ধর্ষণ একটি মারাত্মক অপরাধ। বর্তমানে তা সংক্রমিত ভাইরাসের মতো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত এমনকি পাগল ও ভিক্ষুকও বাদ পড়েনি ধর্ষণের মতো জঘন্য অরাধের শিকার হতে। ধর্ষণের এমন অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের সমাজের অবস্থা অদূর ভবিষ্যতে অন্ধকার থেকে অন্ধকারময় জগতে প্রবেশ করবে নিঃসন্দেহে।

এখন আলোচনা করা যাক ধর্ষণ কি? সাধারণত বলপূর্বক কারো সাথে যৌন মিলনে লিপ্ত হওয়াকেই ধর্ষণ বলা হয়। উইকিপিডিয়ার মতে, ধর্ষণ’ এক ধরনের যৌন আক্রমণ। সাধারণত, একজন ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিরেকে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম বা অন্য কোনো ধরনের যৌন অনুপ্রবেশ ঘটানোকে ধর্ষণ বলা হয়। ধর্ষণ শারীরিক বলপ্রয়োগ, অন্যভাবে চাপ প্রদান কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে। অনুমতি প্রদানে অক্ষম (যেমন- কোনো অজ্ঞান, বিকলাঙ্গ, মানসিক প্রতিবন্ধী কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি) এরকম কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত হওয়াও ধর্ষণের আওতাভুক্ত। ধর্ষণ শব্দটির প্রতিশব্দ হিসেবে কখনো কখনো ‘যৌন আক্রমণ’ শব্দগুচ্ছটিও ব্যবহৃত হয় বলে উইকিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে বিশেষ ভাবে লক্ষণীয় যে, যৌন হয়রানির ঘটনা আমাদের দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনার বেশিরভাগই ধামাচাপা পড়ে যায় এবং থেকে যায় অনালোচিত। এর কারণ আমাদের সামাজিক মনমানসিকতা। সমাজের হীনমন্যতার কারণে আমাদের সমাজের নারীরা ধর্ষণের শিকার হলেও সামাজিক লোক লজ্জার ভয়ে তা প্রকাশ করতে চান না। কারণ ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ হলে তাদেরকে সামাজিক ভাবে হয়রানীর শিকার হতে হয় এবং ধর্ষণের পর নিজেদেরকেই হতে হয় লাঞ্ছিত। ফলে অপরাধ করেও পার পেয়ে যায় অপরাধীরা। এছাড়াও এসব ধর্ষণের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, অপরাধ প্রমাণ, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। ফলে সমাজে বীরদর্পের মত ঘুরে বেড়ায় ধর্ষণকারীরা।

আমাদের সমাজকে এহেন সামাজিক অবস্থা থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে। আমাদের সামাজের মনমানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। আমাদেরকে ভাবতে হবে ধর্ষিতারা অপরাধী নয়। তাদেরকে সামাজিক মর্যাদা দিতে হবে এবং তাদেরকে তাদের দূর্দিনে পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের মনে সাহস যোগাতে হবে এবং মামলা মোকদ্দাসহ সার্বিক ভাবে সহযোগিতা করতে হবে। তাদের মনোবল বাড়াতে হবে এবং এভাবেই ধর্ষকদেরকে বিচারের কাঠগঁড়ায় দাঁড় করাতে হবে।

এখন ধরা যাক বিচার ব্যবস্থার কথা। আমাদের দেশের প্রচলিত আইন ধর্ষণের বিচার ব্যবস্থায় অনূকুল নয় বলে মনে করেন অনেকেই।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (১) ধারায় ধর্ষণের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে,
(১) যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন।
এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ১৬(ষোল বৎসরের] অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা ২[ষোল বৎসরের] কম বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।

(২) যদি কোন ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা উক্ত ধর্ষণ পরবর্তী তাহার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিতা নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যুন এক লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন।

(৩) যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষন করেন এবং ধর্ষণের ফলে উক্ত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহা হইলে ঐ দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যুন এক লক্ষ টাকা অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন।

(৪) যদি কোন ব্যক্তি কোন নারী বা শিশুকে-

(ক) ধর্ষণ করিয়া মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন;

(খ) ধর্ষণের চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক দশ বত্সর কিন্তু অন্যুন পাঁচ বৎসর সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন।

(৫) যদি পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে কোন নারী ধর্ষিতা হন, তাহা হইলে যাহাদের হেফাজতে থাকাকালীন উক্তরূপ ধর্ষণ সংঘটিত হইয়াছে, সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ ধর্ষিতা নারীর হেফাজতের জন্য সরাসরিভাবে দায়ী ছিলেন, তিনি বা তাহারা প্রত্যেকে, ভিন্নরূপ প্রমাণিত না হইলে, হেফাজতের ব্যর্থতার জন্য, অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অন্যুন পাঁচ বৎসর সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যুন দশ হাজার টাকা অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হইবেন।

উপরোক্ত আইনের ধারাগুলো আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থায় ধর্ষণের বিচার। এখন দেখা যাচ্ছে যে, প্রত্যেক অপরাধের জন্য আদালত চায় উপযুক্ত প্রমাণ। আমাদের দেশে আইনের ফাঁক-ফোঁকরের দুর্বলতার কারণে ধর্ষণের মামলায় অনেক ধর্ষক পার পেয়ে যাচ্ছে। ধর্ষণ মামলার বিচারগুলো না হওয়ার কারণগুলো তুলে ধরে বিবিসির কাছে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বিশিষ্ট আইনজীবি ব্যারিষ্টার সারা হোসেন। আমি পাঠকদের জ্ঞাতার্থে বিবিসি’র ওই সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরছি।

তাহলে জেনে নিন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন ধর্ষণের বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলেন-

“এখানে একটি বড় কারণ হচ্ছে, যিনি ঘটনার শিকার এবং অন্যান্য সাক্ষীরা যদি থেকে থাকেন, তারা অনেক সময় নানা ধরণের হুমকির সম্মুখীন হয়। সেই হুমকির ক্ষেত্রে তাদের কোন সুরক্ষা থাকেনা,” বলছিলেন সারা হোসেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দন্ডবিধিতে সাক্ষীদের রক্ষাকবচ সীমিত। কেউ ঘটনার শিকার হলে তার নাম প্রকাশ করা যাবেনা কিংবা প্রয়োজন হলে নিরাপদ জায়গার ব্যবস্থা করতে পারে আদালত। কিন্তু এর বাইরে তেমন কোন সুরক্ষার ব্যবস্থার নেই।

বাংলাদেশে এখনো ‘ধর্ষণ’ সংজ্ঞায়িত করা হয় ১৮৬০ সালের দন্ডবিধি অনুযায়ী।

সারা হোসেন বলেন, “আমাদের আইনে এখনো বলা আছে যে একজন যদি ধর্ষণের অভিযোগ করেন, তাহলে বিচারের সময় তার চরিত্র নিয়ে নানান ধরণের প্রশ্ন করা যাবে।”

আইনে এ ধরণের বিষয় থাকার বিষয়টি নারীর জন্য বেশ অবমাননাকর বিষয় বলে উল্লেখ করেন নারী অধিকার কর্মীরা।
আমাদের আইনে এখনো বলা আছে যে একজন যদি ধর্ষণের অভিযোগ করেন, তাহলে বিচারের সময় তার চরিত্র নিয়ে নানান ধরণের প্রশ্ন করা যাবে,” বললেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন

আদালতের জেরা ‘দ্বিতীয়বার ধর্ষণের’ মতো উল্লেখ করে বিবিসির সাক্ষাৎকারে ব্যারিস্টার সারা হোসেন আরো বলেন- ধর্ষণের মামলা নিয়ে যেসব নারী আদালতে দাঁড়িয়েছে তাদের অনেকেরই অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ। অভিযুক্তের আইনজীবীর দ্বারা তারা এমন জেরার মুখে পড়েছেন যা তাদের মর্যাদাকে আরো ভূলুণ্ঠিত করে – এমটাই মনে করেন নারীপক্ষের রওশন আরা।

“আদালতে প্রশ্ন করা হয়, কেন তাকে রেপ করা হলো? কেন সে ওখানে গিয়েছিল? অন্যদের তো ধর্ষণ করা হয়নি, তাহলে তোমাকে কেন করলো? মানে দোষটা চাপানো হয় নারীর উপরে।”

সারা হোসেন বলেন, বিচারকের হাতে অনেক ক্ষমতা আছে। তিনি চাইলে এ ব্যাপারগুলো কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

“কেউ-কেউ করেন, কেউ-কেউ করতে পারেন না, কেউ-কেউ করেন না। একজন ধর্ষণের অভিযোগকারীকে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে – এ বিষয়টা যেহেতু আইনে রয়েছে. সেখানে এ ধরণের প্রশ্ন আসলে বিচারক একেবারে থামিয়ে দিতে পারেন না। উনি হয়তো প্রশ্নের ধরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্তু জেরা একেবারে থামিয়ে দিতে পারেন না।”

তিনি বলেন, এই আইন সংস্কারের জন্য বাংলাদেশের আইন কমিশনের তরফ থেকে সুপারিশও করা হয়েছে। কিন্তু সে বিষয়ে এখনো কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

এখন দেখা যাচ্ছে যে, আমাদের দেশের ধর্ষণের আইন সংস্কার খুব জরুরী। আবার একটি বিষয়ও লক্ষ্য রাখতে হবে যে, ধর্ষণের মামলায় কোন নিরপরাধ ব্যক্তির যেন সাজা না হয়। ধর্ষণের মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধেও কঠোর আইন করা দরকার। যাতে করে কেউ ধর্ষণের মিথ্যা মামলা দায়ের করার সাহস না পায়।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ধর্ষণের শাস্তি বিভিন্ন রকম। যেমন যেমন যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ষণের শাস্তি ধর্ষিতার বয়স এবং ধর্ষণের মাত্রা বিবেচনা করে সর্বোচ্চ ৩০ বছরের সশ্রম কারাদন্ড। আফগানিস্তানে ধর্ষনের শাস্তি ৪ দিনের মধ্যে ধর্ষককে গুলি করে হত্যা করা। চীনে ধর্ষণের শাস্তি মেডিকেল পরীক্ষার পর ধর্ষণ প্রমাণিত হলে সরাসরি মৃত্যুদন্ড। রাশিয়ায় ধর্ষণের শাস্তি সর্বোচ্চ ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। মঙ্গোলিয়ায় ধর্ষককে ধর্ষিতার পরিবারের হাতে তুলে দিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি আরবে ধর্ষণের শাস্তি শুক্রবার জুম্মার নামাজ শেষে জনসমক্ষে শিরচ্ছেদ করে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশসহ আরব বিশ্বের দেশে ধর্ষণের শাস্তি পাথর ছুঁড়ে মৃত্যুদন্ড, ফাঁসি, হাত-পা কাটা, ধর্ষকের যৌনাঙ্গ কেটে মৃত্যু কার্যকর, বিষাক্ত ইনজেকশন পুষ করে মৃত্যুদন্ড কার্যকর। মালেশিয়ায় ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড। দক্ষিণ আফ্রিকায় ধর্ষণের শাস্তি ২০ বছরের কারাদন্ড।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে আমাদের দেশে ধর্ষণের শাস্তি এত লঘু কেন? ধর্ষণের পাপ তো লঘু নয়? আমাদের দেশের আইন প্রণেতাদের কাছে সুশীল সমাজের দাবী ধর্ষণের আইন সংস্কার করে মৃত্যুদন্ড করা বা যে কোন কঠোর সাজা প্রদান করা।

লেখক ঃ কাজী জহির উদ্দিন তিতাস, সভাপতি, জাতীয় সাংবাদিক ক্লাব, কেন্দ্রীয় কমিটি।

১৬২জন ১৮জন
29 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য