আমাদের সেই দিন!
আহা, সেই আড্ড!
—————-
অনেক অনেক দিন আগের কথা………..
কথার পিঠে কথা, আরও কথা, কথায় মশগুল সবাই। এই কথার মাঝেই পপি উঠলো, বেরোলো ঘর থেকে। ফিরে এলো মুখে চাপা হাসি নিয়ে। অবশ্য ও সবসময়ই চেপে চেপেই হাসে। অতি ধীর-স্থির কি না! সব কাজেই সে ধীর এবং স্থির। হোক সে লেখাপড়া কিংবা জমজমাট আড্ডা, চাপাচাপির মধ্যেই থাকে। তবে ওর তখনকার ফিরে আসা হাসিটা যেন অন্যদিনের চেয়ে আরও একটু চাপা, আর কেমন যেন একটু রহস্যমাখা। ঘরে অবস্থানরত অন্যদের নজর এড়িয়ে যাবে সেই রহস্য? হতেই পারে না! সবাই মিলে সেই চাপাকুমারীকে চেপে ধরলাম, কী রে, এমন করে হাসছিস কেন? নাহ্, এতেও সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো না, নিঃশব্দে মুক্তোর মতো দন্ত বিকশিত করে যা বললো তা হলো এইরকম, ও যখন ঘরের বাইরে যায়, তখন ওর বড় ভাই, যিনি কিনা ইতোমধ্যেই মাস্টার্স পাশ দিয়েছেন, তিনি নাকি জানতে চেয়েছিলেন, তোর ঘরে অনেক মানুষ মনে হচ্ছে, তারা কে? ও বলেছে, আমার বান্ধবীরা সবাই এসেছে।
সমস্বরে আমরা বললাম, ও এই কথা, তো… এতে এত চেপে হাসার কী হলো?
ও বললো, না এতে হাসির কিছু হয়নি, কিন্তু ভাইয়া বলছিলো…..
আবার সমস্বরে আমরা… কী??
ভাইয়া বললো, ওহ, তাই তো কানে তালা লেগে যাচ্ছে, একসাথে এত পাখির কিচিরমিচির কিনা!
বুঝুন কাণ্ড।

সে দিনগুলো ছিলো ঠিক যেন স্বপ্নের মতো। স্কুল পেরিয়ে সদ্য ভর্তি হয়েছি কলেজে। লেখাপড়াটুকু ছাড়া নেই চিন্তা, নেই কোনো ভাবনাও। একেবারে মুক্ত বিহঙ্গ যাকে বলে। প্রায় দশজনের একটা দল ছিলো আমাদের সেই স্কুল থেকেই। জন্মদিন ছাড়াও অতি তুচ্ছ উপলক্ষ উপস্থিত করে আজ এর বাড়ি তো কাল ওর বাড়ি। সারাদিনের ক্লান্তিহীন আড্ডা আর মজার মজার খাদ্য গলাধকরণ। তবে এই আড্ডাগুলোর সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় ছিলো, সবাই বক্তা। শ্রোতার সংখ্যা জানতে চেয়ে লজ্জা দেবেন না প্লিজ! কেহ কাহারো কথা মনোযোগ সহকারে শুনিবার বিশেষ আগ্রহ বোধ করিতাম না। আমরা বলিয়া এবং সিকি পরিমাণ না বুঝিয়াই হাসিয়া গড়াগড়ি খাইতে বিশেষ পারদর্শী ছিলাম। আহা, সে কী দিন ছিলো আমাদের!

ভাবছেন, এই আড্ডায় ছেদ পড়েনি কখনও? পড়েছে। কলেজ শেষ হলো, ছিটকে পড়লাম একেকজন একেক দিকে। কেউ ইউনিভার্সিটিতে ভিন্ন ভিন্ন ডিপার্টমেন্টে, কেউ মেডিকেল কলেজে। কমে গেলো আড্ডার সংখ্যা। নতুন জায়গায় নতুন বন্ধু, নতুন করে আড্ডা জমতে সময় লেগে গেলো কিছুটা। তবুও জমলো একসময়। তবে স্কুলজীবনের সেই মধুময় সময় যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে গেলো কোথায়! তারপর একে একে সবার বিয়ে, সংসার, চাকরি…. আরও দূরে সরে গেলো সেই সময়টা। এখন মাঝে মাঝে মনে পড়ে আর চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই নির্মল মুখগুলো। যে মুখগুলোয় কখনও কোনো জটিলতা ছাপ বসাতে পারেনি।

আরে, নিজের আড্ডা নিয়ে মন কেমনের হু হু বাতাস বইয়ে দিচ্ছি যে! ধুর, আড্ডা তো আড্ডা, প্রচণ্ড গরমে একরাশ হিমেল হাওয়া যেন! ও হ্যাঁ, এই দেখুন, গরমের কথা চলে আসায় মনে পড়ে গেলো আরেক আড্ডার কথা। এ আড্ডার বর্ণনা না দিলে এ লেখাটা লেখার কোনো মানেই হয় না।
তো সেই সেদিনের আড্ডাবাজ আমার বিয়ে হয় আরেক আড্ডাবাজের সাথে, যার সাথে কিনা বিবাহ পূর্ব হৃদয় লেনদেন ছিলো আমার। বিয়ের আগে কত মধুর বাক্যই না শুনেছি তাঁর মুখে। “আমাকে ছাড়া জীবনই চলে না” এই ধরনের আরকি। কিন্তু বিয়ের পর কোথায় কী! মোদ্দাকথা, “আড্ডা ছাড়া তার জীবন চলে না” এই কঠিন সত্যটি আমার সামনে উন্মোচিত হয়ে গেলো বিয়ের একেবারে দুই একদিনের মধ্যেই। পাড়ার মোড়ে, ভাঙ্গাচোরা চা- এর স্টলে সন্ধ্যে হতেই জমে উঠতো সেই আড্ডা। ভ্যাপসা গরম, চড়চড়ে গরম, হালকা গরম, ঘোর বর্ষা কিংবা কনকনে শীত, বাধা হয়ে দাঁড়ায় সে আড্ডায়, সাধ্য কী! ঠিক যেন কোনো নেশাদ্রব্যে আসক্তি। উকিল মানুষ, কোর্ট থেকে ফিরে শ্রান্তি ক্লান্তি সব নিমেষেই ঝেড়ে ফেলে, সন্ধ্যে হলেই ছটফট করতে করতে বেরিয়ে যেতেন আড্ডার উদ্দেশ্যে। ফিরতেন রাত এগারোটার পর। যেন পৃথিবীতে এমন কোনো শক্তি নেই তাঁকে আটকায়। আর আমি তো আমি, আটকালে শুনছে কে? নতুন বউ হয়ে কী অবহেলাটাই সয়েছি, ভাবুন একবার! যাইহোক, সন্দেহের বশবর্তী হয়ে দুই একবার যে ওই আড্ডার বিষয়ে খোঁজ খবর করিনি, তা কিন্তু নয়। হাজার হোক তাঁর বউ আমি, কোনো অবৈধ সম্পর্ক টম্পর্ক আছে কিনা, কেনই বা এত রাত করে বাড়ি ফেরে, জানতে হবে না বলুন? তো করেছিলাম খোঁজ, কিন্তু তেমন সন্দেহজনক কিছুই পাইনি। ওই রাজনীতি, সমাজনীতি আর সংসারনীতি নিয়েই ব্যস্ত তাঁরা। ভাবলাম, হয়তো বয়স বাড়ার সাথে সাথে কমে যাবে আড্ডার নেশা, একটু হয়তো নজর দেবেন সংসারে। কিন্তু আমার সে ভাবনা ভাবনা হয়েই রইল। দিন যায়, মাস যায়, বছরের পর বছর যায়, কোনো হেলদোল নেই আড্ডার। বছরের ছয়টি ঋতু সমানভাবে তাঁদের আড্ডার সাক্ষী হয়ে রয়।

কিন্তু তারপরেও কথা থেকে যায়। এ আড্ডার রঙও অনেকটা ফিকে হয়ে আসে। কেন? বলছি বলছি। যুগের হাওয়া, যুগের হাওয়া লাগে এই আড্ডাতে। হাতে হাতে আসে স্পর্শকাতর ফোন। সে স্পর্শকাতরতা কাতর করে তোলে আড্ডাকেও। আলোচনার তীব্রতা বোঝাতে পিঠে চাটি মারার চেয়ে আঙুল ছুঁইয়ে ফোনকে জাগ্রত করতেই যেন আগ্রহ বেশি। আড্ডা জমে উঠছি উঠছি করছে কি করছে না, টুং করে নীলাভ আলোয় মেসেঞ্জারে ভেসে উঠছে কোনো সুদূরের মুখ। ছেদ পড়ছে আড্ডায়, বিরস বদনে নিরস আড্ডা আর কত টেনে নেয়া যায়! মন তো টানছে সুদূর! বর্তমানে পঞ্চাশোর্ধ এ আড্ডাও এখন যেন কেবল অভ্যেস, প্রাণহীন রঙহীন এক কঠিন অভ্যেস।

আর বর্তমান প্রজন্ম? কী অবস্থা তাদের? বোঝে কি তারা, আড্ডা কাকে বলে? কী মোহ, কী মায়া, কী এক অদ্ভুত আকর্ষণ, কী গভীর এক নেশা, কী এক অন্তরের টান এই আড্ডাকে ঘিরে, বুঝতে পারবে কী তারা? আড্ডা নিয়ে কী এক অপূর্ব আনন্দময় বেদনাবোধ কাজ করে আমাদের মতো কিছুটা পুরোনোদের, জানতে পারবে কি তারা কোনোদিনই? সবার হাতে স্পর্শে কাতর হওয়া ফোন। যতটা সংক্ষেপে শেষ করা যায় একে অন্যের সাথে কথোপকথন, ততই বেশি সময় দিতে পারবে ফোনে। তত বেশি লাইক, কমেন্ট ভার্চুয়াল জগতে। কোথা দিয়ে যে রাত কেটে যায় বুঝতেই পারে না তারা। পরদিন ঘুম ভাঙে বেলা বারোটায়, তারপর ছুট ছুট। সময় কোথায় আড্ডা দেয়ার। এই ছুটোছুটির মাঝেই যে চোখ বোলাতে হবে, ভার্চুয়ালে। চা – এর স্টলে এককাপ চা খাওয়া যায় বড়জোর। কিন্তু আড্ডা? ভাবা যায়!

মোড়ের দোকানে, কিংবা বাড়ির রকে আড্ডা এখন শুধুই অতীত, যে অতীত রঙিন স্বপ্নে মোড়ানো। আজকের প্রজন্ম না জানুক, আমরা তো জানি, “আড্ডা” শব্দটা মনে এলেই বুকের গভীরে কোথাও যেন মধুর এক সুর বেজে ওঠে। যেন তপ্ত দিনে মিঠে হাওয়া পরশ বোলায়। যেন ছুঁয়ে যায় হৃদয়ের অলিগলি। সেই অলিগলি থেকে নিঃসৃত হয়, আহা, আমাদের সেই দিন!
আহা, সেই আড্ডা!

২৪৯জন ৭৯জন
7 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য