– জিসান তুই কি আগামীকাল একবার দেখা করতে পারবি? খুবই জরুরী কথা আছে।
* আগামীকাল দুপুরের পরে পারবো আপু।
– দুপুরে আমার সাথে লাঞ্চ কর।
* লাঞ্চের একটা প্রগ্রাম আছে আপু। ওখানে থেকেই আপনার কাছে চলে যাবো।
– আচ্ছা চলে আসিস। ভুল করিস না।

ফেরদৌসী আপা। ছদ্ম নাম দিলাম। পেশায় ডাক্তার একজন। দুই হাজার বারো সনে ফেইসবুকের মাধ্যমে পরিচয়। বয়সে আমার চেয়ে বড় হওয়ায় প্রথম থেকেই আমাকে তুই সম্মোধন করেন। তবে খুব বেশী বড় না যে তুই সম্মোধন করতে পারেন। তার মধ্যে একটা বড় বোন বড় বোন সুলভ  ভাব আছে, একটা কতৃত্ব পরায়নতা আছে, যেটা আমার ভালো লেগেছিল। তাই তুই সম্মোধন খুশি মনেই মেনে নিয়েছিলাম।

কিছুদিন আগে থেকেই আপা বলছিলেন আমার সাথে দেখা করার কথা। কি এক খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা আলাপ করবেন। ঢাকা যাবার পরে আপাকে জানিয়েছিলাম যে ঢাকা এসেছি। ওনার স্বামীও একজন সিনিয়র ডাক্তার, ঢাকার এক সরকারী হাসপাতালের, নাম আর বললাম না। দুপুরের পরে সিএনজিতে গুলশান এ তার ঠিকানা দেয়া রেস্টুরেন্টের সামনে নেমে ফোন দিলাম যে এসেছি। উনি রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করে একদম সোজা শেষের টেবিলে আসতে বললেন।

দুই চেয়ারের ছোট এক টেবিলে আপা বসে আছেন। টেবিলের উপর ল্যাপটপ এ কাজ করছেন আপা। আমাকে একবার দেখেই আবার ল্যাপটপের দিকে চোখ দিয়ে বসতে বললেন।
– বস একটু। কফি খা, আমি হাতের কাজ শেষ করি।
* কখন এসেছেন আপনি?
– সকাল দশটায়।
* দুপুরে লাঞ্চ এখানেই করেছেন?
– হ্যা, রোজই তো এখানে করি।
* মানে! রোজ সকালে আসেন এখানে! বাসায় ফেরেন কখন?
– হ্যা রোজ আসি। সন্ধ্যার পরে বাসায় ফিরি।
* আপনার চাকরী? প্রাকটিস?
– ছুটি নিয়েছি। প্রাকটিস আর করিনা।
* কি বলেন আপা!
– সময় পাইনা রে। তুই কফি আন কাউন্টার থেকে। আমার টেবিলে বিল করতে বলবি।

আমার মাথায় চিন্তার ঝড়। এখানে সারাদিন সবকিছু বাদ দিয়ে কি করেন আপা? কাউন্টারে গিয়ে কফি নিলাম। আবার এসে বসলাম আপার টেবিলে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে আপার চোখ। ইশারায় বসতে বললেন।
– জিসান তুই জুলফিকারকে তো চেনো, তোর ফ্রেন্ড লিস্টে আছে।
* হ্যা আপা। মাঝে মাঝে যাই তার ওয়ালে।
– দেখ কি লিখেছে সে আজকে দুপুরে। এটা মেনে নেবো না আমি।
এই বলে ল্যাপটপ এর স্ক্রিন আমার দিকে ঘুড়ালেন। ভীষণ চমকে উঠলাম আমি। আপা সারাদিন এখানে বসে ফেইসবুকিং করেন!! পড়লাম জুলফিকারের স্ট্যাটাস। ‘ সেমিনার করে কি হয়? সব ভুয়া এসব ‘ এমন ধরনের কিছু একটা স্ট্যাটাস। এটি পড়েই আপার মেজাজ খারাপ হলো।
ল্যাপটপ তার দিকে ঘুড়িয়ে সেমিনারের পক্ষে একটা স্ট্যাটাস দিলেন। আমাকে আবার বসতে বললেন একটু। মোবাইলে ফোন করা আরম্ভ করলেন৷ পচিশ ত্রিশটা কল করলেন। জুলফিকারের স্ট্যাটাসের বিরুদ্ধে মন্তব্য করতে বললেন, তার স্ট্যাটাসের পক্ষে মন্তব্য করতে বললেন। বিভিন্ন জনার সাথে কথার টোন, এবং গুরুত্বের ভাব শুনে মনে হচ্ছিল, কোনো যুদ্ধ বেধেছে, তিনি যুদ্ধ জয়ের কমান্ড দিচ্ছেন।

আমার মাথা খারাপ হবার মত অবস্থা।
কথা শেষ করে উনি ওনার স্ট্যাটাস এ জবাব দিচ্ছেন। মুখ দেখে কিছুটা খুশি মনে হলো। আমাকে বললেন, সিগারেট খেলে বাইরে গিয়ে খেয়ে আয়। আমার গাড়ির নাম্বার…….. এটা, ড্রাইভারকে পার্কিং থেকে গাড়ি বের করতে বল। সিগারেটের নেশা চেপেছিল, তার চেয়েও বড় আকর্ষন ছিল ড্রাইভার। জানতে হবে জানতে হবে।
গাড়ির ড্রাইভারকে খুঁজে পেলাম। আমি নিজে একজন ভালো পটাতক। ড্রাইভারের কাছ থেকে ঘটনা জানতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। আপা সপ্তাহে পাঁচ দিন এখানে আসেন। সকাল হতে সন্ধ্যার পর পর্যন্ত থাকেন। ছুটি নিয়েছেন চাকুরী থেকে। প্রাইভেট প্রাকটিস করেন না নয় মাসের অধিক সময়। ছেলে কানাডায় পড়ে। আর আপা সারাদিন রাত ফেইসবুকে সামাজিক কাজ করেন। সংসার, চাকরি, প্রাকটিস করার সময় কই তার?

ভিতরে গিয়ে আপার কাছে বসলাম। আপা তখন ব্যাস্ত তার বিভিন্ন বন্ধুদের স্ট্যাটাস নিয়ে মোবাইল কলে। কারো কাজে জিজ্ঞেস করছেন, কেন এমন স্ট্যাটাস দিলো? আবার স্ট্যাটাস ভালো হয়েছে বলে বাহাবা দেন দু একজনকে। অনেককে বললেন কয়েকজনের স্ট্যাটাসে কমেন্ট দিতে। আমি তো অবাকের উপরে অবাক হয়ে দেখছি তাকে।

অবশেষে রাত আটটার দিকে বললেন আমাকে ‘ চল এখন, তোকে হোটেলে পৌছে দিতে দিতে গাড়িতে বসেই জরুরী কথা আলাপ করবো।
ব্যাগ গুছালেন আপা। ল্যাপটপ খোলাই থাকলো। আমাকে বহন করতে বললেন ল্যাপটপ। গাড়িতে উঠে রওয়ানা দিলাম। ল্যাপটপ আপার কোলে, মডেম লাগানো।
– জিসান আর একটু অপেক্ষা কর। হাতের কাজ সেরেই তোর সাথে আলাপ করবো।
আপা আবার মোবাইল করা আরম্ভ করলেন। সবই ফেইসবুকের বিভিন্ন স্টাটাস, কমেন্ট সম্পর্কে। এই স্ট্যাটাসে এমন কমেন্ট কি ঠিক হয়েছে? এই স্ট্যাটাসে উচিত জবাব দিয়েছ তুমি….. এমন ধরনের সব ফোন। নন স্টপ চলতেই আছে। কথা শুনতে শুনতে আমার ঝিমুনি এসে গিয়েছে।

ড্রাইভার বলে উঠলো – স্যার আপনার হোটেল।
আপা বললেন – জিসান জরুরী কথাটা বলাই হলো না। আর একদিন আসিস।
আমি বললাম – ঠিক আছে আপা।

** শতভাগ সত্যি ঘটনা অবলম্বনে। আপনারা কেহ এমন বা এর কাছাকাছি ফেইসবুকের মাধ্যমে সামাজিক কাজ করতে আগ্রহী হলে জানিয়েন আমাকে। আপনাকে নিয়ে লেখার নিশ্চয়তা দিচ্ছি।

২৬৫জন ৬৭জন
46 Shares

৩৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

  • জিসান শা ইকরাম-এর চাদর পোস্টে
  • জিসান শা ইকরাম-এর চাদর পোস্টে
  • জিসান শা ইকরাম-এর চাদর পোস্টে
  • জিসান শা ইকরাম-এর চাদর পোস্টে
  • জিসান শা ইকরাম-এর চাদর পোস্টে