আমাদের গল্প (ছুটির দিন)

রোকসানা খন্দকার রুকু ২১ জুন ২০২২, মঙ্গলবার, ১০:০৭:০৯অপরাহ্ন গল্প ১০ মন্তব্য

মানুষটাকে আমি এতোটা ভালোবাসতাম তা আজ অনুভব করছি। ঘন বর্ষাতেও জীবন জুড়ে যেন খরখরে চৈত্র। তার সমস্ত বিরক্তিগুলো যেন ভালোলাগা হয়ে ফিরে ফিরে এসেছে। সাত সকালে কাজে বিরক্ত করা তার হাতটা কোমরে পাবার আশায় ঘেমে উঠছি। ভোর বেলাতে তাকেও যেন আমারও দরকার।

যে মেয়েটাকে কাছে পাবার জন্য ব্যাকুল থাকতাম। বাবা বাসায় নেই বলে হোস্টেল থেকে সেও চলে এসেছে। আমাকে জড়িয়ে  আহ্লাদীপনা করছে, সাথেই  ঘুমুচ্ছে তবুও আমি ‘নবাবু’ কেই ভীষন রকম মিস করছি।

কেবলই মনে হচ্ছে- আমি না হয় রাগের মাথায় বলে ফেলেছি। রাগে লিখে দিয়েছি।  রেগে গেলে আমি তো কতো কথাই বলি। তাই বলে সত্যি ভেবে তুমিও এ কাজটা করতে পারলে ‘ নবাবু’।

দুমাস হতে চললো নবাবুর টুরে যাবার। একবারের জন্যও আমাকে ফোন দেয়নি। কথাও তেমনি ছিলো, আমিও তাকে ফোন দিয়ে বিরক্ত করবে না, সেও ফোন দেবে না। দেখি মেয়ের সাথে কথা বলে সময় নিয়ে। আমি তাকালেই মেয়ে উঠে যায়। মনে হয় গোপন ষড়যন্ত্র চলছে।

আমাদের প্রায় রাতেই ঝগড়া হতো। আমি কম বললেও সে বেশি এক্সাইটেড হয়ে পড়ে। আমাকে বিয়ে করে ভুল করেছে। সারাখন নিজের ক্যারিয়ার, কাজ নিয়ে পরে থাকি। তার কলিগের বউরা যেমন আহ্লাদীপনা করে, নানা জায়গায় বেড়াতে যায়, সাজুগুজু করে আমি তার কিছুই করিনা। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা তার অন্যকিছুতে।

 

আমার বেশ ঘুমের সমস্যা। ভোর রাতেই গভীর ঘুমটুকু আসে। নবাবু সারারাত নাক ডেকে ঘুমায়। ভোরে তার আমাকে জড়িয়ে ঘুমুতে ইচ্ছে করে। একদম বুকে পিষে ফেলার মতো আমায় চেপে ধরে। আমার ভালো লাগার বদলে দম বন্ধ হয়। শুধু জড়িয়ে ধরা হলে ঠিক থাকতো, অন্য আবদারও করে বসে। আমার কলেজ করতে হবে আর সবসময় মনও চায় না। বরাবর আমি এ ব্যাপারে তার থেকে পিছিয়ে। বয়স যতো বাড়ছে তাতে সমস্যা আরও বাড়ছে।তখন বাধ্য হয়ে আমাকে বিছানাই ছাড়তে হয়।

তাকে বোঝাতে পারিনা সামনে বসে থাকা কতগুলো ভবিষ্যতের সাথে কথা বলতে যথেষ্ট মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়, পড়াশোনার দরকার হয়। লোকে যতটা সহজ ভাবে, শিক্ষকতা মোটেও ততোটা সহজ কিছু নয়।

পরে যদিও ভুলে যাই তবুও এই একটাই আমাদের প্রায়ই রাত, সাত সকালে ঝগড়ার কারণ। ক্লাসের কথা বললেই বলে-

কলেজে তো বইদেখে কয়টা ক্লাসই নিবা। এ আর এমন কি? আর আমি ধরলেই তোমার ঘুম ভাঙ্গে সেটা না হয় ঠিক আছে। কিন্তু বাইরে এতোদিন আমার একা থাকা সম্ভব না। সারাজীবনই তোমার এসব সহ্য করলাম। এখন আমার উচিত অন্যরা যেমন ছয়, নয় মাসের জন্য বিয়ে করে। কিংবা কন্ট্রাক্টে নিয়ে ট্রেনিং এর নাম করে বাইরে গিয়ে মজা করে আসে সেরকম করা।

– এতোটা নোংরা তুমি। তোমার যখন এতো সমস্যা অন্যরা যা করে তুমিও তাই করো। কন্ট্রাক করে, বিয়ে করে নিয়ে যাও। পারলে তাকে বাকি জীবনও রেখে দাও। কারণ তোমার যত্ন নয়, শরীর দরকার! এ মাসে তো মালয়েশিয়া যাবে তখন একটারে নিয়ে যেও। আমি যাবো না কারন তোমার ভাবী ভাবী বলে গায়ে পরা কলিগদের আমার ভালো লাগে না। আর তোমার বুড়ো বয়সের ভিমরতিও ভালো লাগে না। আমার বয়স হচ্ছে। সববয়সে সব ভালো  লাগে না। আর সাইকোলজিও বই দেখে পড়ানো যায় না।

–  চাকরীর দোহাই দাও। ওটা ছেড়ে দিলেই পারো। কজন আমার মতো লোকের বউ চাকরী করে? আর আমাদের দরকারও নেই।

আমি আর কথা না বাড়িয়ে  উঠে গেলাম। তাকে কষ্ট দিতে চাই না। হতে পারে আমাদের পয়সা দরকার নেই। কিন্তু আমি প্রতিবছর নতুন বাচ্চারা এলে তাদের থেকে নতুন বইয়ের গন্ধ পাই। কি সুন্দর মায়াবী কতোগুলো মুখ অপলক চেয়ে থাকে। আমি তার মতো না হলেও আমারও সামাজিক অবস্থান আছে বা থাকা দরকার।

সারদিন অনেক ভাবলাম। আসলেই তাকে আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমার এ সমস্যা বিয়ের পর থেকেই।  আমার উচিত তাকে একটু শান্তি দেয়া। পিয়নকে দিয়ে ৫০০ টাকা দামের ঝকঝকে স্ট্যাম্প পেপার নিয়ে এলাম। তাতে স্পষ্ট করে সব লিখলাম।

রাতে শোয়ার আগে তাকে দিতেই সে ভীষন খেপে গেল। আমি যখন জানালাম- পাগলামী নয়, এ তোমার অধিকার। আমি ঠিক আছি। শুধু মেয়ে যেন কিছু না জানে সেভাবে সব করবে।

নবাবুর খচ্চর আজাজীল শয়তান কলিগ হাসান। যাবার আগে তার ফোন ঘন ঘন আসতো। নবাবু খুব হেসে হেসে কথা বলতো। সে হয়তো ব্যবস্থা করেছে। অনেক রাত অবধি চ্যাটিং করতো।

হঠাৎ দমকা হাওয়ার মতো ধাক্কা লাগলো। মনের ভেতর হু হু বাতাস। হাসানও গেছে সাথে। সত্যি যদি মেয়েটাকে ভালো লাগে, রেখে দেয় তাহলে কি হবে। আমি তো তাকে ছাড়া বাঁচবো না।

কলেজে ছুটির আবেদন দিলাম। প্রিন্সিপাল স্যার ছিলেন না তার জন্য অপেক্ষা করার সময় নেই। চাকরী গেলে যাক! আমার ‘নবাবু’ অন্য কারও হয়ে যাচ্ছে।

মেয়ে আমার কান্ড দেখে অস্থির।

– মা করছো কি? ব্যাগ গুছাও কেন? কৈ যাও?

– মা তুমি হোস্টেলে চলে যাও। আমি মালয়েশিয়া যাচ্ছি ‘নবাবুর’ কাছে।

– এই ‘নবাবু’ আবার কে? তুমি পরোকীয়া করলা কবে?

– ধ্যাত  রাখো তো পরোকীয়া! ‘নবাবু’ তোমার বাবা। সে আমাকে এই নামে ডাকতে বলে। আমি তাকে ডাকতে পারি না। সব আটকে যায়। তাকে অনেক ঠকিয়েছি। আমার উচিৎ হয়নি তার সাথে এতোটা রিজার্ভ হওয়া। আমি তাকে ফেরাতে যাচ্ছি মা। ভালো থেক।

– আমিও যাই। আর তোমার টিকেট, অন্যসব?

– তোমার শাহান আঙ্কেল তো পোর্টে জব করে। তাকে বলে সব ঠিক করে নিয়েছি। চুয়াল্লিশ বছর বয়সে কিশোরীর মতো দুটো কাপড় নিয়ে বেড়িয়ে গেলাম।

ঢাকা থেকে মালয়েশিয়া যেতে দশ ঘন্টামতো সময় লাগে। আমার কাছে মনে হচ্ছে অনন্তকাল। যেন কেয়ামতের সিঁড়ি পাড়ি দিচ্ছি। সারাপথ পানি ছাড়া কিছুই খেতে পারলাম না। একফোঁটা ঘুম এলো না। আর নষ্ট মেয়েটার উপর ভীষণ রাগ লাগছে। কদিন আগে যে চায়না চকচকে চাকুটা কিনেছিলাম ওটা নিতে দিলে ভালো হতো। এই বয়সে একটা খুন করতাম। এই সব খচ্চর মেয়েদের জন্য সমাজটা নষ্ট হচ্ছে।  অবশ্যই ওখানে নেমে কিনবো। তারপর সোজা তার পেটে চালিয়ে দিয়ে জেলে যাবো। তারে ছ’মাসের বিয়েটা করাচ্ছি।

বিমানবন্দর নেমেছি তখন মধ্যরাত, দুটো বাজে। কে আমায় নিতে আসবে, কেথায় যাবো জানিনা। আর আমি তো ‘নবাবুকে’ জানাইওনি। একা দাঁড়িয়ে আছি।

দুরে এক হালকা গড়নের তরুণ দাঁড়িয়ে। চশমা ফেলে এসেছি, ভালো দেখতে পারছি না। তবে পোশাকের স্ট্যাইলটা পরিচিত। কাকে যেন ঘনঘন ফোন করছে। আমি কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না, তবে মাথা কুল আছে। সকাল হবার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

হঠাত দেখি দুরের তরুন ছেলেটি নেই। মনে হলো পাশেই কেউ কফি নিয়ে দাঁড়িয়ে। ভীষন কফির তেষ্টা পেল।

– চশমা ফেলে এসেছেন বুঝি? আর কফির তেষ্টা পেয়েছে আপনার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে? নিন আপনার কফি? মাথা ঠান্ডা হবে।

দুরের তরুন আর কেউ নয় আমার ‘নবাবু’। লং স্লিভের টি শার্ট, সেই হালকা দাড়ি, মাথার চুল বড় হয়ে আরও বয়স কমে গিয়েছে। আগের থেকে আরও পাতলা হয়েছে। কি যে সুন্দর লাগছে। পৃথিবীতে আসলে পুরুষজাতই সবথেকে সুন্দর হয়।

আমি মেয়ের বাবাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলাম। এর আগে অনেকবার সে বিদায় বেলায় বা ফিরে এলে চুমু দিতে বলতো। আজ আমার ভীষন ইচ্ছে করছে ‘নবাবুকে’ সবার সামনে গাঢ একটা চুমু দিতে।

হঠাৎই রাগ হলো। তাকে ছেড়ে দিলাম। দুমাস সে অন্য মেয়েকে জড়িয়ে ঘুমিয়েছে। ও আচ্ছা, তাকেই বেশি আদর, সোহাগ করতেই তিনি শুকিয়ে কাট। আর সুন্দরের রহস্যও তাহলে এটাই।

– কি হলো?

– তারাতারী চলো তোমার সেই মেয়ে কোথায়, আজ তাকে আমি খুন করেই ফিরবো।

– চলো নিয়ে যাই। কিন্তু সে তো লিগালী আমার বউ, তাকে তো খুন করা যাবে না।

– কি করা যাবে আর না যাবে সে আমি দেখবো। চলো!

কোথাও কাউকে পেলাম না। লুকিয়ে রেখেছে নিশ্চিত। আমি কিছুটা হতাস হয়ে বসে পরলাম। এতোখ্খন মেয়ের বাবা আমার দৌড়, ঝাঁপ, খোঁজা- খুঁজি দেখছিল আর হাসছিল। এখন সে আমার পাশে হাঁটু গেড়ে বসলো। মুখের ঘাম মুছে দিয়ে বললো-

এতোদিনে এই চিনলে। অনেক শুকিয়ে গেছ? এভাবে বুড়ো হলে চলবে, আমার সাথে পাল্লা দিতে হবে না? গত দুমাস উদাস ছিলে, ঘুমাওনি তবু একটা ফোন দাওনি। মেয়ে আমাকে সব জানিয়েছে। নিজের মানুষের কাছে এতো ইগো থাকতে নেই। অনেক বিপদ হতে পারে।

– আমি অনেক অনেক সরি ‘নবাবু’।

–  হা হা হা এতো বছর পর! মেয়ের বাবা আমাকে বুকে জড়িয়ে নিলো। আমি চোখের পানিকে বললাম আজ আমি ভীষন আনন্দিত। যতো পারো আনন্দ অশ্রু ছেড়ে দাও!!!

ও হ্যাঁ আমরা রাস্তায় হাত ধরে বাকি রাত হাঁটতে গেলাম। বৃষ্টি এলেও ফিরবো না। আপনারা গান শুনুন। হেডফোন লাগাতে ভুলবেন না!!!

আগর পর্বের লিঙ্ক- https://www.sonelablog.com/%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa-3/

ছবি- নেট

১৯০জন ২জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন



লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য




ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ