ভোরের সুর্য সবটুকু কিরণ নিয়ে উঁকি দিয়েছে পূর্বাকাশে। রাসেল নামাজ আদায় করে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। খোলা মাঠ সামনে। ইচ্ছে করলেই হাঁটতে যেতে পারতো। কেন যেন আজ আর ইচ্ছে করছেনা। মা কিচেনে সকালের নাস্তা তৈরীতে ব্যাস্ত হয়ে পরেছেন। ছোট ভাই দুটো পড়া নিয়ে ব্যাস্ত। তাজ খুব ভালো স্টুডেন্ট। ভবিষ্যতে ডাক্তার হবার ইচ্ছে নিয়ে খুবই মনোযোগী পড়াশোনায়। রাজীবও পড়াশোনায় মেধাবী। রাসেল পড়াশোনা শেষ করে একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে জয়েন করেছে এক বছরের মতো হলো। রাসেল ও পড়াশোনায় প্রচন্ড মেধাবী ছিলো। এস এস সি, এইচ এস সিতে গোল্ডেন পাওয়া ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার আগেই কি যেন হয়ে গেলো রাসেলের সাথে। যার ব্যাখ্যা অনেকের কাছেই নেই।
যারা কিছু একটা তো আছে বলে বিশ্বাস করেন! তারাই কেবল চুপচাপ আফসোস করেন এখনো।
এইচ এস সি পরীক্ষা শেষ করে তাবলীগে গিয়েছিলো। দিনের পর দিন, এ চিল্লা সে চিল্লায় এক জেলা থেকে আরেক জেলায় মুসুল্লিদের সাথে সাথে ঘুরে বেরিয়েছে। ফিরে আসার পর রাসেল অন্যরকম আচরন করতো, যা স্বাভাবিক মনে হতোনা বাবা, মা ভাই, আত্মীয় স্বজনদের কাছে।
রাসেলের মামা আছেন একজন মাসুম আলম। শুধু মাত্র তাঁকেই ভয় পেতো রাসেল।সেই মাসুম ভাইএর সাথে তর্ক করার সাহস দেখায় রাসেল। মাসুম ভাই বুঝে যান… কিছু একটা অস্বাভাবিকতা আছে হয়তো রাসেলের মধ্যে। রাসেলের মা নাসরিন আপা দিনরাত কাঁদেন। আর এখানে সেখানে ছুটে বেড়ান। আজ কোনো হুজুরের কাছে তো কাল আরেক ওঝার কাছে। নামাজ কালাম ঝারফুঁক তো আছেই। মাঝখানে কিছুটা সময় পড়াশোনায় ব্যাঘাত হলেও বি বি এ, এম বি এ কমপ্লিট করলো এক পর্যায়ে। গুলশানে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী তে সন্মানজনক বেতনে চাকরিও পেয়ে গেলো। মোটামুটি রকম ভালোই যাচ্ছে দিনকাল।

মাসুম ভাইএর স্ত্রী মালা, অর্থাৎ রাসেলের মামী বেড়াতে এলেন এক বিকেলে রাসেলদের বাসায়। টেবিল থেকে পানি নিতে গিয়ে দেখলো একটা বেড়াল টেবিলের উপরে নিশ্চিন্তে ঘাপটি মেরে বসে আছে। ঝটকা খেয়ে পেছনে সরে গেলো। বড় ননাস নাসরিন আপা হেসে উঠলেন ছোট ভাইয়ের বউএর আঁৎকে ওঠা দেখে।

-তুমি কি বিলাই দেখা ডরাইছো বাঁধনের মা?
-ডরাইনাই, ও বিলাইডা টেবিলের উপরে ক্যা? এহন তো আপনের ঘরে আমার পানিও খাইতে মন চায়না। আপনে তো জানেনই আমার ঘেন্না বেশি।
নাসরিন আপা আর কথা বাড়ান না।মালা তাঁর ছোট ভাইয়ের বউ’র শুচিবায়ুতা সম্পর্কে ভালোই জানেন। মুখ দিয়ে আজব কিসিমের আওয়াজ করতেই বিড়াল টেবিল থেকে নেমে রাসেলের ঘরে গিয়ে ঢুঁকলো।
মালা জানতে চাইলো বিড়াল কি পালতে এনেছে কিনা? নাসরিন আপার ভাষ্যমতে। এ বিড়াল কোত্থেকে কিভাবে ঘরে এসেছে কেউ কিছুই জানেনা। রাসেল এই বিড়াল নিয়ে খুব মেতে আছে কিছুদিন থেকে। ওকে খাওয়ায়, গোসল করায় সাথে নিয়ে খেলা করে,সাথে নিয়ে খেতে বসে। এবং বাসার সবাই মোটামুটি অভ্যস্থ হয়ে গেছে বিড়ালটার সাথে।
এরপর থেকে মালা যখনই বড় ননাসের বাসায় যায় সাথে করে পানির বোতল নিয়ে যায়। কিন্তু অন্যকোনো খাবারও সে খায়না।সারা ঘরময় বিড়ালটা যেভাবে ঘুরে বেড়ায়, তাতে দু’একগাছি লোম যে খাবারে পরবেনা তার বিশ্বাস কি? এই হলো মালা’র বিশ্বাস।

মাঝে মাঝেই রাসেল একা একা কথা বলে। কখনো নিচু স্বরে তো কখনো উচ্চস্বরে তর্কের আওয়াজ পাওয়া যায় রাসেলের ঘর থেকে। মা নাসরিন আপা কখনো কোনো সদুত্তর পাননি প্রশ্ন করেও।
ছেলের চিকিৎষার জন্য(এখানে সেখানে হুজুরের বাড়ি, ওঝার বাড়ি যাওয়া) গহনা পর্যন্ত বিক্রিকরেছেন। চাকরি পেয়ে পুরো বেতন তুলে দিতো মায়ের হাতে রাসেল।বলতো –“মা তুমি আমার জন্য অনেক করেছো। আমি তোমারে গহনা বানিয়ে দেবো।” মা বলতেন -” আমি আর গহনা দিয়ে কি করবো? তোর বউয়ের জন্য গহনা বানাবো তোর টাকা দিয়ে ” রাসেল লজ্জা পাবার ভাণ করে সামনে থেকে সরে যেত।

দেখতে দেখতে রমজান মাস চলে এলো। আর একটু পরেই রাসেল অফিসে যাবে। বেশ কিছুদিন যাবৎ রাসেল আবার অপ্রকৃতস্থ হয়ে আছে আবার। বিড়ালটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে রাসেল। যেমন হঠাৎ করে এসেছিলো তেমন হঠাৎ করেই হাওয়া হয়ে গেলো মনে হচ্ছে। রাসেল উন্মাদের মতো করছে কিছুদিন। বনশ্রী থেকে গুলশান অফিসে হেঁটে যায়।পথে যদি বিড়ালটাকে পেয়ে যায়? রাস্তায় কোনো বিড়াল দেখলেই ছুটে যায়,ওটা ওর বিড়াল নয়তো?
পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেবার জন্য খসরা রেডি করছে। তো একে তাঁকে ধরছে বিড়াল নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি দেবার জন্য। ছেলের সাথে পেরে উঠছেন দেখে মাসুম মামারে খবর দিলেন একদিন মা নাসরিন আপা। মামার ধমক টমক খেয়ে কিছুদিন নিশ্চুপ! কিন্তু বেড়াল খোঁজা বন্ধ হয়নি রাসেলের।
হঠাৎই একদিন মাকে বলছে — মা তোমরা আমার বিয়ের চিন্তা কোরো না। আবুল আমারে বিয়ে করতে দেবে না। আবুল আমারে বাঁচতেও দেবে না “।

মা হতবাক হয়ে যান ; ছেলে এসব কি বলছে? কে আবুল? প্রশ্ন করলে বলে – “তোমরা আবুলরে চিনবানা, ও আমারে অনেক কষ্ট দেয়, তোমরা আমার বিয়ের কথা বললেই!
সেদিন চতুর্থ রমজান ছিলো। নাসরিন আপা কোরআন শরীফ পড়া শেষ করে কিচেনে ঢুঁকেছেন রান্না আর ইফতারি তৈরী করতে। বিকেল চারটার মতো বাজে তখন।
হঠাৎ বিকট আওয়াজে কাছেই ট্রান্সফর্মার ব্লাস্ট হয়ে ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেলো। জানালার ওপারে একঝাঁক কালো কাক কা কা করতে করতে উড়ে চলে গেলো। আপা ভীষণ বিরক্ত! “কারেন্ট যাবার আর সময় পাইলো না?” আধাঘন্টার মতো সময় চলে গেলো। রাসেল তো এত দেরি করেনা বাসায় ফিরতে! নির্দিষ্ট সময়ের একচুল নড়া চাড়া ছেলের বাসায় ফিরতে। রান্নাঘরের জানালার বাইরে মানুষের হট্টগোল শোনা যাচ্ছে। কাছেই কিছু একটা তো হয়েছে নিশ্চই!

রাসেল রিকসা করে ফিরছিলো বাসার দিকে। একটা ব্লগ পরেই রাস্তাটা ঘুরলেই নিজের বাসা। মেইন রোডের পাশেই ব্র্যাক ব্যাংকের নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের নিচেই একটা পান সিগারেটের অস্থায়ী দোকান। ওখানেই রিকসা থেকে লাফ দিয়ে নামলো ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে, প্রায় দৌড়ে ছুটছে বহুতলভবনের টেম্পোরারি টিনের গেট ঠেলে ভেতরের দিকে।দোকানদার থামিয়ে জিজ্ঞেস করলো -“ভাই, আপনে এদিকে কই যান?” রাসেলঃ আমার বিড়ালটা এই বিল্ডিং ঢুঁকছে, আমি ওরে অনেকদিন ধরে খুঁজছি ভাই ; আমি ওরে আনতে যাই ”
দোকানী ব্যাস্ত হয়ে পড়লো বিক্রি বাট্টায়।
কত আর সময় লাগলো? ২ মিনিট? ৩মিনিট? হয়তো তারও কম! দোকানীর ভাষ্যমতে, মুহুর্তের মধ্যে তাঁর সামনে ১০ তলার ওপর থেকে রাস্তার ওপরে এসে একপাটি জুতো এসে পড়লো। বুঝে ওঠার আগেই বিদ্যুতের পিলারের সাথে ধাক্কা খেয়ে রাস্তার মাঝখানে এসে পড়লো রাসেলের নিস্প্রাণ দেহ। কালো পিচঢালা রাস্তা ভেসে গেলো রাসেলের মাথার ঘিলু আর রক্তে। জড়ো হলো শত শত উৎসুক মানুষের ভীড়। একজন পরিচিত মানুষ চিনে ফেললো রাসেলকে।। খবর দিলো বাসায়।
পুলিশ এলো। পকেট থেকে উদ্ধার করা হলো চিরকুট। অনেক অসংগ্ন লেখার মাঝের —” আমার প্রাপ্য সম্পত্তির সবটুকু পাবে আমার বিড়াল পুষি।তাজ বা রাজীব কিছু পাবেনা। ”
আবুল আমারে আর কষ্ট দিস না।
তুই আমারে বাঁচতে দিবিনা?”

বিঃদ্রঃ সত্য কাহিনীর উপরে ভিত্তি করে।
বিশ্বাস অবিশ্বাস সবটাই নিজের মতো করে বিবেচ্য।

৩১১জন ১৮৫জন
21 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য