বন্দর রেল লাইন অপারেসন: ডিসেম্ভর মাস বিজয় আসন্ন।মুক্তিযুদ্ধে বাংলার দামাল ছেলেদের সাথে পুরোপুরি যোগ দিলেন মিত্র বাহিনী ভারতের সেন বাহিনীরা।১৫ই ডিসেম্বর সকাল ১০ টায় এম.পি সিং এর নেতৃত্বে ৪টি গ্রুপ করে চার দিকে রেকি করতে বের হয়।প্রথম গ্রুপে নেতৃত্বে ছিলেন গিয়াস উদ্দিন বীর প্রতীকে,দ্বিতীয় গ্রুপে সাহাবুদ্দিন খান সবুজ ও এন.পি. সিংহের নেতৃত্বে, তৃতীয় গ্রুপে নেতৃত্বে ছিলেন- জি.কে বাবুল ও মিজানুর রহমান ঢালী এবং চতুর্থ গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন- নুরুজ্জামান ও দুলাল।বন্দরের কোন কোন স্থানে পাক বাহিনী ঘাটি করে আছে তা দুপুর একটার মধ্যে রেকি সম্পন্ন করে ফিরে আসলেন তারা।এরপর গিয়াসউদ্দিন বীর প্রতীককে নিয়ে এন.পি সিং ও চার গ্রুপের সেনারা বিকাল তিনটার দিকে বৈঠকে মিলিত হন।সেই দিন বিকাল সাড়ে চার টায় অপারেশনের উদ্দেশ্যে সর্ব মোট সাড়ে পাঁচ প্লাটুন মুক্তি যোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর সৈন্যরা একত্র হয়ে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে হামলার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।

১।মদনগঞ্জ রেললাইন ক্রস পয়েন্ট ২।মদন পুর চৌ-রাস্তা জংশন ৩।কুড়ি পাড়া রেল ষ্টেশন হতে গুকুল দাসের বাগের চৌ-রাস্তা ৪।বন্দর ও কলা বাগান ক্রস পয়েন্ট হইতে নবীগঞ্জ রেল ষ্টেশন হয়ে দাসের গাঁও পর্যন্ত  প্রায়  ১৮ ঘন্টা সম্মুখ যুদ্ধ চলে দাউদ কান্দির মুক্তি বাহিনীর কমান্ডার কাওছার সহ  আহত হন আরো অনেকেই এবং শহীদ হন সেই যুদ্ধে মিত্র বাহিনীর ও মুক্তি বাহিনীর প্রায় ২৫/৩০জন।নিহত ৮জন মুক্তি বাহিনীর সৈন্যকে মির কুন্ডী নামক স্থানে রাস্তার পাশে শেষ কৃত্য সম্পন্ন করা হয়েছিল।এই যুদ্ধে গিয়াস উদ্দিন বীর প্রতীকের নেতৃত্বে সাহাবুদ্দিন খান সবুজের গ্রুপ,মোঃ সেলিমের গ্রুপ,মোঃ আঃ আজিজের গ্রুপ, তপনের গ্রুপ,হাজী গিয়াস উদ্দিনের গ্রুপ সহ প্রায় দেড় প্লাটুন মুক্তি যোদ্ধারা অংশগ্রহণ করেন
মুক্তিযুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে ১৯৭১ সাল ২৭শে মার্চ প্রথম শহীদ হলেন যে সব সাহসী কৃতি সন্তানেরা তাদের মধ্যে অন্যতম নারায়ণগঞ্জের পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান আহম্মদ চেয়ারম্যানের কন্যা ও জামাতা শহীদ লায়লা হক ও জামাতা শহীদ জাসিমুল হক।শহীদ ক্যাসিয়ার সাত্তার,শহীদ মিসেস ছমির উদ্দিন,ব্যাংক ম্যানেজার 
শহীদ শরীয়ত উল্লাহ,সাবেক জাতীয় পার্টির মন্ত্রী আঃ সাত্তারের পুত্র শহীদ তৌফিক সাত্তার,শহীদ আঃ লতিফ,বীর মুক্তি যোদ্ধা জাহাংগীর খোকার শ্বশুর শহীদ আঃ সাত্তার,উত্তর মাসদাইর এর শহীদ আঃ সামাদ,শহীদ ওমর আলী,শহীদ সাচ্চু,শহীদ ফকির চাঁন,শহীদ ফটিক চাঁন,শহীদ দিল মোহাম্মদ,শহীদ জিন্নাহ,শহীদ আক্তার,শহীদ আঃ মজিদ,শহীদ মোঃ মুকুল এবং অজানা আরো অনেকে।

‘ভালো কইরে দেখো হামাক।
তুমহি দেছো পা,আমি দিছি জরায়ু।’
বেনু বলছে মাখনকে।বরেন্য কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের ‘যুদ্ধ’ উপন্যাসে এ ভাবেই মুক্তিযুদ্ধে পুরুষের পাশে নারীর অবদানকে এক অনবদ্য নান্দনিকতায় প্রকট আর প্রচ্ছন্ন ভাবে তুলে ধরেছেন।১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর এই নয় মাসের সময় কাল যতটা না দীর্ঘ তার চেয়ে বেশি দীর্ঘ আমাদের মুক্তি যুদ্ধের বাস্তব ইতিহাস। এই বিস্তৃত ইতিহাসের অংশীদার পুরুষের তুলনায় নারীও কম নয়।বরং সমকৃতিত্বেরই পরিচয় বাহী।সেটা আজ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় প্রমাণিত এবং সত্য।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ‘বীর প্রতীক’ উপাধি পাওয়া দুই নারীর এক জন হলেন তারামন বিবি আর অপর জন হলেন সেতারা বেগম।তারামন বিবি দেশের ভিতরেই যুদ্ধ করেছেন।কোদাল কাঠির,রাজীবপুর,তারাবর,সাজাট ও গাইবান্ধা এলাকায় কম পক্ষে তিনটি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।১৯৯৫ সালে এই মহিয়সী নারীকে খুঁজে পাওয়া যায় এবং সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
সেতারা বেগম ভারতে শরণার্থী হয়েছিলেন।মুক্তি যুদ্ধের জন্য প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে তিনি আর্মি মেডিকেল কোরের সদস্য হিসেবে কাজ করেছিলেন।১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে মুক্তিযোদ্ধা কাকন বিবির সন্ধান পাওয়া যায়।সুনামগঞ্জের দোয়ারা বাজারের লক্ষীপুর গ্রামের মেয়ে কাকন বিবি;খাসিয়া এই নারী এলাকায়‘মুক্তি যাদ্ধা বেটি’ হিসাবে বেশ পরিচিত।প্রায় বিশটিরও বেশী সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি।এ ভাবে ক্রমশ জানা যায় করফুলি বেওয়া,পিয়ার চাঁদ,সৈয়দা জিনাত,বীথিকা বিশ্বাস সহ আরও অনেক মুক্তিযাদ্ধা নারীর নাম।যার মধ্যে আমার প্রিয় শহর নারায়ণগঞ্জেও বহু পুরুষ মুক্তি যোদ্ধাদের সহযোগিতায় ছিলো বেশ কয়েকজন নারী মুক্তিযোদ্ধা তাদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁও এবং ফতুল্লা অঞ্চলে নিজের জীবন বাজি রেখে কাজ করেছেন বীর সাহসী মুক্তিযোদ্ধা রোকেয়া সুলতানা বা রোকেয়া শাহাবুদ্দিন অন্যতম৷রাত-ভোর সাঁতরে প্রাণ রক্ষা করেছেন৷যুদ্ধের সময় নাপাক সেনাদের চোখে ধুলো দিয়ে অস্ত্র পরিবহন করেছেন তিনি৷
সাহসী এই বীরাঙ্গনা ১৯৫৪ সালের ১৪ মার্চ নারায়ণগঞ্জের বাবুরাইলে জন্ম রোকেয়ার৷বাবা সিরাজুদ্দীন মিয়া এবং মা গুল বদন বেগম৷তিনি ১৯৬৬ সাল থেকে ছাত্র লীগের সাথে সক্রিয় ভাবে জড়িত ছিলেন রোকেয়া সুলতানা৷সেই থেকে প্রায় প্রতিটি আন্দোলনে তিনি অংশ গ্রহন করেন৷তেমনি ১৯৭১ সালে নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজের ছাত্রীবস্থায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের রেসকোর্সে ভাষণের ময়দানে তার সহকর্মীদের নিয়ে অংশগ্রহন করেন।
তার মুখে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত যুদ্ধে অংশ গ্রহন এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ ।
ডয়েচ ভেলেতে তিনি বলেন 
‘‘গোদ নগর থেকে তল্লা ক্যাম্পে এক জন মুক্তি যোদ্ধাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিলো তাকে সেই সঙ্গে অস্ত্র-শস্ত্রও বহন করে নিয়ে যান৷তিনি প্রথমে নৌকা করে পার হলেন তারপর তারা দু’টি রিক্সা করে চলে যাচ্ছিলেন সে সময় তিনি ছিলেন সামনের রিক্সায়৷অপর রিক্সায় ছিলেন এক জন মুক্তি যোদ্ধা৷এমন কি সেই রিক্সার চালকও ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা৷রিক্সার তলদেশে বেঁধে রাখা ছিলো অস্ত্র ও গোলা বারুদ৷তাদের শর্ত ছিল,কোথাও কেউ ধরা পড়লে একটু দূরে গিয়ে অবস্থান নিয়ে সঙ্গীর খবর নিয়ে তাকে উদ্ধারের ব্যাপারে চেষ্টা করতে হবে৷
নারায়ণগঞ্জের মেট্রো হলের কাছে নাপাকিদের সেনাদের ঘাঁটি ছিল৷সেখানে তার রিক্সা আটকে দিল নাপাক সেনারা৷তবে সৌভাগ্য ক্রমে দ্বিতীয়টাকে তারা আটকায়নি৷সেটা কুমুদিনির কাছে এগিয়ে গিয়ে সেখানে অপেক্ষা করছিলো৷নাপাকি সেনারা তার পরিচয় পত্র দেখতে চাইল৷তিনি রেশনের কার্ড দেখালেন তারা জিজ্ঞেস করল,তিনি মুসলমান কি না৷তিনি নিজেকে মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিলেন এরপর  তারা তার দেহ এবং রিক্সা তল্লাশি করার পর তাকে ছেড়ে দিল।সেই দিন ছাড়া পেয়ে কুমুদিনির কাছে সঙ্গী মুক্তি যোদ্ধাকে নিয়ে তল্লা ক্যাম্পে সফল ভাবে পৌঁছলেন৷”
আরেকটি ঘটনায় তিনি নাপিদের হাতে প্রায় ধরাই পড়ে গিয়েছিলেন।যুদ্ধের অনেকগুলো দিন চলে যায় মা বাবার সাথে দেখা করতে মনটা ছটফট করতে থাকে।এক দিন চুপ করে তিনি বাড়ীতে গেলেন কিন্তু কেমন করে যেন খবর পেয়ে গেল রাজাকাররা৷নাপাকি সেনারা তাদের বাড়ি ঘর ঘিরে ফেলে৷তার তাকে মা চুপ করে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দিল৷পিছনে পুকুর সাঁতরে অপর পাড়ে আরেক এক বাসায় উঠে দেখল সেখানেও নাপাক সেনারা৷সেখান থেকে আবার তড়িৎ গতিতে বুদ্ধি বের করে এ দিক সেদিক দিয়ে আবারো পালিয়ে যেতে সক্ষম হল৷তিনি আবারো দীর্ঘ সময় সাঁতার কেটে অনেক দূরে গিয়ে উঠলেন৷ সাতারঁ কাটার এমন লুকোচুরি খেলতে খেলতে রাত পার করে দিল৷ সেখানকার একটি স্কুলের আয়া তাকে ঠাঁই দিল৷বললেন,আপা, আমার বাসায় আজকের দিন কাটান৷তার বাড়িতে একদিন থেকে পরের দিন আবার সহ যোদ্ধাদের সাথে যোগ দিলেন৷এভাবেই মুক্তি যুদ্ধে নিজের প্রাণ বাজী রেখে লড়াই করেন বীর সাহসী নারী নেত্রী রোকেয়া সুলতানা৷
এই বীর রোকেয়া সুলতানা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন ফতুল্লা থানার আলীর টেকে৷সেখানে নেতৃত্বে ছিলেন আরেক কৃতি সন্তান বীর প্রতীক গিয়াসউদ্দীন৷ভারত গিয়ে অধিকতর প্রশিক্ষণ নিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিতে চাইলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ রোকেয়াকে নারায়ণগঞ্জে থেকেই কাজ করার নির্দেশ দিলেন৷তিনিও তাই সোনারগাঁ,কাইটার টেক, ফতুল্লার বক্তবলী,নারায়ণগঞ্জের তল্লা,দেওভোগ,গোদ নগর, মধ্য নগর এসব অঞ্চলগুলোতে অবস্থিত মুক্তি যোদ্ধাদের শিবিরে অবস্থান করে কাজ করতেন৷গুপ্ত চর হিসেবে খবর সংগ্রহ,মুক্তি যোদ্ধাদের কাছে তথ্য সরবরাহ,ওষুধ,কাপড়,অস্ত্র-শস্ত্র,গোলা বারুদ ইত্যাদি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দিতেন৷এছাড়া যুদ্ধাহত মুক্তি যোদ্ধাদের নার্স হিসাবে সেবা-শুশ্রূষাও করতেন৷
আমি তখনো অনেক ছোট।আমার জান্নাতবাসী মা বলতেন গন্ডগলের মাসে আমি কুলে মানে হয়তো পাচ ছয় মাস।নাপাকি আমলেই মরহুম জান্নাতবাসী পিতা সততার বন্ধনে পুলিশী চাকুরীটি ছেড়ে দিলেন।মাকে বলেছিলেন,না এ চাকুরীটা আমার জন্য না !এখানে থাকলে ঘুষ টুস খেতে হবে যা আল্লাহ বিরোধী।চাকুরীটা ছেড়ে মাকে নিয়ে কুলিল্লা থেকে চলে এলেন এই সিদ্ধিরগঞ্জের মাটিতে তখনো আমার জন্ম হয়নি।চাকুরী নিলেন এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজীতে।তার কয়েক বছর পরই মুক্তি যুদ্ধের ডাক দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমান।

কৃতজ্ঞতায়:মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বিভিন্ন বই ও অনলাইন পত্রিকা।

আমার জন্মভুমি “সিদ্ধিরগঞ্জ”মুক্তিযুদ্ধ”১ম খন্ড

এর পরের পর্বে থাকছে মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা অপারেশনে-সিদ্ধিরগঞ্জ।

১৭০জন ১৭০জন
0 Shares

১৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য