সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

বিকেল হতে আর বেশ একটা দেরি নেই।
আজ আনন্দপুরের সপ্তাহের শেষ বাজার।
শীতের বিকেলে অলিগলি বাজারে বিক্রেতারা নানা ধরনের পিঠেপুলি নিয়ে বসেছে।
বিনু,রাঘব ও লালমোহন তিনজনি বসে পিঠা খাচ্ছে। লালমোহন খাওয়াদাওয়া সবকিছুতে তার জামাইবাবুর মতো আগেভাগে।
গরম গরম পিঠেপুলি তিনজনেরই বেশ প্রিয়।
আজ সন্ধ্যাবেলায় এক জ্যোতিষী আসার কথা জমিদারবাড়িতে। জ্যোতিষী না কি অনেক গুণে গুণান্বিত। হাত দেখে ভবিতব্য বলে দিতে পারেন। লালমোহনের বিয়ে কেন হচ্ছেনা?
তা গণনা করে দেখতে চান তার আপন দিদি হিন্দুবালা জ্যোতিষীর দ্বারা।
বাজারে যাবার পূর্বে হিন্দুবালা লালমোহনকে বলেছেন বাড়িতে তাড়াতাড়ি ফিরতে। এমন খবর জমিদার হরিবাবুর কানে পৌঁছে নাই।
বিনু লালমোহনকে বলছে মোহন দা আজ বেশি বেশি করে খাওয়ান। হয়তো আজ আপনার ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিবে জ্যোতিষী।
হাত দেখা, কুষ্ঠীবিচার, বিবাহলগ্ন ঠিক করা,শনিগ্রহ, মঙ্গলগ্রহ বশীকরণসহ ইত্যাদি কাজে বেশ পারদর্শী জ্যোতিষী। এসবকিছুতে নাকি বেশ প্রশংসাপত্র রয়েছে তাঁর।
জ্যোতিষী লোকটির বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। আজকাল এত বয়স্ক বৃদ্ধা জ্যোতিষী পাওয়া বড় কঠিন। লোকটির বাড়ি পূর্ববঙ্গের সাকুটা গ্রামে।পূর্বপুরুষগণ গণনা বিদ্যায় পারদর্শী। জ্যোতিষীর নাম মিস্টার নগেন চ্যাটার্জী ওরফে ভূপেন। এছাড়াও টাইটেল অনেক।
হরিবাবু কচিকাঁচা পাঁঠাগুলোর শব্দে বিকালবেলা না ঘুমাতে পেরে বাগানবাড়ি নিয়ে রেখে আসেন।
প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যা হলেই আনন্দপুরের বাজার শেষ হয়ে যায়। বিনু, রাঘব ও লালমোহন তিনজনি বাড়ি ফিরছে। বাড়ি ফেরার পথে লালমোহন আজ তার জামাইবাবুর জন্য ইলিশ মাছ কিনে এনেছে। ইলিশ মাছ দেখে হরিবাবু বড্ড খুশি হয়ে প্রশংসা করতে লাগলেন লালমোহনের।
আর বলছেন বেশ করেছিস রে মোহন কয়েকটা দিন পর। আমার খুবি প্রিয় ইলিশমাছ অনেকদিন পর খেতে পারবো।
আচ্ছা টাকা কোথায় পেলিরে মোহন, কোথাও হতে চোরিটুরি করেছিস কি না?
জামাইবাবু আপনি কেন আমায় কথায় কথায় চোর চোর বলেন বলুন তো?
আচ্ছা আর বলবো না হতচ্ছাড়া আমার অকালকুষ্মাণ্ড শ্যালক।
ডাক্তার নীলুদা শঙ্করের পথ্যতে হরিবাবু সুস্থ হয়ে উঠেছেন। কিন্তু রাত্রিবেলা স্বপ্নের মধ্যে ভূত এসে গলাটিপে ধরে।
এ ভয় মেটানোর জন্য নীলুদা শঙ্কর অনেক পথ্য দিলেও  কোন কিছুতেই কাজ হচ্ছে না।
লালমোহন পুরপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছে।
বিনু ও রাঘব বাগানবাড়ি না গিয়ে মোহনের সাথে চলে এসেছে জমিদারবাড়িতে।
বিনু মনেমনে ভাবছে জমিদারবাবুর আমন্ত্রণে রাত্রিবেলা খেয়েদেয়ে বাগানবাড়ি ফিরি তাহলে বেশ হয়। এমনটা খাবারের লোভ রাঘবের নেই ।
খানিকক্ষণ পর বাড়িতে জ্যোতিষী মিস্টার নগেন চ্যাটার্জীর আগমন।
দেখতে প্রায় তান্ত্রিক সাধুদের মতো।
আপ্যায়ন শেষে লালমোহনকে ডেকে নেওয়া হলো ছোটখাটো একটা কক্ষে। গণনা শুরু হলো নগেন জ্যোতিষীর। ফলাফল একবছরের মধ্যে বিয়ে হবে কিন্তু তার আগে শনিগ্রহ, মঙ্গলগ্রহের দোষ কাটতে হবে তা না হলে ভূতপ্রেত আঁকড়ে ধরবে। এরজন্য কিছু পয়সাকড়ি লাগবে। হিন্দুবালা রাজী হয়ে গেলেন। পয়সাকড়ি বড় বিষয় নয় আপন ভাই লালমোহনের দোষ গুলো কেটে বিয়ে হলেই ভালো হলো।
নগেন জ্যোতিষী গণনা করে বলছেন লালমোহনের  বিবাহ হবে ঠিক কিন্তু!
লালমোহন বলছে কিন্তু কী জ্যোতিষী মশাই?
কিন্তুটা হলো তোমাকে ঘরজামাই হয়ে থাকতে হবে।
এ কথাশুনে হিন্দুবালা হতবাক হয়ে পড়লেন।
আদরের আপন একমাত্র ভাই বোনের বাড়িতে থাকবে পরবর্তী সময়ে জমিদারবাড়ির জমিদারিত্ত্ব ধরে রাখবে।
আর ঘরজামাই হলে তো উপায় নেই।
এ কথা শুনে হরিবাবু বলছেন এমন হলে তো বেশ ভালো হয় জ্যোতিষী মশাই। আমার অকালকুষ্মাণ্ড শ্যালক আমায় অনেক খেয়েছে। এইবার না হয় বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি ঘরজামাই হয়ে থাকুক।
এমন কথা শুনে স্ত্রী হিন্দুবালা চেঁচিয়ে উঠে বলছেন আপনি কথায় কথায় আমার ভাইয়ের নামে উল্টাপাল্টা
পাঁচালী পড়তে যাবেন না।
না হলেও জ্যোতিষী মশাইকে দিয়ে বশীকরণ করে নিয়ে নিবো। ওগো গিন্নী কী আর আমায় বশীকরণ করবে বলো? এমনিতেই তো তোমার বশীকরণে আমি বন্দী।
নগেন জ্যোতিষীর কথাশুনে লালমোহনের মন কালো হয়ে আছে।
বিনু ও রাঘব পাশের ঘরে বসে আছে। তাদের সাথে বসে আছেন ডাক্তার নীলুদা শঙ্কর। তিনজনি বসে ভূতের গল্প করছে। তবে এবারের ভূতের গল্প ভিন্নরকমের।
ডাক্তার নীলুদা শঙ্কর বললেন উনি না কি সত্যিকারের ভূত দেখেছেন এবং ধরতে গিয়ে হাতকে ফসকে গিয়েছে!
রাঘব আশ্চর্য হয়ে বলছে সত্যিই আপনি ভূত দেখেছেন? নীলুদা শঙ্কর মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ প্রকাশ করলেন।
বাহ্!
বেশ তো।
আচ্ছা ভূত দেখতে কেমন, ডাক্তার মশাই?
অদ্ভুত কালোরঙের হাত দুটি লম্বা লম্বা এছাড়া হাত পায়ের নখ গুলো ভয়ংকর।
এমন কথাশুনে বিনু কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেনা।
ডাক্তার মশাই ভূত দেখেছেন আবার ধরতে গিয়ে ফসকে যায়!
এ কেমন ভূত?
ডাক্তার নীলুদা শঙ্কর বলছেন প্রায় গভীর রাতে রোগী দেখতে গিয়ে ভূতের সাথে উনার দেখা হতো। অনেক ভূত না কি তাঁকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে।
এ কথাশুনে রাঘব অবাক হয়ে পড়লো।
সবাই বলে ভূত খুবি ভয়ংকর ও ভয়ানক।
আর এ ভূত ডাক্তার নীলুদাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসে।

২৪৮জন ১৭৫জন
0 Shares

১১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ