আপেক্ষিক

বোকা মানুষ ২৭ অক্টোবর ২০১৫, মঙ্গলবার, ১০:১০:৫০অপরাহ্ন গল্প, সাহিত্য ১০ মন্তব্য

গুলশান-১ আর ২ এর মাঝামাঝি থেকে শ্যুটিং ক্লাব পর্যন্ত হেঁটে এসে খুব ক্লান্ত লাগছে আতাউলের। মধ্য কার্তিকের রোদটাও বেশ চড়া আজ। আজকাল আর আগের মত হাঁটতে পারেনা সে, একটুতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে! মাস দুয়েক আগে হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়ার পর যেন অনেক বুড়িয়ে গেছে! হাঁটতে হাঁটতে মাথায় অনেক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল! ভাবছিল, কিভাবে বাসা ভাড়া যোগাড় হবে, পানি/ ইলেকট্রিসিটির বিল কোথা থেকে আসবে, ছেলেটার আবার কাশি শুরু হয়েছে, সকালে বেরুবার সময় গা-ও গরম ছিল! এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তার খেয়াল হলো যে সে শ্যুটিং ক্লাব পর্যন্ত এসে গেছে! ঠিক তখনই সব ক্লান্তি যেন তার উপর এসে ভর করলো! এদিক ওদিক তাকিয়ে একটু বসার একটা জায়গা খুঁজতে গিয়ে পার্কের পাশে একটা টং দোকান দেখতে পেল। পাশে একটা বেঞ্চিও পাতা।

সে এগিয়ে বেঞ্চিতে বসে দোকানিকে বলল- “মামা, এক কাপ চা দেন তো! চিনি ছাড়া, দুধ বেশি!” দোকানি বিরস আর বিষন্ন মুখে বলল- “বসেন, দিতাসি!”

আতাউল মানুষের সাথে কথা বলতে ভালবাসে আর স্বভাবসুলভ ভাবেই বেশ মজা করে কথা বলে! দোকানির বিরস আর বিষণ্ণ মুখ দেখে তার ইচ্ছে হলো দোকানির সাথে একটু মজা করে তাকে হাসানোর!

চা নিতে নিতে সে দোকানিকে বলল- “কি মামা, চায়ে কি দুধের লগে বিষও মিলায়া দিছেন নাকি, যে চেহারা এত কালা কইরা চা দিতাছেন?” এই রসিকতায় চা দোকানি হাসলোনা, বরং তার চেহারায় বিষন্নতা আরো গভীর হলো! এটা দেখে আতাউলের মায়া হলো খুব! খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করল- “মামা, আপনের কি মন খারাপ কোনো কারনে?” দোকানি বিষন্ন মুখে উত্তর দিল- “না, মন খারাপ হইব ক্যান? মন খারাপ না!” তারপর একটু বিরতি নিয়ে বলল- “ওই বিষের কথা কইছিলেন না এট্টু আগে, পাইলে বিষ আমিই খাইতাম অক্ষনে!” শুনে আতাউল একটা ধাক্কা খেল! চেপে ধরার পর যা জানতে পারল, তার সংক্ষেপ হচ্ছে- দোকানির বোন তার বাবা মায়ের সাথে গ্রামে থাকে। কিছুদিন আগে বোনের বিয়ে দিয়েছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে বোনের স্বামীটা ছিল নেশায় আসক্ত, যা তারা বিয়ের আগে জানতোনা। বিয়ের পর থেকেই তার বোনের স্বামী প্রায়ই তার বোনকে মারধর করতো বাপের বাড়ি থেকে নেশার টাকা এনে দেয়ার জন্য! সে নিজে এবং তার বাবা-মা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে স্বামীটিকে বুঝিয়ে সুস্থ করার জন্য। কোনো লাভ তো হয়ই নি, উপরন্ত গতকাল তার দু’মাসের পোয়াতি বোনটাকে বেধড়ক মারধর করে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। মারধরের পর থেকেই তার প্রচুর রক্তপাত হচ্ছিল! আজ চিকিৎসার জন্য সদরে নেয়ার পথে বোনটা মারা গেছে! এটা বলতে বলতে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল দোকানি, বলল- “আমি কেমুন বড় ভাই যে আমার আদরের বইনডারে বাচাইতে পারলাম না…!”

শুনে কি বলবে সেটা আতাউল ঠিক বুঝে উঠতে পারল না! শুধু কিছুক্ষণ দোকানির ঘামে ভেজা পিঠের উপর তার হাতটা রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে চায়ের দাম মিটিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলো। তার মাথায় এখন বাড়িভাড়া, পানির বিল বা ছেলের জ্বর- এসবের কিচ্ছু নেই! তার বদলে তার মাথায় জায়গা করে নিল একটা ১৮-১৯ বছর বয়সি মেয়ের নিষ্পাপ কিন্তু ক্লিষ্ট, রক্তশুন্য মুখ! সে হাঁটতে লাগল উদ্দেশ্যহীনভাবে আর চারপাশের বিলবোর্ড, রিক্সায়, গাড়িতে- সব জায়গায়ই সেই মুখ ঘুরে ফিরে আসতে লাগল বারবার…!

৭৭জন ৭৭জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য