সম্ভবত ক্লাস এইটে পড়াকালীন সময়ে প্রথম সিগারেট মুখে দিয়েছিলাম।স্কুলের ড্রীল স্যার দারুন ফুর্তিবাজ এক মানুষ ছিলেন। স্কুলের কাছেই নদীর পাড়ে ছিল ছাদেক ভাইর চা এর দোকান। টিফিন পিরিয়ডে ছাদেক ভাইর দোকানে বসে চা বিস্কুট খাচ্ছিলাম, হঠাৎ ড্রীল স্যার আসলেন। আমাদের টেবিলেই বসে উনি চা খাচ্ছিলেন। তার খাওয়া শেষ হলে আমাকে সাদেক ভাইর কাছ থেকে একটা সিগারেট আনতে বললেন। নিয়ে আসলাম। এরপর বললেন ‘ যা ধরাইয়া আন।’ কি আর করা ম্যাচ দিয়ে সিগারেট মুখে নিয়ে ধরিয়ে এনে দিলাম স্যারের হাতে। জিজ্ঞেস করলেন ‘ কাশি দিছো?’ আমি বললাম না। স্যার বললেন ‘ তাইলে তুই পাকা প্লেয়ার, নে দুই টান দে। ‘ আমি আমতা আমতা করায় দিলেন ধমক ‘ এই ছ্যামরা টান দে। ‘ দিলাম দুই টান। কাশতে কাশতে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। স্যার হাত থেকে সিগারেট নিয়ে বললেন ‘ বলদ নাহি তুই ? ‘ বলে চলে গেলেন। কাশতে কাশতে ভাবছিলাম বলদরা কি কাশে নাকি? এরপর স্যার আর সিগারেট ধরিয়ে আনতে বলেননি।

স্কুল জীবনে আর সিগারেট ধরিনি। ইন্টার পড়তে গেলাম বিএম কলেজ, বরিশাল। হোস্টেলে আমার রুমমেট ছিল পান্নু আর সাঈদ। তিনজনের নামের অদ্যাক্ষর দিয়ে রুমের সামনে বড় করে রং দিয়ে লিখলাম ‘ পিপাসা হাউজ ‘. কেমন একটা পানাহার টাইপ নাম। পাশের রুমের টিপু, আতাউর এরা ধুমা উড়াইয়া সিগারেট খায়। কেমন কেমন করে তাদের সাথে একটা দুটো করে খাওয়া আরম্ভ করে দিলাম। ব্রিস্টল ব্রান্ড সিগারেট দিয়ে সেই যে আরম্ভ হলো তার আর সমাপ্ত হলো না। ব্রান্ড চেঞ্জ হয়েছে মাগার ধুমপান শেষ হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মহসিন হলের জীবনে রুমমেটদের সাথে অভ্যস্থ হলাম স্টার সিগারেট খেতে। তিন বছর স্টারেই ছিলাম। হঠাৎ একজনে বললো যে বেনসন খাব আজ থেকে, দামী জিনিস খাওয়ায় অভ্যাস করা লাগবে। তো সেই থেকে এই বেনশনই চলছে।

দেশে থাকাবস্থায় সিগারেট সহজ লভ্য হলেও বিদেশে কিন্তু এটা সহজ লভ্য না। বিদেশে আমাদের দেশের মত এত চা এর টং ঘর নেই। সিগারেট কিনতে রিতিমত দেশি টাকার আট নয়শ টাকা গাড়ি ভাড়া বা ঘন্টাখানেক বাসে চেপে দেশী ব্রান্ডের কয়েকগুন বেশি দামে সিগারেট কিনতে হত মাঝে মাঝে। ২০১০ সনে কানাডা টরেন্ট এ গিয়ে একপ্যাকেট বেনশন কিনতে আমার লেগেছিল ৩৭০০ টাকা। এটিই সর্বোচ্চ খরুচে সিগারেট আমার।

দেশের বাইরে যাবার সময় ঢাকা বিমানবন্দরে পর্যটন কর্পোরেশন এর ডিউটি ফ্রি শপ থেকে এক কার্টুন সিগারেট কিনে নিয়ে যাই, বেশ সস্তা। একবার এমনি এক ভ্রমনে মালয়েশিয়া দুইদিন থেকে সড়ক পথে গেলাম সিঙ্গাপুর। সিঙ্গাপুর কাস্টমসের নিয়ম অন্যরকম। বাইরে থেকে কোনো সিগারেট নিয়ে সে দেশে প্রবেশ করা যাবে না। আমার ব্যাগে তখন আট প্যাকেট সিগারেট। ব্যাগ স্ক্যান করে সিগারেট দেখলে বের করে দিতে বললো। দিলাম বের করে। আমার চোখের সামনে ধারালো চাকু দিয়ে সিগারেট সহ টুকরা টুকরা করে ফেললো 😞 মনে হচ্ছিল আমার হৃদপিন্ডে চাক্কু দিয়া ফালা ফালা করে ফেলছে। পরে সিঙ্গাপুর মস্তফা মার্কেটের সামনে থেকে বেনশন কিনতাম দেশের চেয়ে ছয়গুন দাম দিয়ে।

বিদেশে বেড়াতে গিয়ে সিগারেট খেতে খুব সমস্যা হয়েছিল ২০১৪ সনে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থাকাবস্থায়। পরিচিত আমির ভাইর বাসায় থেকেছি সাতদিন। ভাবী চরম সিগারেট বিরোধী। বাসায় বসে তো খেতে পারতামই না, বাইরে থেকে খেয়ে আসলেও নাকে সিগারেটের গন্ধ পেতেন আমি বাসায় প্রবেশ করার সাথে সাথে। সিগারেট খেয়ে চকলেট, আইসক্রিম খেতাম গন্ধ তাড়াতে। কিন্তু কিসের কি? তিনি বলতেনই ‘ দাদা সিগারেটের গন্ধ পাচ্ছি, বমি আসতেছে। ‘ কি যে ঝামেলায় ছিলাম তা বলার মত না। কি করা যায় ভাবতে ভাবতে বুদ্ধি আবিস্কার করলাম। ভাইর দোকানের পাশেই ছিল ট্রেন স্টেশন। সকাল থেকে দুপুর এবং বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভাইর দোকানের আশে পাশেই প্রচুর সিগারেট খেতাম। বাসায় যাবার আগে ট্রেন স্টেশনের ওয়াশরুমে গিয়ে পকেট থেকে টুথ ব্রাস পেস্ট দিয়ে আচ্ছা মত দাত মাজতাম। এরপর পরিধানের কাপড়ে পারফিউম মাখতাম। আলম ভাই এসব দেখে হাসতেন খুব। ভাবির নাক এ সিগারেটের ঘ্রান আর যায়নি এরপর থেকে 🙂

ছবির এই ফটোটা কানাডার টরেন্টর এক লেকের পাড়ের। প্রচন্ড বাতাসের মাঝে সিগারেট জ্বালানোর চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে ভাল্লাগে আমার।

এই পোস্ট সিগারেট খাওয়াকে উৎসাহিত করার জন্য নয়। ধুমপান স্বাস্থের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি আমার চেয়ে কে বেশি জানে?

২২৭জন ৩জন
63 Shares

৪৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য