আমার নানুমনি

সুরাইয়া নার্গিস ৩০ নভেম্বর ২০২০, সোমবার, ০২:৩৫:৪৬অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৯ মন্তব্য

আমার নানুমনি।

ময়মনসিংহ শহর থেকে কিছুটা দূরে কাঁঠাল নামক গ্রামে সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে আমার নানুর জন্য।

দুই দু বোনের মধ্যে নানু সবার বড় ছিলেন,বাবা মায়ের বড্ড আদরের সন্তান। ছোটবেলা হাতির পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন বাবার সাথে এখানে,ওখানে। স্কুলে গন্ডি পেরুনোর আগেই বিয়ের প্রস্তাব আসে ছেলে ডাক্তার,বাবা ডাক্তার দু-ভাই তাঁরাও ডাক্তার, তিন বোন।ওই সময় সম্পদশীল মানুষকে রাজা বলা হতো নানুর বাবা ছিলের রাজা। ডাক্তার জামাই পেয়ে ক্লাস ফাইভ পড়ুয়া মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেন। তখন নানুর বয়স ১৩ বছর খুব ধুমদাম করে বিয়ে হয়ে গেল। নানা ফর্সা ,নানু কলো তারপরও সুখেই কাটছিলো দুজনের সংসার। দু মেয়ের জন্ম হলো, বিয়ের মাত্র ৬ বছর চলছে তৃতীয় সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন। হঠাৎ নানা স্ট্রোক করে মারা যান,সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল নানুর জীবনে নেমে আসে আঁধার। আম্মুর চাচারা বলেন ভাইয়ের সন্তানদের দায়িত্ব আমাদের কিন্তু বাচ্চাদের মাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দাও।

একথা শোনা মাত্রই রাজা সাহেব ক্ষেপে উঠলেন, আম্মুর দাদার বাড়িতে এসে হাজির তোমার মতো ১০০মেয়ে খেলেও আমার সম্পদ করবেনা। নানু যেতে চাইলেন না তবু ওরা তাড়িয়ে দিল।রাজা সাহেব মেয়েকে নিজের কাছে এনে রাখলেন তখন নানুমনি ৭ মাসের গর্ভবতী। নানুর বাবাও অপেক্ষা করছিলেন নতুন অতিথি আসা মাত্রই ওই বাড়িতে পাঠিয়ে দিবেন। নানুকে আবার বিয়ে দিবেন, নানু নামাজ পড়ে দোয়া করবেন যেন কোন একটা উপায় বের হয় সন্তানদের কাছে ফিরে আসার।একদিন বড় খালামনি একজনকে দিয়ে চিঠি লিখে পাঠালেন নানুর কাছে তাকে দিয়ে বাসার কাজ করানো হয়। তালা-বাসন, হাঁড়ি- পাঁতিল সব সকালে ধুতে হয়😭 চিঠি পাওয়া মাত্রই নানুমনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

শ্বশুড়কে চিঠি লেখেন “বাবা আপনার বাড়িতে তো ৫ জন কাজের লোক আছেন আমাকে না হয় তাদের মতোই তিনবেলা খেতে দিবেন বিনিময়ে বাড়ির সব কাজ আমি করে দিব, শুধু আমার সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে আমাকে ওই বাড়িতে থাকতে দেন।মেয়েদের বাবা নেই এখন যদি মা থাকে তাহলে ভালো পরিবারে বিয়ে হবে না।মেয়ে গুলোর জন্য আমাকে রাখুন।চিঠি পেয়ে আম্মুর দাদার মনটা নরম হল। তিনি কয়েকদিন পর লোক পাঠালেন নানুমনিকে আবার স্বামীর ভিটায় সন্তানদের কাছে ফিরিয়ে আনলেন। আর বাড়ির চাকরানীর মতো জীবন যাপন করতে লাগলেন কারন তিনি বিধবা, স্বামী নেই  সংসারে উপার্জন নেই।অথচ প্রায় ১৩০০ বিঘা জমির মালিক আম্মুর দাদা সেখানে তো ওদের হক আছে।

নানুমনির ব্যবহার এতটা ভালো ছিলো যে পরবর্তীতে চাচারা তাড়াতে চাইলেও শ্বশুড় তাদের সেবার জন্য নানুমনিকে রাখলেন। তাছাড়া ওই বয়সে নানু মনির হাতের রান্না বেশ ভালো ছিলো, পরিবারের সবাই তার রান্নার প্রশংসা করতো এই ভেবেও থাকতে দিল।কয়েক মাস পরে ফুটফুটে আরেকজন কন্যা সন্তানের জন্মদিলেন আমার নানুমনি। বাড়ির কেউ চাইতো না মেয়েরা লেখাপড়া করে বিদ্যান হয়ে যাক পরে আবার বাবার সম্পত্তির ভাগ চাইবে এই ভয়ে। এদিকেতিন পরীকে নিয়েই নানুমনির সংসার, সারাদিন কাজ আর কাজ চলতো রাত ১১/১২ টা পর্যন্ত।সবাই যখন শান্তিতে ঘুমাত নানুমনি তখন মেয়েদের ঘুম ভাঙ্গিয়ে পড়াতে বসাতেন, চুপি চুপি যাতে কারো ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে ভাবেই চললো জীবন।

একসময় আব্বুর দাদা দেখলেন মেয়ে দুটো যেকোন লেখা দেখেই পড়তে পারে, নানুমনির অনুরোধে তাদের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলে সব খরচ, কাপড় সব দিতেন আম্মুর নানাজান।আস্তে আস্তে আম্মুরা তিন বোন বড় হয়ে ওঠল পড়াশোনায় খুব মেধাবী তাই চাচারাও পড়াশোনা করার সুযোগ দিলেন।আব্বুর চাচারা দুজনেই ডাক্তার তাই তারা সন্তানদের পড়াশোনার জন্য দেশের বাইরে চলে গেলেন। তখন নানুমনি ওনার বৃদ্ধ শ্বশুড়,শ্বাশুড়ীকে নিজের কাছে রাখল সেবা করার জন্য। একটা সময় আম্মুরন তিন বোন মাস্টার্স কমপ্লিট করলেন, তিনজনেই সরকারী চাকরি নিলেন ওই সময় চাচারাও ভাতিজিদের নিয়ে গর্ববোধ করতেন।রুপে গুনে কয়েক গ্রামে মরহুম উসমান ডাক্তার সাহেবের মেয়েদের সুনাম ছড়িয়ে পড়লো।

চারদিক দিকে নামিদামি পরিবারের ছেলেরা বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে লাগলো তখন আম্মুর দাদা জীবিত ছিলেন। বড় খালামনিকে বিয়ে দিলেন ঢাকা ছেলের বাড়ি,গাড়ি সব আছে পেশা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা।আম্মুকে বিয়ে দিলেন ময়মনসিংহ, ছেলে ইউ.এনও।ছোট খালামনিকে বিয়ে দিলেন, ছেলে অডিট অফিসার বাসা ময়মনসিংহ শহরে।উপযুক্ত,যোগ্য পাত্রদের সাথে সন্তানদের বিবাহ দিয়ে নানুমনির সুখের জীবন শুরু হলো কারন তিনজন জামাইয়েই জানতে পারলেন শ্বাশুড়ী মায়ের সংগ্রামী জীবনের কথা।

খালামনিরা চাইলে এখনো মামলা করে বাবার সম্পত্তির ভাগ পেতে পারতেন তা কয়েক কুটি টাকার সম্পদ হবে। কিন্তু নানুমনি বললেন আল্লাহ তোমাদেরকে অনেক সম্পদ,সম্মান দিয়েছে আর টাকা দিয়ে কি করবে.?আমি ওদের ক্ষমা করে দিয়েছি।নানুমনি বাবার বাড়ি থেকে প্রায় উত্তরাধীকার সূত্রে ৯০ লক্ষ টাকার সম্পদ পায় সব ছেড়ে দিয়েছেন কারন তার মেয়েদের জীবনে এখন অভাব নাই। বাবা, ভাইদের সাহায্য আজ তার জীবনের এই পরিবর্তন এসেছে তার ঋণ শোধ করা যাবে না।আলহামদুলিল্লাহ্ আম্মুদের তিন গ্রামে বাবা বেঁচে থাকতেও কারো এত ভালো বিয়ে হয়নি, সেখানে আম্মুদের বাবা নেই তারপরও এত ভালো বিয়ে সবাই অবাক হয়।আমার খালামনিরা যখন নানুর বাসায় যায় তখন এলাকার গরীব মানুষ গুলো তাদের অভাব সম্পর্কে জানায় আম্মুরা তখন টাকা, কাপড় দিয়ে তাদের সাহায্য করে।মসজিদে টাকা দেয়, প্রতিবছর নানুকে যাকাতের কয়েক লক্ষ টাকা পাঠায় তা তিনি গরীবদের দান করেন।নানুর জন্য দুজন কাজের লোক রাখা হয়েছে ওনাকে দেখাশোনা করার জন্য, নানুর খুব বেশি বয়স হয়নি। কিন্তু প্রথম জীবনে এত পরিশ্রম,অপুষ্টি, অবহেলা পেয়েছিলেন তা তাকে বৃদ্ধ করে দিয়েছে। এখন নানুন আলমারিতে ৫০ টা নতুন শাড়ী আছে নাতী,নাতনী,মেয়ের জামাইরা দিয়েছেন কিন্তু একটা সময় তিনি রাজার মেয়ে হয়েও চাকরানী হয়ে থেকেছেন। ছেঁড়া শাড়ী সেলাই করে পড়ে জীবন কাটিয়েছেন।

আল্লাহ্ হয়ত তার ভাগ্যটা কষ্টের পর সুখ রেখেছিলেন সেটাই আজ ভোগ করছেন, নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে শুকরিযা আদায় করেন। ছোটবেলা থেকেই বড় আক্ষেপ ছিলো নানু বাড়ি থেকে কোন জামা কাপড় পাইনি এটা আব্বু শোনার পর। আমাদের চার ভাই বোনের জন্য কাপড় কিনে নানুর বাসায় রেখে আসেন কিছুদিন পর আমরা বাসায় গেলে নানু তা আমাদের পড়তে দেন।

বাসায় ফিরে তো ভিষন খুশি নানু আমাদের জামা উপহার দিয়েছেন, কয়েক বছর পর জেনেছিলাম কাপড় গুলো আব্বু দিয়েছিলেন। তবে আনন্দটা সারাজীবন মনে রেখেছি। নানু বয়স হয়েছে তাই তিন মেয়ের কাছেই থাকেন।বছরের ডিসেম্বর-জানুয়ারী মাসে নানু ২মাসের জন্য স্বামী ভিটায় বসবাস করে থাকেন ওই সময় আব্বুরা তিন বোন বাবার বাড়িতে বেড়াতে যান। নিয়মটা গত ৩৫ বছর ধরেই চলছে, কিছুদিন ধরে শহরের জীবন রেখে নানার গ্রামের বাড়িতে থাকেন। দুজন কাজের লোক আছেন তারা নানুর দেখাশোনা করেন গতকাল রাতে আম্মুর সাথে কথা হয় জানায় ভালো আছেন। তবে একজন কাজের মহিলা গতকাল একদিনের ছুটি নিয়েছে নানু বাসায় একাই ছিলেন।

আজ ভোর ৬.০০টা আম্মুর ফোনটা বেজে ওঠল কান পেতে রাখলাম এত সকালে আম্মুকে কে ফোন দিল জানার জন্য।আম্মুর কান্নার আওয়াজ কিছুই বুঝলাম না, বিছানা ছেড়ে ওঠে দেখি আম্মু নামাজ পড়তেছেন বুঝতে পারলাম কোন খারাপ খবর হবে।আম্মু নামাজ শেষ করে নানুর জন্য দোয়া করলেন তারপর আব্বুকে জানালেন নানুমনি স্ট্রোক করেছেন 😭বাম হাত বাম পা অকেজো হয়ে গেছে মানে প্যারালাইজড হয়ে গেছে।আমি দেখলাম আব্বুর চোখেও পানি 😭কাঁদতে কাঁদতে বললেন আমার দ্বিতীয় মা, তোমরা রেডি হও এখনি রওনা হবো।ঠিক কতটা মেয়ের জামাইকে স্নেহ করলে দ্বিতীয় মা বলা যায়,দাদুমনি মারা গিয়েছেন প্রায় অনেকদিন হলো আব্বুকে এভাবে কাঁদতে দেখে নাই।নানুমনির অসুস্থতায় আজ হাজারটা স্মৃতি মনে পড়ছে,নানা,মামা ছিলো না। ওই নানুই আমাদের নানাবাড়ির পরিচয় বহন করে, ওনি না থাকলে হয়ত নানা বাড়ির শেষ চিহৃটুকু থাকবে না 😭

বিঃদ্রঃ “আমি তোমার জন্য এসেছি” উপন্যাসটা যখন ব্লগে লিখতে শুরু করি তখন নানুমনি প্রথম (১-২৫ পর্ব) পড়ে শুনিয়ে ছিলাম। তিনি মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন আলিফ উপন্যাসটা বই বের করো, আমি কিনে পড়বো।নানু চশমা ছাড়াও চোখে দেখেন,ওইদিন ফোন করে নানুকে বললাম ২০২১ একুশে বই মেলায় আমার উপন্যাসটা বের হবে। নানুমনি খুব খুশি হলেন,  জানিনা নানু আমার উপন্যাসটা পড়ে যেতে পারবেন কিনা 😭😭😭

নানুমনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। চিকিৎসা চলছে, সবাই আমার নানুমনির সুস্থতার জন্য দোয়া করবেন 🤲

২৫৬জন ১৫৩জন
0 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য