আপনার সন্তান যখন টিনএজার

রিমি রুম্মান ২৬ জানুয়ারী ২০১৯, শনিবার, ১০:৫০:৩০অপরাহ্ন সমসাময়িক ১১ মন্তব্য

আমাদের শিশুরা যখন ছোট থাকে আমরা ভাবি, নিজেদের মাঝে আলোচনা করি, ‘ কবে যে ওরা বড় হবে!’ যেন সন্তান বড় হলেই মায়েদের স্বস্তি, অবাধ স্বাধীনতা।মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে বেড়ানো যাবে। কেননা, সময় মত খাওয়ানো,পড়ানো, ঘুম পাড়ানো, স্কুলে পাঠানো, দিনভর এইসব দায়িত্ব দিনের পর দিন পালন করতে গিয়ে আমরা হাঁপিয়ে উঠি। সন্তানরা যখন নিজের কাজ নিজে করতে শিখে যায়, স্বাভাবিকভাবেই মায়েদের স্বস্তি পাবার কথা। কিন্তু নাহ্‌, তখন কপালে চিন্তার রেখা আরো বেড়ে যায়। মনে হতে থাকে, সন্তান ছোট ছিল, সে-ই বেশ ছিল। শাসন করে আর যা-ই হোক কথা তো অন্তত শোনানো যেত! এদেশে টিনএজ ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাবা-মায়েদের চিন্তার শেষ নেই, বিড়ম্বনার অন্ত নেই।

সন্তান যখন এলিমেণ্টারি (প্রাইমারী) স্কুল শেষে দূরের মিডল (সিক্সথ, সেভেন্‌থ, এইথ গ্রেড) স্কুলে যাতায়াত শুরু করে, সেইসময়ে আমরা অনেক মায়েরাই প্রথম বছরটি রোজ কনকনে শীতের ভোরে নির্ধারিত বাস স্টপেজে গিয়ে অপেক্ষায় থাকতাম। স্কুল বাস এলে সন্তানদের তুলে দিতাম। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বছর তাদের পাবলিক বাসে যাতায়াত করতে হতো। আমার চেনা এক মাকে দেখেছি ছেলেমেয়েদের নিয়ে কঠোর পরিশ্রমী, নির্মোহ এক জীবন যাপন করতে। ছেলেমেয়ে দুটিকে নিজে ড্রাইভ করে দূরের স্কুলে নামিয়ে দিয়ে আসতেন। বাড়ি ফিরে দুপুরের খাবারের আয়োজন শেষে আবার ছুটতেন তাঁদের আনতে, সন্তানদের কষ্ট হবে ভেবে। স্কুল বাস কিংবা পাবলিক বাসে কখনো যাতায়াত করতে হয়নি তাদের। বিষয়টি বেশ উৎসাহব্যঞ্জক এবং অনুপ্রেরণাদায়ক। আমার যারপরনাই ভালো লাগতো। মনে হতো এ এক মমতাময়ী মায়ের সন্তানদের প্রতি বাড়তি যত্ন। পরবর্তীতে আমাদের সন্তানেরা বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন হাই স্কুলে সুযোগ পেয়েছে, বিধায় মাঝে কয়টি বছর কারো সাথে যোগাযোগ হয়নি। গতমাসে আচমকা জানতে পারি সেই মায়ের ষোল বছরের ছেলেটি স্কুলে নিয়মিত উপস্থিত থাকে না বলে স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবককে চিঠি দিয়ে জানায়। অভিভাবক বিষয়টিকে সেই অর্থে আমলে নেয়নি যদিও, তবে ছেলেকে সতর্ক করে দিয়েছেন। কয়মাস বাদে আবারো স্কুল থেকে ফোন আসে, ছেলেটি মিডটার্ম পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি। এবার মায়ের টনক নড়ে। ছেলের সাথে এ বিষয়ে মায়ের উচ্চবাচ্চ হয়। রাগে, ক্ষোভে মা ছেলেটিকে দুই/একটি চড়, থাপ্পড়ও দেয়। রাতেই বিষয়টি শেষ হয়ে যায়। পরদিন সকালে ছেলেটি যথারীতি স্কুলে যায়। দুপুরে মায়ের কাছে ফোন আসে হাসপাতাল থেকে। হন্তদন্ত হয়ে মা ছুটে যায় হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। সেখানে যাবার পর তিনি যা জানতে পারেন, তার জন্যে মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। ছেলে স্কুলে তার স্প্যানিশ বন্ধুর সাথে মা যে মেরেছে বিষয়টি শেয়ার করে। বন্ধুর পরামর্শে শ্রেণি শিক্ষককে বিষয়টি জানায়। স্কুল কর্তৃপক্ষ এসিএস এ রিপোর্ট করেন। শিশুদের নিরাপত্তা এবং অধিকার নিশ্চিত করতে ACS (শিশু সেবাদানকারী প্রশাসন) কাজ করে থাকে। যেহেতু ছেলেটির বয়স আঠারো বছরের নিচে, তাই বিষয়টিকে ‘ চাইল্ড অ্যাবিউজ ‘ হিসেবে আমলে নেয়া হয়। বাবা মায়ের অধীনে ছেলেটি নিরাপদ নয়,বিধায় এসিএস মামলা ঠুকে দেয়, এবং তাদের নিজেদের অধীনে নিয়ে যেতে চায় ছেলেটিকে। কেননা সে-ও তাঁর বাবামায়ের সাথে পরিবারে ফিরে যেতে ঘোর আপত্তি জানাচ্ছিল। এ পর্যন্ত শোনার পর আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে। যে মা গর্ভে ধারণ করেছেন, দিনের পর দিন নিজের আরাম আয়েশ বিসর্জন দিয়ে ছেলের কষ্ট হবে ভেবে নিজেই রোজ ড্রাইভ করে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে আসতেন, সেই মায়ের কী নিজ সন্তানকে শাসন করার অধিকারটুকুও নেই! মায়ের প্রতি কেন, কী কারণে এত ক্ষোভ জমেছে ছেলেটির ? এমন নানান ‘ কেন’র গ্যাঁড়াকলে ঘুরপাক খাচ্ছিলাম। হাসপাতালে উপস্থিত ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয় নানাভাবে বুঝালেন ছেলেটিকে। অবশেষে সে সেই আত্মীয়ের বাসায় থাকতে সম্মতি জানায়। এসিএস সেই আত্মীয়ের অনুমতিক্রমে বাসাটি পরিদর্শনে যায়। সেখানকার পরিবেশ এবং সুযোগ সুবিধা ছেলেটির থাকবার ব্যাপারে কতটুকু অনুকূলে দেখার পর সেখানে থাকতে অনুমতি দেয়া হয়।

এরপরের কাহিনী আরও যন্ত্রনাময়। এসিএস এর নিষেধাজ্ঞা এবং নিয়ম অনুযায়ী সেই আত্মীয়ের বাড়িতে ছেলেটির বাবা-মায়ের যাবার অনুমতি ছিল না। বিনা নোটিশে এসিএস এর লোকজন যখন তখন বাড়িটি পরিদর্শনে যেত, তাঁদের নিষেধাজ্ঞা কিংবা নিয়ম কানুন লঙ্ঘিত হচ্ছে কিনা দেখতে। মায়ের কাছ থেকে ছেলেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা যাকে বলে! এটি যে একজন মায়ের জন্যে কতটা কষ্টের, যন্ত্রণার, অপমানের তা কেবল ভুক্তভোগী মা ছাড়া অন্য কারো উপলব্ধি করার কথা নয়। এরপর শুরু হয় কাউন্সেলিং অর্থাৎ ‘ Talking therapies ‘। কাউন্সেলর খুব মনোযোগ দিয়ে ক্লায়েন্টের সকল অভিযোগ, অনুযোগ শ্রবণ করেন। তাঁদের লক্ষ্যই হোল নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে ক্লায়েন্টের বিভিন্ন সমস্যার, অনুভূতির কারণ জেনে এ থেকে উত্তরণের পথ বের করে আনা। ক্লায়েন্টের ভেতরের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, অব্যক্ত অনুভূতি সব খুব সন্তর্পণে জেনে নিয়ে কাউন্সেলর তাঁদের নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্লায়েন্টকে একটি সমাধানের পথে এগিয়ে দিতে উদ্যোগী হন। এক্ষেত্রেও সোশ্যাল ওয়ার্কাররা ছেলেটির পরিবারের প্রতিটি সদস্যের সাথে আলাদা ভাবে কথা বলা শুরু করেন। তারা বুঝতে চেষ্টা করেন যে, কোন বিষয়টি ছেলেটিকে কষ্ট দিচ্ছে। কাউন্সেলর সমব্যথী হয়ে ছেলেটিকে উৎসাহিত করেন যেন সে স্বাচ্ছন্দ্যে মনের জটিল সব অনুভূতি এবং ক্ষোভের কথা খুলে বলে। এ থেকে মূল ঘটনা বেরিয়ে আসে।

মূল ঘটনা হোল, সন্তান কিছুটা বড় হয়ে উঠবার পর তাঁদের বাবা-মা দুইজনই নিজেদের নির্ভার ভেবে সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। আজ এই অনুষ্ঠান তো কাল ওই অনুষ্ঠান। এক সপ্তাহে মিটিং, তো অন্য সপ্তাহে দেশীয় নানাবিধ উৎসব। বাবা-মায়ের ব্যস্ততার সময়টাতে সন্তানেরা নিজেদের মত করে একাকি সময় কাটায়, রাত জেগে গেইম খেলে, ভুল বন্ধুদের সাথে সংযোগ স্থাপন করে। এভাবেই শুরু হয় দেরি করে ঘুম থেকে উঠা, স্কুলে যাওয়া, ভালো প্রস্তুতি না থাকায় পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকা। স্কুল থেকে আচ্‌মকা অভিযোগ আসার পর সেই বাবা-মা সন্তানদের উপর প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলাফল না পাওয়ায় ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। ছেলেটি আরো অভিযোগ করে, বাবা-মায়ের ক্রমাগত ঝগড়া-বিবাদ, টেলিফোনে রাত জেগে উচ্চস্বরে কথা বলাসহ নানাবিধ কারণে সে বিরক্ত, বিব্রত এবং নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে দিনের পর দিন। ছোট ছোট অব্যক্ত অভিযোগ, অনুযোগ শিশুমনে পুষে রাখা ছেলেটি একদিন স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যূৎপাতের ন্যায় বিস্ফোরিত হয়ে মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছে। এ অভিযোগ একদিনের কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হয়নি।

ঘটনাটি জানার পর আমিও যেন নড়েচড়ে বসি। আমি নিজেও যে টিনএজ বয়সী একটি সন্তানের মা। খুঁজতে চেষ্টা করি, আমার সাথে আমার সন্তানের সম্পর্কের ভিত কতটা মজবুত। তাঁকে পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে, তাঁর চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব না দিয়ে তাকে সেচ্ছাচার হয়ে উঠবার হবার সুযোগ দিচ্ছি কিনা। সে যখন আমার কাছে আসতে চেয়েছে, স্কুলে ঘটে যাওয়া কোন বিষয় প্রাণ খুলে শেয়ার করতে চেয়েছে, কিন্তু আমি তাকে ব্যস্ততার অজুহাতে দূর দূর করে দূরে সরিয়ে দিয়েছি কিনা কিংবা আমি তাঁর শ্রেষ্ঠ বন্ধুটি হয়ে উঠতে পেরেছি কিনা। আমার মা কত অবলীলায়ই না আমাদের বন্ধু ছিলেন! প্রায়ই বলতেন, সকাল-বিকাল দুইবেলা ছাদে হাঁটতে, সবুজের দিকে চোখ মেলে তাকাতে। আমরা স্কুল শেষে বিকালটা ঘুমিয়ে কাটাতে ভালো বোধ করতাম। মা একাই হাঁটতেন। এক বিকেলে বৈকালিক হাওয়া গায়ে লাগিয়ে ছাদে হাঁটছিলেন তিনি। নিচে মূল সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক তরুণ হাত নেড়ে ইশারায় দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছিল। মা দ্রুত দোতলায় নেমে এলেন। বললেন, ছেলেটা ভেবেছিল তোরা কেউ। দূর থেকে বুঝতে পারে নাই আমি যে তোদের মা! আমরা একযোগে হো হো করে হেসে উঠেছিলাম। পাড়ার কোন ছেলে প্রেমপত্র দিলে আমরা দুইবোন আর মা, তিনজন মিলে সেই চিঠি পড়েছি। কতোটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে একজন মায়ের সাথে সবকিছু শেয়ার করা যায়, আমার মা সে উদাহরণ। সেইসব শিক্ষা কাজে লাগিয়ে আমরাও চেষ্টা করছি সন্তানদের শ্রেষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠতে। কতোটা পারছি জানিনা। সে কথা সময়ের হাতে তোলা থাক।

টুকটাক লেখালেখি করছি, বিধায় কিছু অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাই। যাওয়া হয়না তেমন কোথাও। গেলেও স্বল্প সময় উপস্থিত থেকে ফিরে আসতে হয়। এতে কেউ কেউ মনঃক্ষুণ্ণ হন। ভাবি, সন্তানরা টিনএজ সময়টা পেরিয়ে গেলে নিশ্চয়ই যাবো সবখানে। আবার এও বুঝি, সময় তো আর থেমে থাকবে না। তারা টিনএজ সময় পেরিয়ে গেলে থুড়থুড়ে আমারও যে লাঠি ভর করে সবখানে যেতে মন চাইবে না। এ নিয়ে আক্ষেপ নেই একেবারেই। তবে সপ্তাহ শেষে পারিবারিক নিমন্ত্রণগুলো মিস করি না মোটেও। যেখানে সকলেই সপরিবারে বেড়াতে আসেন। যেখানে আমরা মায়েরা আনন্দময় সময় কাটাই, বাবারা দেশ, রাজনীতি, সমসাময়িক বিষয় নিয়ে হৈচৈ করেন। শিশুরা বাড়িময় ছুটোছুটি করে। টিনএজ সন্তানরা নিজের মাঝে নানান বিষয়ে গল্পে মশগুল থাকে, কারণে অকারণে হা হা , হো হো শব্দে হেসে উঠে। আমি নিশ্চিত, পরিবারের সাথে কাটানো এইসব সুন্দর মুহূর্ত কোন মূল্য দিয়ে, মিলিয়ন ডলার দিয়ে কিনতে পাওয়া যাবে না।

রিমি রুম্মান
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

৪৪৪জন ৪৪৪জন
0 Shares

১১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ