সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

দিনের পর দিন জমিদারবাড়িতে ভূতের রহস্য বেড়ে চলছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ ভূতের দেখা পায়নি।
যদিও প্লানচেটে ভূতের অশরীর আত্মার আহ্বান করা হয়েছে। এমন আহ্বানে ভূতের আত্মা আসে কিন্তু আপাদমস্তক নিয়ে ভূত আসেনা।
পুরনো বাগানবাড়ির রক্ষীপ্রাচীর ভেঙ্গে পড়েছে।
একমাত্র ঠিকে আছে ঐতিহ্যবাহী সিন্দুক। সিন্দুকের ভেতর অনেক পুরনো পুরনো বইপত্র। বইগুলোতে ভূতপ্রেতের আবাহনী তন্ত্রমন্ত্র আছে। এছাড়া জমিদারি শাসনবার চালানোর কিছু নিয়মপত্র। সিন্দুকের ভেতর থেকে সবকিছু সংগ্রহ করে নিলেও ভূতপ্রেতের এখনো কিছু তন্ত্রমন্ত্রের বই অগোচরে পড়ে আছে।
ইদানিং আনন্দপুরে শীত চেপে ধরেছে।
ঘর থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না চারদিক জুড়ে কুয়াশায় ঢাকা। বাগানবাড়ির প্রতিটি ঘরের ভেতর ধু ধু করে শীতল বাতাস বইছে। বিনু ও রাঘবের সর্দিকাশিতে নাক ঝালাপালা হয়ে আছে। ওষুধপত্রে কাজ হচ্ছে না।
দুজনি শরণাপন্ন হলো ডাক্তার নীলুদা শঙ্করের নিকট
পথ্য হিসেবে দিলেন রোজ সকালবেলা বাসকপাতা ও তুলসী পাতা বেটে রস খাওয়ার জন্য।
ওষুধগুলো বড়ই কণ্টিকারি বলা যায়। খাওয়া মাত্রই রোগ সেরে যায়।
জমিদার হরিবাবু কতদিন হলো বিছানায়।
বেশ কয়েকদিন বাড়িতে থাকায় খাজনাটাজনা কিছুই আসছে না। লালমোহনকে ভয়ে পাঠান না যদি আবার কোথায় চুরুটুরি করে বসে!
রোজ কত লোকের সমাগম ঘটে জমিদারবাড়িতে ভূত দেখার জন্য। ভূতবাড়ি বলে প্রায় হৈল্লোড় পড়ে।
এসব শুনতে শুনতে হরিবাবু আর সহ্য করতে পারছেন না। এ যেন জ্বালার উপর পানিঢালা।
আর সহ্য না করতে পেরে বাড়িতে রক্ষীর সংখ্যা বাড়িয়ে দিলেন। কেউ যদি আর ভূত ভূত বলে চিৎকার করে থাকে তাহলে তাকে বন্ধী করে রাখতে হবে।
হরিবাবু ডাক্তার নীলুদা শঙ্করের পথ্যাধী খাওয়ার পর থেকে কিছুটা চলাফেরা করতে পারছেন ঠিক।
কিন্তু পূর্বে রোজ সকালে কখনো গভীর রাত্রিবেলা বাগানবাড়িতে যেতেন সেখানে আর যাওয়াআসা করেন না ভূতের ভয়ে। এমন কাণ্ডকারখানা দেখে বিনু প্রতিনিয়ত হাসে। এদিকে রাঘব হরিবাবুর ভাবসাব কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেনা।
মাঝেমধ্যে হরিবাবুর সাথে বিনুর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যায়। জমিদারবাড়ির সিংহদ্বারের সিংহের মূর্তিটা অবিকল ভূতের মতো। রাত্রি অনেক হলে হঠাৎ করে ঝড়তুফান এ যেন কেউ অকস্মাৎ স্টিমরোলার চালাচ্ছে। বাগানবাড়িতে আসা আগত লোকটি বারান্দায় বসে গাঁজা খাচ্ছে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে গাঁজার গন্ধ। পরেরদিন সকাল হলে লোকটিকে ডেকে নিলেন জমিদার হরিবাবু। লোকটি কি করে কি না জেনে জানতে পারলেন যে লোকটি ভূতপ্রেত তাড়ানোর তন্ত্রমন্ত্র জানে!
এ কথা শুনে জমিদারবাবু বড্ড খুশি হলেন।
দায়িত্ব দিলেন বাগানবাড়িতে ভূতপ্রেত থাকলে তা তাড়িয়ে দিতে। এতে মোটা অঙ্কের টাকা দিবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
মানুষের দয়ামায়া সব আছে কিন্তু ভূতপ্রেতের আদৌ দয়ামায়া বলতে কিছু নেই। তারা যাকে পায় তার ঘাড়েচেপে ধরে। যেমন কয়েকদিন পূর্বে হরিবাবু ও লালমোহনের ঘাড় চেপে ধরেছিলো
কত না তন্ত্রমন্ত্র ও ওষুধপত্র খেয়ে কিছুটা ভালো হলেও মনের মধ্যে ভূতের ভয়টা আজও আচমকা ঘাপটি মেরে উঠে।
সামনে অমাবস্যাতিথি।
আগত লোকটি বলছে এ তিথিতে যাগযজ্ঞ করে পাঁঠাবলি দিতে। হরিবাবু রাজী হয়ে গেলেন। কিন্তু রাজী হচ্ছেন না হিন্দুবালা।
এমনিতে জমিদারবাড়িতে অমাবস্যা – চর্তুদশী তিথিতে পূজাটুজা হয়ে থাকে। কিন্তু এবার অন্যরকমের ভূতপ্রেতের পূজা হতে চলছে। লোকটি মনেমনে ভাবছে কোনরকম ভাবে যদি জমিদারবাবুকে মানিয়ে নেই তাহলে বেশ কয়েকদিন আমি ও আমার পরিবার চলে যাবে।
বিষয়টা রাঘব ও বিনু বুঝতে পারলে দুজনি হিন্দুবালাকে বুঝিয়ে রাজী করিয়ে নেয়।
লোকটি জমিদার হরিবাবুকে কথা দিয়েছে বাগানবাড়ি থেকে ভূতপ্রেত উচ্ছেদ করে দিবে এবং তাঁকে সুস্থ করে তুলবে।
আনন্দপুরের পূর্ব,পশ্চিমে রয়েছে গোবিন্দপুর, জগৎপুর। সবজায়গা জুড়ে হরিবাবুর জমিদারিতত্ত্ব রয়েছে।
এতসব থাকলে আর কী হবে?
বাড়ির কালোবিড়ালটা পাগল হয়ে যাকে তাকে কামড়াচ্ছে। আবার কেউ কেউ বলছে বিড়ালকে নাকি ভূতে ধরেছে। একের পর একেক কাণ্ড যদি এভাবে ঘটতে থাকে তাহলে জমিদারবাবু সবকিছু হারিয়ে পথে বসতে হবে।
বিড়ালটার গলায় ঘণ্টা বাঁধার জন্য আগত লোকটিকে দায়িত্ব দিলেন ইন্দুবালা। লোকটি মাথায় হাত দিয়ে ভাবছে এ তো সম্ভব নয়।
বিড়ালটা কখনো বাগানবাড়ির গাছের মগডালে কখনো দিঘীর পারে। সারাদিন এদিকওদিক ঘুরে বেড়ায় আর যাকে পায় তাকে কামড় দেয়।
লোকটি যেই চুপেচাপে কালোবিড়ালের লেজে ধরতে গিয়েছে তখন কামড় খেয়ে বসে।
হায় হুতাশ করছে আর চিৎকার দিচ্ছে।
বিনু লোকটির এমন অবস্থা দেখে সামনে গিয়ে বলছে হলো, হলো বেশ হলো ভণ্ড তান্ত্রিক মশাই। ভাবছেন জমিদারবাবুকে ঠকিয়ে পার পেয়ে যাবেন।
তা হয় না ভণ্ড তান্ত্রিক মশাই।
এইবার আপনি বিড়ালের কামড়ে মরুন আর আমি বসে বসে আপনার বিদেহী আত্মার শান্তিকামনা করি।
এদিকে হরিবাবু বলির জন্য সাত- আটটে পাঁঠার ব্যবস্থা করলেন কিন্তু হঠাৎ করে শুনতে পারলেন যে লোকটি বিড়ালের কামড় খেয়ে পালিয়েছে।
এছাড়া আগত লোকটির জন্য হরিবাবু বাজার হতে টাটকা পাবদামাছ ও খাসির মাংসের ব্যবস্থা করেছিলেন।
অবশেষে বুঝতে পারলেন যে ঐ লোকটি নিজের চেয়েও ব্যতিক্রম কিছুনা।

২৪৭জন ১৮২জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য