আমার চোখ কেন কাঁদে?//

বন্যা লিপি ২৮ জুলাই ২০২০, মঙ্গলবার, ০২:০৮:৫৩অপরাহ্ন এদেশ ১৮ মন্তব্য

বাংলা কি ? দেশ কি? দেশের প্রতি ঘৃণা বা ভালবাসাই বা কি? এসব প্রশ্নের যথাযথ কোনো উত্তর আমি দিতে পারবো না। অবস্থানগত দিক থেকে খুবই সাধারন জীবনযাপন করে আসছি জন্মের পর থেকে এ পর্যন্ত। জন্মদাতা পিতা মাতার শেখানো নানা রকম শিষ্টাচার শিখতে শিখতে কিছু অভ্যাস আজো ধারন করে চলি যা নিজের স্বভাবে পরিনত হয়েছে। কিছু স্বভাব অভ্যাস নিজস্বতায় ধারন করি নিজের মতো। ভালো মন্দের বিচারিক দায়ভার অন্যের। ভুল বিচারে আমি প্রতিবাদ করতেও নারাজ। দেশপ্রেম কিভাবে বোঝায়। আমার জানা নেই। বিদ্রোহ কিভাবে করে দেশের বিরুদ্ধে তাও জানা নেই। ক্রোধ হয়, হয় রাগ। যখন দেখি,দু আড়াইমাস ভিজিট ভিসায় তেলের দেশ খ্যাত মধ্যপ্রাচ্যে  বেরিয়ে এসে আমারই মুখের ওপরে বলে– ‘জানেন আন্টি, আমি ভাবাতাম বাংলাদেশের এয়ারপোর্ট কত্ত বিশাল আর সুন্দর! কিন্তু দু্বাই এয়ারপোর্টে নামার পরে আমার ধারনা বেমালুম পাল্টে গেলো। এত্ত পরিচ্ছন্ন আর নিট&ক্লিন! তখন আমার বাংলাদেশ এয়ারপোর্ট সবচে *খয়রাতি* মনে হইছে’। আমি জানিনা ওই খয়রাতি শব্দটাতে কি ছিলো? আমার মুখাবয়বে রক্ত ঝলক দিয়ে উঠেছিলো। আমি মেয়েটার কথার কোনো প্রতিবাদি শব্দ খুঁজে পাইনি। আমি অসহায়ের মত চোখ ফিরিয়েছি বাংলাদেশের ব্যাবস্থাপনার দিকে। আসলেই তো! তুলনা করার মতো  তো আসলে বাংলাদেশের ব্যাবস্থাপনায় গলদ আছেই। অস্বীকার করবো কিভাবে?

 

তখন খুব ছোট। স্কুলে যখন এ্যাসেম্বেলীতে জাতীয় সংগীত বেজে উঠতো মাইকে! সকাল সাড়ে এগারোটার রোদ্দুর দেখতাম আমি কেমন ভাবালু চোখে। শৃঙ্খল বেঁধে দাঁড়ানো সব সহপাঠীদের সাথে থেকেও আমি হয়ে পড়তাম উদাস! বুকের বাঁশ না কোনপাশ খুঁজে দেখা হয়নি তখন। টের পেতাম চিনচিনে এক অদ্ভূত অনুভূতি। সে অনুভূতির নামও জানিনা তখন। হয়ত আজো জানিনা। ঝলমলে রোদ্দুরে রবীঠাকুরের রচিত ‘ আমার সোনার বাংলা  আমি তোমায় ভালবাসি’ সুরের সাথে সাথে দুলতে থাকতো নারিকেলের পাতা, কাঁঠাল গাছের পাতা, আমার চোখ আটকে থাকতো এইসব প্রকৃতির সবুজের মধ্যে।

 

 

আমি আজো জানিনা- কুট্টি কাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াকালীন সময়ে যখন ছুটিতে বাড়ি ফিরে তাঁর বড়দা’কে বলে –‘ বড়দা, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের গানের ক্যসেট রিলিজ হবার পরে হট কেকের মত বিক্রি হচ্ছে ক্যাম্পাসে! ‘ আব্বার ( কুট্টি কাকা, শামসুল আজিম সোহাগ ওরফে সোনা, জিসান ইকরাম মোঃ শামসুলের বড়দা) গম্ভীর মুখে চোখে অপার্থিব হাসি ছড়িয়ে পরা দেখে , আমার চোখে কেন পানি চলে আসে? আমি আজো জানিনা। জানিনি তখন, উঠোনে কেন ছুটে বেরিয়ে আসি বিজয় দিবস বা স্বাধীনতা দিবসে মাইকে যখন বেজে ওঠে ‘ তীরহারা ওই ঢেউয়ের নদী পড়ি দেবরে….’ এক সাগরের রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলবো না – আমরা তোমাদের ভুলবো না….’ আমার ভেতর থেকে কেন কান্নার ঢেউ ওঠে?  আমি অবাক হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করেও উত্তর পাইনি আজো।

 

এই দেশে সব আছে, দুঃখ, দুর্দশা, দুর্নিতী, সঠতা,  দলীয় নিতী, উচ্চপর্যায়ের চাটুকারিতা, অব্যাবস্থাপনা, রাজনিতী নামের হটকারীতা, ব্যাবসা নামের ডাকাতিপনা, মিথ্যার বেসাতিপনা, খাদ্যে ভেজাল, অসাস্থ্যকর পরিবেশ, সাস্থ্যখাতে দুর্নিতী, শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়ম, ন্যায্য নাগরিক অধিকারের অভাব, প্রত্যেকটা সেক্টরের হতাসামূলক অব্যাবস্থাপনা সব সব আছে।

গণতন্ত্র নামে আছে প্রহসনও। আশাবাদী মানুষেরা স্বপ্ন দেখে দেখে রোজ বাজারঘাট করে, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির নিত্য মূল্য বাড়া কমার মধ্যেও প্রয়োজনীয় চাহিদা কমিয়ে নিজেদের মতো করে। আমিও তার ব্যাতিক্রম নই। আমিও ডাক্তারের চেম্বারে গেলে সিরিয়াল ব্রেক করে আগে ডাক্তারের সাক্ষাত পাবার জন্য , সিরিয়াল মেনটেইনকারীর হাতে কুড়ি টাকা ধরিয়ে দেই। মেয়েকে নাম করা স্কুলে ভর্তি করাতে উন্নয়ন ফি নামক (ডোনেসন) উৎকোচ দেই বিশ হাজার টাকা। এর বেশি আমার পক্ষে কখনো কিছু করা সম্ভব হয়নি আজো।

 

আমি জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেইনা অনেক বছর। এ আমার অনীহা। যখন দেখেছি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে। জালভোটের হিড়িক। আমার মনে পরে গেছে তখন। মাত্র ১২/১৩ বছর বয়সে আমার ছোট চাচা আর তার বন্ধুরা আমাকে আর সমবয়সী ফুপু,  মেজো ফুপুকে ভোট কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য নামের ভোট দিতে। যখন ভোটাধিকার প্রয়োগ করার বয়সই হয়নি। কিছুই বুঝিনি তখন। বুঝতাম একটাই মার্কার প্রতি পুরো পরিবারের অমোঘ পছন্দের তীব্র আকর্ষন।

বিবাহিত হবার পরে নাম উঠলো নির্বাচন কমিশনের রেজিস্টার খাতায়। আমিও পেলাম রাষ্ট্রের ভোটের অধিকার। মতিঝিল আরামবাগের কোনো এক স্কুলে স্থাপিত ভোটকেন্দ্রে প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগ করলাম ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে।

মজার ব্যাপার হলো তখনো নিজস্ব পছন্দ বলতে কিছু ছিলোনা। ওই মার্কাটাই ছিলো মেজো চাচার বলা — ‘ভোট দিবি না ?দেলে কিন্তু হানিফ সাইবেরই দিস্’  দ্বিধা হয়নি তখন । তখন এতটাও প্রশ্ন ছিলোনা মনে। গেলো নির্বাচনের আগে আমার এক স্কুল সহপাঠী আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো ভোট দেব কিনা? বিতন্ডায় জড়িয়ে পড়েছিলাম। অল্পতেই ক্ষান্ত দিয়েছি। কথা বাড়াবার মতো কথা নেই আমার কাছে।

 

আমাকে আজ পর্যন্ত কেউ প্রশ্ন করেনি বা বলার সুযোগ পায়নি আমি কেন এ দেশে আছি? আমিও সুযোগ পাইনি ভাবার….  আমি কেন ‘ জয়-এর পরে বাংলা বলতে পারিনা। সবাই যেমন করে বলে — জয় বাংলা।  জয় বলার বাংলা কেন বললাম না বা বলছি না এই দন্ডে আমাকে কেউ অনায়াসেই দেশান্তর করে দেবেন? আমার বোধ আমি লালন করি আমার মতো।

 

কিরে ? ভালো আছিস ?

–বেঁচে আছি। তুই?

আমিও

— আলহামদুলিল্লাহ্। বেঁচে থাকা জিন্দাবাদ

জিন্দাবাদ, জয় বাংলা

 

–হ, জয়…..

বাংলা কইলিনা?

–কইলাম না

ক্যা কইলিনা?

—মন চাইলো না

ও তুমি জয় কইতে পারবা আর বাংলা কইতে পারবা না?

–যা বোঝার বোঝ

সবাই যদি আজ বাংলাকে ঘৃনা করি তবে এদেশ বাঁচবে কিভাবে?

–তুই বাঁচা

তাইলে তুই এদেশ ছাইড়া যা

—তুই কইতে কেডা

যেহেতু আমি দেশ বাঁচানোর দায়িত্ব নিছি

–মুখে আ-কথা আইছিলো, কইলাম না……

কি কবি?

তুই বাংলাই কইতে পরোনা

জয় কইয়া থাইময়া গেলি!

–এই তুই আমার মেজাজ খারাপ করতে আমারে নক দেও?

যত্তসব অর্থহীন টপিক লইয়া  ঝগড়া করার তালে থাহো খালি!!

মেজাজ খারাপ হয় ?

তোর মতো অত জ্ঞানতো আমার নাই।

 

আমার জ্ঞান আমারই থাকুক। খাটো কিংবা বড় যাই হোক। আমি প্রকাশে অক্ষম আমি কি অনুভব করি এ দেশ নিয়ে! আমি শুধু প্রশ্ন করি নিজেকে জাতীয় সঙ্গীতে আমার চোখ কেন কাঁদে???

১৯৭জন ৬৭জন
0 Shares

১৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য