ‘আমিও তো দাদা কিছুই বুঝি না। না বোঝার কারণেই শুধু ভাবি। ভাবতেই থাকি। আসলে কি আমি হিন্দু? নাকি মুসলমান? না-কি ইহুদি খ্রিস্টান? কিন্তু বাবা এবং মাকে দেখেছি দেবমূর্তি পূজা করতে। তাঁদের দেখায় আমিও দেবমূর্তিতে পূজা দেই। আচ্ছা, আমি যদি অন্য ধর্মের সমাজে বড় হতাম? তখন আমি কি দেবমূর্তিতে পূজা দিতাম? এখন তো ইচ্ছে করলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে পারি। খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করতে পারি। বৌদ্ধ ধর্মও গ্রহণ করতে নিষেধ নেই। যদি ধর্মান্তরিত হই, তাহলে কি আমার মনুষ্যত্ব জীবনের সব ঠিক হয়ে যাবে?

এসব নিয়ে আমি অনেকসময় নীরবে বসে একা একাই ভাবি। ভাবি আমার জন্ম মৃত্যু আর ধর্ম নিয়ে। এসব নিয়ে শুধু আমি কেন, আমার মত এমন ভাবনা মনে হয় অনেকেই ভেবে থাকেন। তবে কে কেমনভাবে ভাবছেন, তা আমার জানা নেই। আমি ভাবছি এই নশ্বর ভবসংসারে আসার আগের অবস্থা থেকে শুরু করে মৃত্যুর পর পর্যন্ত। যখন আমি মাতৃগর্ভে আসার আগে কেমন  ছিলাম, তখন আমার অবস্থা আর ধর্ম কী ছিল? যখন মা বাবার আনন্দের ফসল হয়ে মাতৃগর্ভে ছিলাম, তখন আমার অবস্থা কেমন ছিল এবং ধর্মটাই বা কী ছিল?

আর আমি যদি না আসতাম, তাহলে আমার বাবা কে, আর আমার মা-ই-বা কে হতেন? আমার মা কে, আর বাবাই বা কে? তাঁদের পরিচয়ই বা কী থাকতো? মাতৃগর্ভে থাকতেই  যদি আমার বাবা মারা যেতেন, আর ভূমিষ্ঠ হবার পরপরই যদি আমার মায়ের মৃত্যু হতো? আর যদি আমার কোনও ভাই-বোন না থাকতো? আত্মীয়স্বজনও যদি না থাকতো? আমার পরিচয় এবং আমার ধর্মীয় পরিচয়ই বা কী হতো? আমার নামও কী বর্তমান নাম হতো? নাকি অন্য নাম হতো? আমার ধর্মীয় পরিচয় কি হিন্দু থাকতো? নাকি ইসলাম নাহয় বৌদ্ধ খ্রিস্টান হতো? এসব প্রশ্নের উত্তর মেলাতে গেলেই মাথা ঘুরে। আবার খুবই সহজ মনে হয়।

সহজ হলো এভাবে, যেমন: আমি মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হবার পর যদি কোনও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী আমাকে লালন-পালন করে তাঁদের পরিচয়ে বড় করতো? তাহলে সোজা কথায় আমার নাম হতো মিস্টার হেমিলটন। আর ধর্মীয় পরিচয় হতো খ্রিস্টান। তখন আমি ছোটবেলা থেকেই খ্রিস্টান ধর্মের কিতাব বাইবেল পড়তাম। গির্জায় যেতাম। খ্রিস্টান ধর্মীয় আচার আচরণে বড় হতাম। তাঁদের ধর্মীয় নিয়ম-কানুন মেনে চলতাম। এখন যেমন সনাতন ধর্মের নিয়মকানুন মেনে চলি, তখন মানতে হতো খ্রিস্টান ধর্মীয় নিয়ম-কানুন। তাহলে এখানে দেখা যায় ধর্ম কোনও ব্যাপার না। জন্ম এবং কর্মই বাধ্যবাধকতা। জন্ম আমার যেখানেই হোক না কেন, কর্ম দিয়েই আমার পরিচয়–আমি একজন মানুষ।

আর যদি কোনও ইসলাম ধর্মাবলম্বী আমাকে তাঁদের পরিচয়ে, তাঁদের সন্তান মনে করে লালন-পালন করে বড় করতো, তাহলে আমার নাম হতো হালিম, নাহয় ডালিম। তখন আমি ছোটবেলা থেকে মক্তবে যেতাম। আরবি শিক্ষা বই বা কুরআন পড়তাম। মসজিদে যেতাম। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতাম। রমজান মাসে রোজা রাখতাম। ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদগাহে যেতাম।ঈদের নামাজ আদায় করতাম। ঈদুল আজহায় পশু কুরবানী করতাম। এখন যেমন পূজা করি। মন্দিরে গিয়ে দেবমূর্তিতে প্রণাম করি। সকাল সন্ধ্যা ঘরে বা মন্দিরে প্রার্থনা করি। হরিনাম জপ করি। রামায়ণ পাঠ করি। গ্রন্থ পাঠ করি। গীতা পাঠ করি। এখানেও দেখা যায় ধর্ম কোনও ব্যাপার না। জন্ম এবং কর্মই বড় ব্যাপার। তাহলে বোঝা যায়, জন্ম আমার যেখানেই হোক-না-কেন, কর্ম দিয়েই আমার পরিচয়– আমি একজন মানুষ।

আমি ছোটবেলা থেকে যদি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সমাজে বড় হতাম বা ইহুদি সমাজে বড় হতাম, তাহলে তাঁদের ধর্মীয় নিয়ম-কানুন মেনেই আমি চলতাম। বৌদ্ধ মন্দিরে যেতাম। ত্রিপিটক পাট করতাম। ইহুদিদের ধর্মীয় কিতাব পড়তাম, শিখতাম। এখানেও একইরকম অবস্থার সৃষ্টি। এরকম হতো না, যদি আমি জানতাম আমার জন্ম হিন্দু ধর্মে। কিন্তু আমি তো জানি না আমার জন্মের ঠিকানা। তাহলে ধর্ম দিয়ে আর কী হবে? আমি যেই ধর্মে জন্মগ্রহণ করেছি, সেই ধর্মে কি আমি বড় হয়েছি? আমি বড় হয়েছি ইহুদিদের ঘরে। আমি বুঝের হয়েছি মুসলমানদের ঘরে। আমি লালিত পালিত হয়েছি খ্রিস্টানের ঘরে। তাহলে ধর্ম নিয়ে এতো বেদ-বিচার কেন?

আর মানুষের প্রতি এতো ঘৃণা কেন? সে হিন্দু। সে মুসলমান। সে খ্রিস্টান। সে বৌদ্ধ। সে ইহুদি। সে ডোম। সে চাঁড়াল। সে ধোপা। সে নাপিত। সে কুলু। এমন বৈষম্য কেন? আর ধর্ম নিয়েই বা এতো বাহাদুরি কেন, হীনমন্যতা কেন? আমি একজন মানুষ হয়ে আরেকজন মানুষকে ঘৃণাই বা করছি কেন? অন্য ধর্মের প্রতি আমার এতো ঘৃণা কেন? এটাই কি আমার ধর্ম? উত্তর আসে এটা আমার ধর্ম না। আমার ধর্ম হোক মানুষের ধর্ম। মানবতার ধর্ম। ধর্ম দিয়ে তো মানুষ চেনা যায় না। কর্মতেই মানুষ চেনা যায়। তাই জন্ম যেই ধর্মেই হোক-না-কেন, কর্ম দিয়ে পরিচয়–আমি একজন মানুষ।

ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ। 

১৮৬জন ২৩জন
54 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য