ছোটবেলা থেকে কঠিন অনুশাসনে বড় হওয়া আমি, শৈশবের কত যে স্মৃতি আমার যা হয়ত আজীবনই না বলা হয়ে থাকবে, আজ যখন সুযোগ পেয়েছি ম্যাগাজিনের অছিলায় হলেও আপনাদের সামনে আমার স্মৃতির কিছু চুম্বক অংশ তুলে ধরছি আমার পাঠকের জন্য।

ছোটবেলায় আমি ঈদ জামাতে যেতাম আমার নানার সাথে, নানা আমাকে নিয়ে যেত কাছাকাছি এক মসজিদে, সেখানেই নামাজ পড়তাম আমি আর নানা, ঈদের দিন ভোরবেলায় আম্মা ঘুম থেকে ডেকে দিতেন আমাদের ভাই বোনদের, আমাদের সকলের কাজ ছিলো ঘুম থেকে উঠেই ফ্রেস হয়ে গোসল করা, তাও আনকোরা নতুন লাক্স সাবান দিয়ে, পুরানো লাক্স সাবানটা সরিয়ে রাখা হতো, শহরের দুইতলা বিশিষ্ট বাড়ী আমাদের, বাথরুমের অভাব ছিলোনা, না ছিলো লাইন দিয়ে বসে থাকা, সবাই যার যার মতো গোসল শেষে রেডি হতাম নামাজে যাওয়ার জন্য, আম্মা হাল্কা কিছু খাবার দিতো যাওয়ার আগে আর তা খেয়েই নানার হাত ধরে ছুটতাম নামাজে যাওয়ার জন্য, জামাত শুরু হতো খুব সকালেই, নামাজ শেষে নানাকে দেখতাম সবার সাথে কোলাকুলি করতে, আমি পিছন থেকে নানার পাঞ্জাবি ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম যেন হারিয়ে না যাই।

নানার হাত ধরেই বাসায় আসতাম, আব্বা তখনো ফিরেননি আব্বার নিজ বাড়ীর মসজিদ থেকে, পরে বুঝেছিলাম আব্বা কবরস্থানে যেতেন কবর জিয়ারত করতে এরপর উনি আবার নিজ এলাকায় গিয়ে উনার মুরুব্বিদের সাথে দেখা করে আসতেন।
আমি প্রথমে গিয়ে আম্মাকে সালাম করে হাত পাততাম আমার ঈদ বকশিসের জন্য, আম্মা আলমিরা খুলে নতুন নোটের পাঁচ দশ টাকা দিতেন, তা পেয়েই তো আমি আত্মহারা, আম্মা আমাদের সবাইকে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে প্রথমে দিতেন দুধ সেমাই, আম্মার দুধ সেমাই কতো যে মজা হতো তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবোনা, অন্য বাসায় একি জিনিস খেয়ে আমি কখনো শান্তি পেতামনা, বিড় হওয়ার পর জেনেছি এর প্রিপারেশনটা ছিলো কম্পলিট আলাদা, সাধারণ সেমাইকে (ব্রাউন কালারের লম্বা সেমাইটা) প্রথমে ঘি দিয়ে ভাজতেন, এরপর দুধ চিনি দিয়ে রান্না করতেন, এরপর ঠান্ডা হয়ে এলে ফ্রিজে রাখতেন হাল্কা ঘন হওয়ার জন্য।
সেমাই খেয়ে আমরা যেতাম নতুন কাপড় পড়তে, এর মধ্যে আব্বা বাসায় ফিরতেন, আমরা সবাই লাইন ধরে উনাকে একের পর একজন সালাম করতাম।

আব্বা আসার পর আম্মা ঈদের জন্য রান্না করা পোলাও, কোরমা, রোস্ট ইত্যাদি টেবিলে সাজিয়ে আমাদের সবাইকে ডাকতেন খাওয়ার জন্য, আব্বা সহ সবাই হাজির হতাম ডাইনিংয়ে খাওয়ার জন্য, আম্নার হাতের রান্না আমাদের আত্মীয় মহলে সুপ্রসিদ্ধ, সবাই এক বাক্যে বলতেন উনার হাতে যাদু আছে, আমরা সবাই পেটপুরে খেয়ে উঠে তোড়জোড় করতাম আত্মীয়দের বাসায় যাওয়ার জন্য, আব্বা আমাদেরকে নানাবাড়ি পাঠিয়ে দিতেন, ওখানে সবাইকে সালাম করে ওখান থেকেই হতো শুরু আমাদের বেরানো, আমাদের ছোটো নানার উপর দায়িত্ব দেওয়া হতো আমাদেরকে নিয়ে বেরানোর, উনি আগে থেকে চার পাঁচটা তিন চাকার বেবি টেক্সি রেডি করে রাখতেন আমাদেরকে নিয়ে বেরানোর জন্য।
আমরা সবাই রাস্তায় এসে ভীড় করতাম টেক্সিতে উঠার জন্য, আমাদের সাথে বেড়াতে যেতেন আমাদের যত খালা মামা ছিলো তারা সবাই, এর মধ্যে এতো বড় ভীড় দেখে সেখানে হাজির হতো প্লাস্টিকের চশমা বিক্রেতা, বেলুন দিয়ে বাঁশি বিক্রেতা, হাতে ঘুরিয়ে টমটম করা টমটমি বিক্রেতা, বেলুন সহ আরো কতো কিছু নিয়ে আসতো বিক্রি করার জন্য, আমরা প্রায় সবাই প্লাস্টিকের লাল, হলুদ, নীল চশমা কিনে চোখে লাগিয়ে হাটতাম আকাশ দেখে দেখে, কারণ চশমা চোখে দেওয়ার পর তো দুনিয়াটাই যে রঙ্গিন হয়ে যেত, সাথে কিনতাম বেলুনের বাঁশি ভেঁপু, টমটমি আরো কতো কিনা কিনতাম, আরো একটি খেলনা আমার অতি প্রিয় ছিলো আর তা হলো ছোট ছোট কালো, সিলভার রঙের টিনের তৈরি পিস্তল, যাতে থাকতো লাল প্যাচানো কাগজে ফোটা ফোটা বারুদ, পিস্তলের ভিতর দিয়ে পিছনে টেনে লাগানো হতো যাতে ট্রিগারে চাপ পড়লে পিছনের আরেকটা অংশ টাস করে ধাক্কা দিতো বারুদে এবং শব্দ করতো বুম করে।
এরপর ছোটো নানার সাথে শুরু হতো আত্মীদের বাসায় যাওয়া, পুরা চট্টগ্রাম ঘুরে ঘুরে এ আত্মীয়, ঐ আত্মীয়দের বাসায় যেতাম বেড়াতে, বেড়াতাম কম ঈদি ছিলো আমাদের টার্গেট, আমরা সারাদিন ঘুরে ফিরে রাতে বাসায় ফিরে আসতাম।

আরেক ঈদের কথা বলি, আমার আব্বা নতুন কার ইম্পোর্ট করে এনেছেন ব্র্যান্ড ছিলো মাজদা, সেইবার আমরা প্রথম আমাদের ঈদ বেড়ানো হচ্ছে কারে করে, এরপর থেকে থেকে আমরা নিজেদের গাড়ী নিয়েই আত্মীয়দের বাসায় বেড়াতে যেতাম ঈদে, আমাদের সাথে বড়জন থাকতেন আমাদের ছোট খালাম্মা, খালাম্মা ঈদের তিন চারদিন আগেই প্ল্যান কোথায়, কার বাসায় আগে যাবো, একদম শেষে কার বাসায় যাবো, তখন আমাদের রুটিন হতো দুপুরে যাবো মেঝো খালাম্মার বাসায়, দুপুরে প্রতি ঈদে আমিরা মেঝো খালাম্মার বাসায় খেতাম, আগেই বলে রাখার ফলে খালু আমাদের জন্য খাসির মাংশ, খাসির কলিজি ফ্যাফরা, গরুর পায়া (যাকে চট্টগ্রামের ভাষায় নলা বলে), গরুর ব্রেইন স্পেশাল ভাবে কিনে আনতেন, যা খালাম্মা মজাদার ভাবে রান্না করতে শুধু মাত্র আমাদের জন্য, আমরা দুপুরে উনার বাসায় পোঁছানোর পর সাথে সাথে ডাইনিং টেবিলে বসে যেতাম খাওয়ার জন্য, পেট পুজা শেষে ঈদি নিয়ে দ্রুত গাড়ীতে করে রওনা হয়ে যেতাম অন্য আত্মীয়দের বাসায়।

আরেকবারের ঈদের ঘটনা বলি, ঈদের দিন সকাল থেকে সেই বৃষ্টি, কোনো থামাথামি নেই, প্রচুর বৃষ্টি ছিলো সেদিন, আব্বা বললেন আজ আর বেরুনোর দরকার নেই, আগামীকাল বৃষ্টি না থাকলে বেরিয়ে এসো, এইদিকে আমাদের ছোট খালাম্মা মানবেনই না, আজকে ঈদের দিনে বের না হলে কোনদিন হবো, ঈদের দিনের মজাই আলাদা, আমরা বেরুবো।
আব্বাও নাছোড়বান্দা, উনি নাতেই থেকে গেলেন, খালাম্মা কেঁদেকেটে অস্থির, উনি আমাদেরকে নিয়েই বেরুবেন।
শেষে আব্বা অনুমতি দিলেন এক শর্তে আর তা হলো, আজ বেরুলে আগামীকাল বৃষ্টি না হলেও আর বেরুনো যাবেনা।
খালাম্মা সহ আমরা তো এক পায়ে খাড়া, ঝটপট রেডি হয়ে বেরুলাম বেড়াতে সেই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, আমরা বলি আমরা সেরা, বৃষ্টি বলে সেই সেরা, এমনই অবস্থায় প্রথমে গেলাম মেঝো খালাম্মার বাসায়, অর্ধেক পথ যেয়ে আটকে গেলাম কারণ উনাদের গলিতে পানি, ভিতরে যায়া যাবেনা, আমরা ওখান থেকে আরো দুই এক জায়াগাতে গেলাম কিন্তু বৃষ্টি যেন আরো বেড়েছে, এক পর্যায় রণে ভঙ্গ দিলাম আমরা, ফিরে এলাম বাসায়, আমার আব্বা তো রেগে আগুন, বলছেন আমি তো বলেছিলাম তবু জেদ করে গেলে, এখন বুঝো মজা, খালাম্মার মুখে রা নেই, কি আর বলার আছে, উনিই তো জেদ করে গেলেন, জানা গেল সারাদিন কোন আত্মীয়ই বেড়াতে আসেননি, স্বাভাবিক এই বৃষ্টির মধ্যে কেই বা আসবেন?
পরদিন সকালে ঝলমলে রোধ উঠলো, দলে দলে আত্মীয়, অনাত্মীয় সবাই ঈদে আমাদের বাসায় আসতে লাগলেন বেড়াতে আর আমরা লাওয়ারিসের মতো শুধুই চেয়ে রইলাম, খালাম্মা তো পারেননা নিজের হাত নিজেই কামড়িয়ে খেয়ে ফেলেন।

আমাদের ছোটবেলার ঈদের বেড়ানো ছিলো সাতদিনের, কেমন সাতদিনের ছিলো এখন তাই বলছি।
আমরা প্রথম দুই তিনদিন বেড়াতাম ছোটো খালাম্মাকে নিয়ে, এই কয়দিন আম্মা বাসায় থাকতেন আত্মীয়দের আনাগোনার কারণে, এরপর তিনদিনের দিন আম্মা বেরুতেন আত্মীয়দের বাসায় বেড়ানোর জন্য, সাথে খালাম্মা সহ আমরা তো আছিই, সেই কি বেড়ানি কাহাকে বলে, আনন্দই আনন্দ।

আমার শৈশবের ঈদ আনন্দ আজকাল দেখি ফিকে হয়ে এসেছে, এখন তো সারাদিনই বাসায় থাকি, আত্মীয়, বন্ধু বান্ধবের আনাগোনা হয়, তাদের আপ্যায়নে ব্যস্ত থাকি, একটু সময় পেলেই ঘুম দিই কিন্তু আমি এখনো চেষ্টা করি আমাদের বাচ্চারা যেন আমাদের মতোই আনন্দ উপভোগ করতে পারে, ওদেরকেও বেড়াতে পাঠাই গাড়ী দিয়ে, সারাদিন ঘুরে রাতের দশটা এগারোটায় ফিরে আসে, আমাদের মতোই তারাও বাসায় ফিরে হিসাব করতে বসে কে কত ঈদি পেয়েছে, কত আনন্দ তাদের, কিন্তু আমি ভাবী আমরা যে আনন্দ করতাম, যে উৎসাহ থাকতো আমাদের, তা কি তাদের আনন্দের সাথে মিলে, মনে হয়না।
আমাদের সেইসব দিন ছিলো অন্য ধরণের, এখন এই যান্ত্রিক সভ্যতার মাঝে আমাদের সন্তানেরা সেইসব আনন্দ তো আর পাচ্ছেনা, আফসোস।

পরিশেষে সকল পাঠক, ব্লগার এবং ভাই আপুদের জানাই ঈদ শুভেচ্ছা, ঈদ মুবারক।
বারেবারে ফিরে আসুক আনন্দের দিনগুলো
যান্ত্রিকতা বাদ দিন না এই আনন্দের দিনে।

সমাপ্ত।

৪৭৩জন ২৬৭জন
29 Shares

৩০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য