সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

গুণি জ্যোতিষী মিস্টার নগেন চ্যাটার্জী একের পর এক গ্রহদোষ কাটাচ্ছেন।
লালমোহনের ঘরের চারদিক জুড়ে মোমবাতি তার মধ্যখানে মরা মাথার খুলি। খুলিটা দেখতে বেশ ভয়ংকর। এমন ভয়ংকর মরা মাথার খুলি দেখে হরিবাবু চেঁচিয়ে উঠেছেন।
লোকজন রোজ চিৎকার দিয়ে জমিদারবাড়িরকে ভূতবাড়ি বলে। তারমধ্য নরকঙ্কালের মাথার খুলি।
সেটা আশপাশের লোকজন জানলে বাড়িটা একেবারে আকাশে তুলে দেবে।
বিনু একথা শুনে বলছে ঠিকি বলেছেন জমিদার মশাই।
এটা আসলে নরকঙ্কালের খুলি নয়, এ ভূতের মাথার খুলি। হরিবাবু মনেমনে ভেবে বলছেন সত্যিই তো এটা ভূতের মাথার খুলি।
মাঝেমধ্যে এ মাথার খুলি থেকে আগুন জ্বলে উঠে।
এমন কাণ্ডকারখানা দেখে হরিবাবু জ্যোতিষীকে বললেন বাড়ি থেকে চলে যেতে।
হিন্দুবালা ধমক দিয়ে তাঁর স্বামী হরিবাবুকে বলছেন না জ্যোতিষী গণনা করে বাড়ি ফিরবেন। হিন্দুবালার এমন কথা শুনে নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন  হরিবাবু।
স্ত্রীর কথায় স্তব্ধ হয়ে যাওয়া সেটা আদৌ থেকে হরিবাবুর।
একেকটা গ্রহের দোষ কাটাতে হলে কচি পাঁঠা বলি দিতে হবে বলে জানিয়ে দিলেন জ্যোতিষী মশাই।
এরজন্য চারটে পাঁঠাবলি দিতে হবে।
হিন্দুবালা হরিবাবুকে না বলে চারটে পাঁঠার বলির ব্যবস্থা করতে বলেন। কিন্তু বাড়িতে কচি পাঁঠা নেই।
হরিবাবু বউয়ের চেঁচামেচি শুনে ঘুমিয়ে পড়লেন।
না খেয়েই।
হরিবাবু ছাড়া কেউ জানেনা এতগুলো কচি পাঁঠা কোথায় রাখা। বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রাঘব মনেমনে ভাবছে লোকটি কী সত্যি তন্ত্রমন্ত্র ও পাঁঠাবলি দিয়ে গ্রহ বশীকরণ করে বিবাহ করিয়ে দিবে লালমোহনকে। না কি People are thinking of cheating with ghost sorcery?
রাঘব কিছুতে কোনকিছু বুঝে উঠতে পারছেনা।
ভূত বিষয় নিয়ে সে ইদানিং একটা মস্ত বড়ো ভ্রমের মধ্য পড়ে গিয়েছে।
এদিকে নীলুদা শঙ্করের সাথে গল্প চলছে বিনু ও রাঘবের। নীলুদা শঙ্কর বলছেন অনেক আহত ভূতকে নাকি চিকিৎসা দিয়েছেন। এমনকি ভূতের কাছ হতে টাকাপয়সা নিতেন না। এসব কথা বিনু ও রাঘব যত শুনছে ততো অবাক হয়ে উঠছে।
বিনু বলে উঠলো আচ্ছা ডাক্তার মশাই, এসব কথাবার্তা সত্যি বলছেন তো?
না কথাবার্তায় কোথাও ভেজালটেজাল আছে।
নীলুদা শঙ্কর বলে উঠলেন মিথ্যা বলার কী আছে,
বিনু?
যদি বলো ভূত দেখতে চাও তাহলে তোমাকে দেখাতে পারি। বিনু রাজী হয়ে গেলো।
ভূত দেখতে হলে পূর্ববঙ্গে যেতে হবে নীলুদা শঙ্করের সাথে। আর ভূতের সাথে দেখা করতে হবে নিশুতি রাত্রিতে। গভীর রাত্রিতে ভূতের সাথে দেখা করবে বলে বিনুর চোখ দুটি টগবগ হয়ে উঠেছে।
বাড়ির চারপাশ খুঁজে পাওয়া গেলো না একটাও কচি পাঁঠা। অবশেষে জানা গিয়েছে হরিবাবু বাগানবাড়ী নিয়ে রেখেছেন।
রাত্রি গভীর।
জনমানবহীন আনন্দপুর।
আছে গাঁজার গন্ধ আর তন্ত্রমন্ত্রের শব্দ।
চারটে গ্রহদোষের জন্য চারটে পাঁঠাবলি দিয়েছেন জ্যোতিষী মশাই।
সব দোষ কেটে গিয়ে লালমোহন এই বছরে বিয়ে করতে যাচ্ছে। এমন সুখবর শুনে হিন্দুবালা আনন্দে আত্মহারা হয়ে কাঁসরঘণ্টা বাজাতে লাগলেন। তা আবার হরিবাবুর ঘরের ভেতর।
হিন্দুবালা আপন পতি হরিবাবুকে ডেকে বলছেন,
ওগো শুনছো?
তোমার শ্যালকের বিয়ে হতে চলছে এই বছরে।
ওঠো, তাকে তুমি মিষ্টিমুখ করাও।
ঘুম থেকে উঠে বলতে লাগলেন অকালকুষ্মাণ্ড একটা বিয়ে করতে যাচ্ছে আমার ঘাড়ে বসে!
চাকরিবাকরি কিছু নেই।
সারাদিন খায় আর ঘুমায়।
ওরে বউ কে দিবে?
হরিবাবু জ্যোতিষী মশাইকে ডেকে বলছেন আচ্ছা মশাই ঘরজামাই হয়ে থাকলে কি হয়না?
আপনি তো আমার চারটে পাঁঠা সাবাড় করে দিলেন।
আজ্ঞে জমিদারবাবু এটার দোষ কাটাতে পারিনি।
গ্রহদোষ কাটিয়ে দিয়েছি।
জ্যোতিষীর এমন কথাশুনে হিন্দুবালা বলে উঠলেন এ কী বলছেন মশাই?
আমার ভাইয়ের জন্য এতকিছু।
আর আপনি এ ঘরজামাই হয়ে না থাকার কোন উপায় বের করে দিলেন না?
জ্যোতিষী মশাই বলে উঠলেন এ বিষয় নিয়ে এখন কিছু বলা যাবেনা। বিবাহের পর দেখা যাবে।
এমন কথা শুনে হরিবাবু খিলখিলিয়ে হাসছেন।
লালমোহন মনেমনে ভাবছে ঘরজামাই হয়ে থাকলে কয়েকমাস আরাম আয়েশে কাটিয়ে যাবে।
কিন্তু বাকিটা সময় বউয়ের কথা, শ্বশুর, শাশুড়ির কথামতো উঠাবসা করতে হবে।
এমন হলে আমার চলবে না। পরিণামে টেঙ্গা লাঠি নিয়ে বৃন্দাবনে যেতে হবে। লালমোহন সবসময় ভীতুরাম আর বউটা যদি হয়ে যায় পেত্নীরাম। তাহলে তো তার আর উপায় থাকবেনা।
লালমোহন বলছে জ্যোতিষী মশাই আপনি যেকোনভাবে আমায় ঘরজামাই হতে মুক্ত করার উপায় করে দেন।
এতসবের মাঝে গতকাল রাত্রিতে বাগানবাড়িতে ডাকাত হানা দিয়েছে। গাছের লিচু সাবাড় করে নিয়েছে। সাথে করে নিয়েছে বাগানবাড়িতে রাখা হরিবাবুর চারটে কচিপাঁঠা।
আজকাল আনন্দপুরের বাগানবাড়িতে কয়েকদিন পর পর ডাকাত হানা দিচ্ছে। এ নিয়ে বেশ চিন্তিত জমিদারবাবু।
কখন জানি খাজাঞ্চিখানা এসে ডুকে পড়ে সবকিছু লুটপাট করে নেয়। এসব নিয়ে হিন্দুবালা ও তাঁর ভাই লালমোহনের চিন্তা নেই।
রোজ শান্তি অশান্তি পূর্ণ দু একটা গোলমাল ঝগড়াঝাঁটি হয়ে থাকে। কি আর করা হরিবাবু একা লড়ে উঠতে পারেন না। হরিবাবু জমিদার হলে কী হবে।
হরিবাবুর আপন স্ত্রী হিন্দুবালা দীর্ঘ ত্রিশ বছর সরকারি কেরানি পদে চাকরি করেছেন। বলা যায় এ পেনশনের টাকা দিয়ে চলছেন জমিদারবাবু।

৩৮৬জন ২৮১জন
0 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য