আত্ম-অমার্যদা

আলমগীর ৩০ আগস্ট ২০১৮, বৃহস্পতিবার, ১০:২১:৪১অপরাহ্ন অন্যান্য ২ মন্তব্য

আত্মমর্যাদা বা আত্মসম্মান হলো একজন ব্যক্তির সামগ্রিক মানসিক মূল্যায়ন । এটি নিজের প্রতি নিজের মনোভাবকে বোঝায়। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলা যায় আত্মমর্যাদা হলো নিজের প্রতি ইতিবাচক বা নেতিবাচক মূল্যায়ন। উপযুক্ত আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি শুধু নিজের মর্যাদা বিবেচনা করে শুধু আত্মতুষ্টই থাকেন না বরং অন্যকে আত্মতুষ্ট রাখার ব্যাপারেও তার যত্ন উল্লেখযোগ্য ভাবে গোচরীভূত হয়ে থাকে।  অন্যদিকে আত্মমর্যাদাহীন ব্যক্তি নিজে যেমন সব সময় হীনমন্যতায় থাকার ফলে মানুষিক কষ্টে থাকে ফলস্বরূপ তার চারপাশের অপেক্ষাকৃত কম প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরকে অসুখি রাখতে যথেষ্ঠ ভূমিকা রাখে। ঠিক তার বিপরীত ভুমিকা পালন করার চেষ্টা করে অপেক্ষাকৃত তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী মানুষদের ক্ষেত্রে। যেহেতু এই শ্রেণীর লোকের আত্ম-বিশ্বাসের যথেষ্ঠ ঘাটতি থাকে সেহেতু তোষামদের মাধ্যমে প্রভাবশালীদের খুশি রাখতে গিয়ে বরং অখুশির আবহটাই বেশি সৃষ্টি করে থাকে। শিল্পায়ন ও কর্পোটাইজেশন বা ডিজিটাল রুপান্তরের এই সময়ে আত্মমর্যাদা বিকিয়ে স্বার্থ হাসিল রিতীমত প্রথা বা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এটা যারা করে থাকেন তারা যে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে করে থাকেন ব্যাপারটা তা নয়। যদি এহেন সংস্কৃতির শেকড় অনুসন্ধান করা হয় তাহলে দেখা যাবে শতকের পর শতক ধরে পুঁজিবাদীদের নিরবিচ্ছিন্ন এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এই প্রথার প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান করেছে। আর এই ষড়যন্ত্র এমনই এক যন্ত্র যার যান্ত্রিক চর্চায় পরিচর্যা করে তাকে অমোঘ এক শক্তি প্রদান করা হয়েছে।

 

শিল্পায়ন ও কর্পোটাইজেশন বা ডিজিটালাইজড পদ্ধতি যা প্রতিটি স্বতন্ত্র ব্যক্তির আত্মসম্মান বিকিয়ে দেওয়ার কৌশলকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যা এই পদ্ধতিকে এক শিল্পিত রূপ প্রদান করেছে। এইরূপের স্বরূপ না চেনা ব্যক্তি কর্মক্ষেত্রে তথাকথিত সাফল্যের লাগাম থেকে দূরে থাকা সময় অনুপোযোগী এক অদ্ভুত প্রাণী।

 

যদি উপরোক্ত লেখার সমর্থনে উপযুক্ত যুক্তি বা তথ্য না দেই তাহলে বণিকশ্রেণী বলতেই পারে, খেতে না পারলে আঙ্গুর ফল টক হবেই। কথাটা কম বেশি সত্যিও বটে, খেতে না পারা মানুষের কাছে মনে হোক বা না হোক ব্যর্থতা ঢাকার অজুহাত হিসাবে বলতেই পারে ‘আঙ্গুর ফলে মাত্রাতিরিক্ত প্রিজারভেটিব দেওয়ার কারণে খায়নি বা টক বলে খায়নি’। কথাটা কিন্তু আবার মিথ্যাও নয়, খেতে না পারা মানুষের আঙ্গুর ফলের বিরুদ্ধে এই অভিমানি অভিযোগ কিছুটা হলেও তো সত্য। আমি আঙ্গুর ফলকে টক বলা অভিমানি মানুষের মত করে পূঁজিকে পূজা করা মানুষগুলো কিভাবে সাধারণ মানুষকে আত্মমর্যাদাহীন এক অমেরুদন্ডী প্রাণীতে পরিণত করছে তা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

 

মনোবিজ্ঞানীদের মতে যে সকল কারণে একজন মানুষ তার আত্মমর্যাদাকে জলান্জলি দিতে পারে তার কিছু নমুনা তুলে ধরা হলো;  যা পুঁজির পূজারীগণ পূজি করে থাকেন ।

 

চারিদিকে নেতীবাচক মানুষদের সান্নিধ্য : যখন একজন মানুষ যিনি বাকিটা জীবন স্বাচ্ছন্দ্যে কাটাবেন বলে চাকুরী নামক নব্য দাসপ্রথায় নাম লিখিয়ে থাকেন, তখন থেকেই তিনি এই প্রথার অভিজ্ঞতার ভারে ভারাক্রান্ত মানুষের সান্নিধ্যে এসে বাস্তবতার নানানগল্প শুনতে শুরু করেন এবং শুনতে শুনতে এইভাবে একসময় তিনিও অভিজ্ঞ ও পরিপক্ক এক অমেরুদন্ডী দাসে পরিণত হয়ে যান। তখন তিনি ভুলে যান যে আত্মমর্যাদা নামক একটি শব্দের অস্তিত্ব বাংলা অভিধানে ছিল বা আছে।

 

নিরবিচ্ছিন্ন নেতীবাচক বক্তব্যশ্রবণ : অভিজ্ঞতায় পরিপক্ক দাসেরা বুড়িয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাসের বিকলাঙ্গ শক্তি নিয়ে যে ভাবে খুড়িয়ে খুঁড়িয়ে পুঁজির পূজারীদের দেখানো পথে হাটে তাতে সদা তাদেরকে তাদের বস নামক প্রভুর কাছ থেকে সর্বদাই নেতিবাচক শব্দগুলো যেমন, আপনার কাছ থেকে অনেক প্রত্যাশা ছিল আপনি তার কিছুই দিতে পারেননি। আপনার দ্বারা কিচ্ছু হবে না। অফিসে ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে আসবেন না। আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবেনা, আপনাকে আরও পেশাদার হতে হবে। কিভাবে করবেন আমি জানিনা, কিন্তু আপনাকে করতেই হবে। আমাকে বোঝাতে আসবেন না, আমি বিশ বছর ধরে আপনাদের মত লোক চরিয়ে আসছি, ইত্যাদি ইত্যাদি। এহেন কথা শুনতে শুনতে সদ্য  আত্মপ্রকাশিত জুনিয়র দাসও একদিন সিনিয়র দাসে পরিণত হয়ে যান এরং তিনি উপরোক্ত শব্দগুলো চর্চা করতে থাকেন।

 

ভিতী প্রদর্শন : পুঁজির পূজারিগণ নিজের কর্তৃত্বের অপ-প্রয়োগ করার জন্যই অধিনস্তদের দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী, সাবলিল, স্পষ্টভাষী হিসাবে গড়ে তোলার পরিবর্তে একজন ভীরু ভৃত্যু হিসাবে গড়ে তুলতেই বেশি পছন্দ করেন। যেহেতু অধিনস্তকে ফলপ্রদ হিসাবে গড়ে তোলার পরিবর্তে ভীরু হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছে সেহেতু তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়ার সময় তার দক্ষতার চেয়ে ভীরুতার উপরই বেশি নির্ভর করা হয়। একজন নির্ভরশীল ভীরু গড়ে তোলার নিমিত্তেই তার আত্মমর্যাদা দিনে দিনে শোষণ করে নেওয়া হয়েছে।

 

বস বা মনিবের সব কিছুতেই হ্যাঁ বলা :  কিভাবে যেন সকল অধিনস্তই রপ্ত করে করে ফেলেছে, সবকিছুতেই বসকে ‘হ্যাঁ বলুন’। বিনয়ের নামে প্রেষণারগণ আপনাকে শিখিয়েছেন, আপনি যে কাজ করতে পারবেন না সেইরকম কোন কাজও যদি আপনার বস আপনাকে দিয়ে থাকেন তখনও আপনি বসকে না বলবেন না। আপনি চরম পরিশ্রান্ত সেই মূহূর্তেও বলবেন না যে, আপনি পারবেন না।  এক কথায় বসের সামনে আপনি বুঝতেই দিবেন না যে, ‘ন’ আকার দিয়ে ছোট্ট একটি শব্দ  আছে যা আমাদের সবচেয়ে প্রিয় শব্দ কিন্তু কোনভাবেই এই প্রিয় শব্দটি আপনার বসের সামনে উচ্চারণ করা যাবেনা। ‍অত:পর বসের সবকিছুতেই অপ্রিয় শব্দটি বলে যখন আপনি যখন তা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ তখন বস সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র আচরণ ঝাড়ির ঝড় আপনার মনের শরীরকে জর্জরিত করে এক রক্তাক্ত প্রান্তরে পরিণত করবে। ফলস্বরূপ : আপনার আত্মবিশ্বাস, আত্ম সম্মান দিনে দিনে অফিসের কক্ষপথেই ঘোরাঘুরি করতে থাকবে আর আপনি ব্যস্ত থাকবেন সেই কক্ষপথে পৌঁছানোর।

 

কখনও কখনও ভাল কাজের স্বীকৃতি পাবেন; কিন্তু তাতে যুক্ত থাকবে, ’কিন্তু, তবে’ ইত্যাদি। আপনার মধ্যে কিছু না কিছুতো সহজাত মেধা আছেই, সেগুণে কখনও কখনও আপনি এমন কিছু করে ফেলতে পারেন যা বসের সুনজরে আসতে পারে; কিন্তু বস তো জানেন প্রশংসা করার ক্ষেত্রে তাকে অকৃপণ হলে চলবে না, কারণ তাতে বসের ব্যক্তিত্ব থাকেনা। সুতরাং ভালকাজের ক্ষেত্রে প্রশংসা পাবার সময় ’কিন্তু, অতএব, তবে’ এইসবযুক্ত নেতিবাচক শব্দ মিশ্রিত দূষণযুক্ত প্রশংসা বাক্য অন্যদিকে অকৃপণভাবে প্রকাশিত নেতীবাচক সমালোচনা আপনাকে ভুলিয়ে দেবে আত্মমর্যাদা কি, এই শব্দ কোথায় থাকে।

 

শ্রমের মূল্য : আপনি যখন দেখবেন আপনারা দশ জন মিলে যে টাকা অফিস থেকে শ্রমের মূল্য হিসাবে পাবেন তার কয়েকগুণ মূল্যদিয়ে কুকুর ক্রয় করে গলাই চেইন বেঁধে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ানো হয় শুধুমাত্র বসের স্ত্রীকে খুশি রাখার জন্য। তখন আপনার আত্মমর্যাদার বিষয় এটাই হবে যে, ‘আপনি ঈদের ছুটিতে বাড়ীতে গিয়ে পূরোনো বন্ধুদের কাছে গল্প করবেন যে, আমার বসের বাসায় যে কুকুর আছে তার দাম আমাদের দশজনের এক মাসের বেতনের সমান আর তার খাবার খরচ আমার সংসার খরচের কয়েকগুন। তখন আপনি দেখবেন আপনার আত্মমর্যাদা দোল খেয়ে বেড়াচ্ছে বসের কুকুরের লেজের ডগায়!

 

চলবে ——

 

 

আলোর পথিক

29 আগস্ট 2018

৪৭৯জন ৪৭৭জন
0 Shares

২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ