আধারে ঢাকা জীবন

মনির হোসেন মমি ৪ জুলাই ২০২১, রবিবার, ১০:১৭:১৯অপরাহ্ন গল্প ১৬ মন্তব্য

‘হ্যালো..
-বলো,
-হ্যালো…
-হ্যা বলো শুনছি,,
-হ্যালো….
-আরে হ্যা,বলো না,শুনছিতো!!
-কী বলব?
-ফোন দিয়েছো কেন?
-ভুলে গেছি,

-ও আচ্ছা।আমি এখন একটু ব্যাস্ত-পরে কথা হবে,রাখছি।

দিলরুবা তার স্বামীর সাথে বিশেষ একটি কথা বলবে বলবে বলে আজ প্রায় দুই তিন যাবৎ ফোন কল দিয়ে ট্রাই করছেন তবুও কাঙ্খিত কথাটা বলতে পারছেন না।ঐ গ্রাম্য এক প্রবাদ আছে না-নারীর বুক ফাটেতো মুখ ফুটে না।এ দিকে বেচারা স্বামী অফিসে এ কদিন ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছেন।দম ফেলবার একটুও ফুসরত নেই তার উপর যদি বউয়ে এমন বার বার নিরুত্তাপ প্রশ্নহীন টেলিফোন আসে তাহলেতো জীবনটা হয় তেজপাতা।ব্যাস্ত অফিস শেষে রাতে বাসায় গিয়ে যখন বউকে জিজ্ঞাসা করেন-ফোন দিয়েছিলে কেনো?বললে নাতো?তখনো বউয়ের একটাই উত্তর আগামীকাল ফোনে বলবনে।

অবশেষে সে কথা আর বলা হয়ে উঠেনা।কিন্তু দিলরুবাকে আজ সেই কথা বলতেই হবে কারন আজই যে সেই বিশেষ কথাটি বলার শেষ দিন-শেষ রাত্রি।

স্বামী অফিসে বসে কী যেন এক ফাইল রেডি করছেন তার কম্পিউটার ডেক্সটপে।ঠিক সেই সময় ফোনে রিং টোন বেজে উঠল।ফোনটি কানে কাধ দিয়ে আটকিয়ে দুহাতে কম্পিউটারের বাটন টিপছেন আর কথা বলার চেষ্টা করছেন।

-হ্যালো
-জ্বী বলো
-হ্যালো
-হ্যা শুনছি বলো,
-হ্যালো
-আরে হ্যা,বলো না!!

-তোমার কী মনে আছে সেই মেহেদী গাছটির কথা?
-কোন মেহেদী গাছ?
-ঐ যে আমাদের বাড়ীর উঠোনেতে,,,
-ছিলো কখনো?
-তুমি দেখছি সবিই ভুলে গেছো!!
-আরে বাবা “মেহেদী” গাছটিকে মনে রাখার কী আছে বলো ?
-তুমি কী কর্পোরেট মার্কেটে ভালবাসাটাও বেচে দিছো নাকি ?

-কী সব আবোল তাবোল বলছো?

বউ রাগ করেছেন বুঝতে পেরে হাতের কাজটা রেখে ফোনের কথায় মনোনিবেশ করলেন স্বামী।

-হ্যা এবার বলো কী বলছিলে যেন তুমি?
-বাহ্ আমি যে এতোক্ষণ কী বলেছি তা তুমি কিছুই শুনোনি?

-শুনেছিতো-ঐ যে কী যেন বললে গাছটাছটা মনে আছে কীনা।কোন গাছটার কথা বলছো?
-মেহেদী গাছ।

-ও আচ্ছা আমাদের বাড়ীর উঠোনে যে গাছটা ছিলো! বুঝেছি।তা এই তিন চার দিন যাবৎ তোমার ঐ মেহেদী গাছটার কথাই বলবে বলবে বলে, বলতে পারছো না ? আশ্চর্য আমি আছি অফিসের ঠেলায় আর ওনি আছেন মেহেদীর মেলায়।

-যদি মেহেদী গাছটার সাথে আমাদের জীবনকে ঘিরে ইতিহাস না থাকতো তবে হয়তো মেহেদী গাছটি প্রতি বছর এ ভাবে মনে পড়ত না।
-ইতিহাস! মানে গাছটিকে ঘিরে কোন যুদ্ধমুদ্ধের ঘটনা আছে নাকি?
-যুদ্ধমুদ্ধ না হলেও জীবনের এক বিশেষ সময়ের বিশেষ স্মৃতি জড়িয়ে আছে।তুমি কী সবিই ভুলে গেছো! কিছুই কী মনে নেই তোমার?সেই রাত দুটোর কথা? অনাকাঙ্খিত ভাবে এক আশা প্রত্যাশার মিলনের কথা?

এবার যেন মনে পড়ছে স্বামী বেচারার। কী যেন উৎকন্ঠায় কেটে ছিলো সেই রাতটা।

-দাড়াও দাড়াও হ্যা হ্যা মনে পড়ছে।সেই ভয়ানক রাতের সুঃস্বপ্নের কথা।সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ভাবে দু’জীবনের নতুন বাকের কথা।

—–

হলুদ বাটো মেহেদী বাটো বাটো আরো….রাত দুটো। মুহূর্তে দু’পক্ষের দাদী নানীরা হলুদ মেহেদী বেটে রেডি।এতো রাতে মেহেদী সংগ্রহ করতে গিয়ে সবাই মিলে মেহেদী গাছটির অবস্থা মরুভুমি করে ছাড়লেন।হলুদ সংগ্রহ করা হয় বাড়াটে বিভিন্ন ঘর হতে।লুঙ্গি গামছা শাড়ী সব কিছুই খুব দ্রুত কে বা কারা যেন সংগ্রহ করেন।অনেকটা উৎসাহের সহিত বর কনেকে পড়িয়ে বিয়ের আসরে বসিয়ে দিলেন। দিলরুবা আর মজনুর কাছে এ যেন মেঘ না চাইতেই জল।

বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে বর কনে যখন মেহেদী গাছটির পাশ দিয়ে তাদের  বাসর ঘর বরাবর যাচ্ছিলেন তখন দুজনেই অবাক হয়ে মেহেদী গাছটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন।পাতা বিহীন শুধু ডালগুলো নিয়ে দাড়িয়ে আছে গাছটি।দুজনেই তাদের হাতের তালুতে মেহেদী রাঙা গোলাকৃতি ছাপ দেখলেন।আর দুজনেই বললেন-হে মেহেদী গাছ “তুমি স্বাক্ষী রইলে-তোমাকে শুন্য করে আমাদের নতুন ঘর বাধলাম।ক্ষমা করো অপরাধী মোরা।

-তাহলে আজ! আজকে আমাদের বিবাহ বার্ষিকী?
-হ্যা জনাব।
-তাহলে এ কথাটা বলতে তোমার এতো সময় এতো দিন নিতে হল?
-তবুওতো দিনটি আমার স্বরণে ছিলো তোমারতো তাও নেই।
-বরাবরইতো আমি এমন, তার ছেড়া আর সেই ছেড়া তারগুলো জোরা লাগাচ্ছো তুমি।তুমিহীন আমি মলিন।এইতো আর কয়টা মাস। আমার স্বপ্ন সফল হতে চলছে।আমার সাফল্য আমার হাতের মুঠোয় ধরা দিবে।তখন তোমাকে অনেক সময় দিতে পারবো।তোমার কোলে মাথা রেখে প্রান ভরে নিঃশ্বাস নিবো আর তুমি আমার আধাপাকা চুলগুলোতে হাত বুলাতে বুলাতে ঘুম পারিয়ে দিবে।
——–

আজ তদের বিবাহ বার্ষিকী।কে বা কার ডাকের শব্দ শুনে হাসপাতালে অবস্থানরত দিলরুবার চোখে রাতের তন্দ্রা হঠাৎ ভেঙ্গে যায়।স্বামীকে আইসিউতে রেখে দিলরুবা হাসপাতালের করিডোরে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।কখন যে চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যায় টের পায়নি দিলরুবা।

প্রায় দুই মাস হয়ে গেলো মরন ব্যাধি করোনায় আক্রান্ত হন স্বামী মজনু বেপারী।উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবার।স্বামীর আয় রোজগার হতে টাকা সঞ্চয় করে দিলরুবা গ্রামে কিছু ফসলি জমি আর গ্রাম্য শহরে পাচ তলা ফাউন্ডেসন দিয়ে একতলা বিশিষ্ট একটি বাড়ী করতে পেরেছিলেন।ব্যাংকে কিছু নগদ অর্থও জমা রেখে ছিলেন।ঘর সংসারে নাবালক এক মেয়ে এক ছেলে।তাদের ভবিষৎ উজ্জ্বলে বেশ কয়েকটা ফিক্স ডিপোজিট ছিলো।

করোনা পজিটিভ রিপোর্ট পাওয়ার আগ মুহূর্তে জ্বর মাথা ব্যাথা শ্বাস কষ্টের জন্য বিভিন্ন ডাক্তার হাসপাতালে চিকিৎসা খরচ মেটাতে তার ব্যাংকে জমাকৃত বেশ কিছু টাকা খরচ হয়ে যায়।

পজিটিভ রিপোর্ট পাওয়ার পর মানষিক ভাবে দিলরুবা অনেকটা ভেঙ্গে পড়েন।আইসিউ খোজে হাসপাতালে যাবার পথে স্বামী মজনু বেপারী তাকে সাহস দিলেন।

-ভয় পাচ্ছো?
দিলরুবার চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।স্বামীহীন বাঙ্গালী রমনীরা বরাবর অসহায়।তাছাড়া তার বেচে থাকার অবলম্ভন একমাত্র স্বামী ছাড়া আপণ আত্মীয় স্বজন বলতে আর তেমন কেউ নেই।একদিকে নিজেকে সন্তানাদি নিয়ে বেচে থাকার ভবিষৎ ভাবনা অন্য দিকে তার কপাল হতে চিরতরে সোহাগী টিপ মুছে যাওয়ার ভয় মানষিক ভাবে তাকে আরো দুর্বল করে দিচ্ছে।
-না ভয় পাবো কেন?তুমি আছোনা।

আইসিউর খোজে শহরের কত হাসপাতালেই না গেলেন।কোথাও কোন আইসিউ বেড খালি নেই।অবশেষে স্বামীকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে এক হাসপাতালের আইসিউতে ভর্তি করালেন কিন্তু প্রতি দিনের খরচ প্রায় লক্ষাধিক টাকার উপরে।উপায় নেই স্বামীকে বাচাতে হবে তাই ব্যাংকে শেষ গচ্ছিত টাকাগুলো তুলে এক হাতে নিয়ে অন্য হাতে দিয়ে স্বামীকে আইসিউতে ভর্তি করালেন।

দিলরুবা এবং মজনু বেপারীর আত্মীয় স্বজনও তেমন কেউ নেই।যারা ছিলেন তারাও করোনা হয়েছে শুনতে পেরে কেউ কাছে আসতে চায়না।সে নিজেই একা একা স্বামীকে নিয়ে বিভিন্ন চিকিৎসা স্পটে ঘুরেছেন।কখনো কখনো হয়রানির শিকারও হয়েছেন।সন্তানদের রেখে এসেছেন তার এক খালাতো বোনের কাছে।

আজ বহুদিন হয়ে গেল স্বামীর মুখটি দিলরুবা দেখতে পান না।সেই যে আইসিউতে নিয়ে গেলো আজ অব্দির তার সাথে দেখা হয়নি,হয়নি কথা,বলতে পারেনি মনে কী ব্যাথা।তবে তার ভাল মন্দের খোজ খবর সব সময়ই পাচ্ছেন।হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বেশ ভাল তবে যিনি দুহাতে টাকা খরচ করতে জানেন তাদের জন্য।

এদিকে দিলরুবার হাতের অবস্থা খুব অবনতির দিকে অবশেষে শেষ ভরসা ছিলো বসত ভীটা।তাও বিক্রয় করতে হলো।মানুষ বাচবে কী বাচবে না তার গ্যারান্টি না থাকার পরও নিজ স্বার্থকে জলাঞ্জল দিয়ে মানুষ মানুষকে বাচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন কেবলি মনে প্রেম আছে বলে।প্রেমের টানে নিঃস্ব হওয়ার এমন ইতিহাস দুনিয়ায় আর কোন দেশে আছে বলে আমার সন্দেহ হয়।আমাদের দেশের চিকিৎসা খাত চিকিৎসা ব্যাবস্থাটা অনেকটা কমাশিয়াল বা বানিজ্যিক হয়ে গেছে।অবশ্য এই আধুনিক যুগে যে দেশে মুদির দোকানেও কোন রকম প্রেসক্রিপসন বা ডাক্তারের কাগজপত্র ছাড়াই ঔষধ পাওয়া যায় সেদেশে আর কী বা জনসেবা থাকবে।

করোনায় আঘাতে এদেশটায় যতটা না গরীবের ক্ষতি হয়েছে তার কয়েকগুণ বেশী লাভ হয়েছে ধনী ঔষধ ব্যাবসায়ী সহ স্থানীয় ক্ষমতাশীল এবং নিত্যনৈমিত্ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ব্যাবসীদের।এক সোয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে গত তিন মাসে কয়েক ধাপে কেজি প্রতি প্রায় দুই থেকে আড়াইশ টাকা।এছাড়া আলু পিয়াজের রূপ কথার কাহনীতো আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

আজ সকাল হতেই দিলরুবা কেবল আতঙ্কিত আর উৎকণ্ঠায় ছিলেন।যে হাসপাতালটিতে সে তার স্বামীর চিকিৎসা নিচ্ছেন সেই হাসপাতালটির আইসিউর রুম হতে কিছু ক্ষণ পর পর এক এক করে লাশ বের হচ্ছে।পাশে স্বজন হারা স্বজনদের আত্মনাৎতের চিৎকারে শব্দে দিলরুবার বুকটা কেপে উঠে বার বার।যতবার মৃত লাশের খবর আসে ততবার তখনি দিলরুবার মনটা কালো মেঘে ঢেকে যায়।এই বুঝি তুফান এলো এলো!সাজানো সবকিছু তছনছ করে দিলো।ঠিক তখনি এক অফিস বয় এসে বললেন।

– মজনু বেপারির কেউ কী আছেন।

নামটি শুনার সাথে সাথে সাথে দিলরুবার হাত পা যেন অবশ হয়ে এলো।চেয়ারে বসা থেকে উঠে দাড়াতে যেন তার খুব কষ্ট হচ্ছে।প্রশ্নের উত্তরের জানান দিতেও তার ঠোট যেন কাঁপছে।মুখের শব্দরা যেন উদাসীন।কাপা কণ্ঠে বললেন।

-এএএইতো,.. আমি আছি।

-স্যার আপনাকে তার রুমে ডেকেছেন।

অনেকটা ভয় আতঙ্ক নিয়ে রুমে ঢুকলেন দিলরুবা।ডাক্তার তার কুশোলাদি জিজ্ঞাসা করে চেয়ারে বসতে বললেন।

-কী খবর স্যার? আমিতো খুব টেনসনে আছি।
-খবর আগের চেয়ে অনেকটা ভালো।আল্লাহ চাহেতো দুচার দিনের মধ্যে বাড়ী নিয়ে যেতে পারবেন।

আশানুরুপ কথাটা শুনে দিলরুবা মনে মনে স্রস্টার নিকট শুকরিয়া আদায় করলেন।কিন্তু ডাক্তার শেষে যে কথাটি বললেন তাতে দিলরুবা অনেকটা চিন্তায় পড়ে গেলেন।যে দিন রোগী রিলিজ হবে সেদিন হাসপাতাল ও অন্যান্য খরচ সহ প্রায় লাখ দু এক টাকা লাগবে বলে ডাক্তার যে ধারনা দিয়েছেন তা যোগার করা তার পক্ষে বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার।কারন এ চিকিৎসা খাতে তাদের যে জমানো টাকা স্থাবর অস্থাবর জমি জমা বসত ভিটা ছিলো তা সবিই ইতিমধ্যে চিকিৎসা খরচ বাবদে শেষ হয়ে গেছে।বলা চলে এখন  তারা অনেকটাই পথের ভিখারী তার উপর আরো লাখ খানেক টাকা যোগার করা যেন এখন অনেকটা মরার উপর খারার ঘা হয়ে দাড়িয়েছে।তাছাড়া টাকা ছাড়াওতো হাসপাতাল রোগীকে রিলিজও দিবে না।এমন অসংখ্য ঘটনা দিলরুবার জানা আছে,হাসপাতালের খরচ দিতে না পারায় ঘটেছে অপ্রীতিকর বহু ঘটনা।তাহলে এখন উপায়।কে দিবে বা কীভাবে যোগার করবেন এতোগুলো টাকা।

চলবে…

২২৩জন ৭৯জন
0 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ