আত্মহত্যা (সমাধান নাকি সমর্পণ)

ইঞ্জা ১৮ আগস্ট ২০২০, মঙ্গলবার, ১০:১০:৩৫অপরাহ্ন সমসাময়িক ৪৩ মন্তব্য

গত কয়েকদিন আগে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র আত্মহত্যা করলো শুধু মাত্র একটি মেয়েকে না পাওয়ার বেদনায়। 

বলিউড ফ্লিম সুপারস্টার সুশান্ত সিং আত্মহত্যা করলো গলায় দড়ি দিয়ে, ইতিমধ্যে বেশ নামকরা ভারতীয় অভিনেতা আত্মহত্যা করলো বিষন্নতার কারণে, কিন্তু কেন এই আত্মহত্যা বা নিজেকে নিজে খুন করা?

আসুন জানি গুগল উইকিপিডিয়া কি বলে।

 

আত্মহত্যা বা আত্মহনন (ইংরেজি: Suicide) হচ্ছে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া বা স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশের প্রক্রিয়াবিশেষ, ল্যাটিন ভাষায় সুই সেইডেয়ার থেকে আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে নিজেকে হত্যা করা। যখন কেউ আত্মহত্যা করেন, তখন জনগণ এ প্রক্রিয়াকে আত্মহত্যা করেছে বলে প্রচার করে। 

ডাক্তার বা চিকিৎসকগণ আত্মহত্যার চেষ্টা করাকে মানসিক অবসাদজনিত গুরুতর উপসর্গ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন, ইতোমধ্যেই বিশ্বের অনেক দেশেই আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকে এক ধরনের অপরাধরূপে ঘোষণা করা হয়েছে, অনেক ধর্মেই আত্মহত্যাকে পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

যিনি নিজেই নিজের জীবন প্রাণ বিনাশ করেন, তিনি – আত্মঘাতক, আত্মঘাতী বা আত্মঘাতিকা, আত্মঘাতিনীরূপে সমাজে পরিচিত হন।

 

প্রতিবছর প্রায় দশ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর মতে প্রতি বছর সারা বিশ্বে যে সব কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে আত্মহত্যা ত্রয়োদশতম প্রধান কারণ। 

কিশোর-কিশোরী আর যাদের বয়স পঁয়ত্রিশ বছরের নিচে, তাদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হচ্ছে আত্মহত্যা।নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার হার অনেক বেশি, পুরুষদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা নারীদের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ।

 

প্রাচীন এথেন্সে যদি কোন ব্যক্তি রাষ্ট্রের অনুমোদন ব্যতিরেকে আত্মহত্যা করত তাহলে তাকে সাধারণ কবরস্থানের সম্মান দেয়াকে অস্বীকার করা হত, তাকে কবরস্থ করা হত শহরের বাইরে অবস্থিত কোন জায়গায় একা শুধু তাই নয় তার জন্য কোন স্মৃতিফলক ও ব্যবহার করতে দেয়া হতনা। 

তবে সামরিক পরাজয়ের মোকাবেলা করার জন্য এটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি বলে মনে করা হতো, প্রাচীন রোমে আত্মহত্যা প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত ছিল, পরে এটি অর্থনৈতিক খরচের কারণে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি অপরাধ বলে অভিহিত হয়েছিল, প্লেটোর দ্বিধাবিভক্ত অবস্থায় প্রেক্ষাপটে অ্যারিস্টটল আত্মহত্যার সব ধরনের পন্থার নিন্দা জানিয়েছিলেন। 

রোমে কিছু আত্মহত্যার কারণ যেমন- গ্ল্যাডিয়েটর যুদ্ধে স্বেচ্ছাসেবক মৃত্যু, অন্যের জীবন বাঁচাতে, অন্যের জীবন রক্ষা করার জন্য, শোকের ফলে, ধর্ষণের জন্য লজ্জা থেকে মুক্তি পেতে, শারীরিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি, সামরিক পরাজয়ের মতো অসহিষ্ণু পরিস্থিতিতি থেকে অব্যাহতি বা অপরাধমূলক সাধনা সাধারণ বিষয় ছিল।

 

আত্মহত্যাকে খ্রিস্টান ইউরোপে একটি পাপ হিসাবে গণ্য করা হয়েছিল এবং ৪৫২ সালে Arles এর কাউন্সিলে তাকে শয়তানের কাজ হিসেবে নিন্দা করা হয়েছিল,  মধ্যযুগে চার্চ করডোবার শহীদদের ক্ষেত্রে যেমন শহীদ হওয়ার বাসনা আত্মঘাতী ছিল তাই তাকে আলোচ্য আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছিল, এই বিরোধ এবং মাঝে মাঝে সরকারী বিধিবিধান সত্ত্বেও সপ্তদশ শতকের শেষের দিক পর্যন্ত আত্মহত্যার বিষয়ে ক্যাথলিক মতবাদ পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। ফ্রান্সের লুই চতুর্দশ এর ১৬৭০ সালে জারি করা ফৌজদারি অধ্যাদেশটি অত্যন্ত খারাপ ছিল, এমনকি সময়ের জন্যও: মৃত ব্যক্তির শরীরটি রাস্তায় টেনে আনা হত, মাথা নিচু করে তারপর আবর্জনা দিয়ে আবৃত করা হত। উপরন্তু, ব্যক্তির সমস্ত সম্পত্তি জব্দ করা হত।

 

রেনেসাঁর সময় থেকে আত্মহত্যার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে পরিবর্তন শুরু হয়েছিল। জন ডন এর কাজ ‘বাইথানটোস’ আত্মহত্যার প্রথম আধুনিক সুরক্ষার মধ্যে একটি ছিল, যিশু, শিমসন এবং শুলের মতো বাইবেলের পরিচয়ের আচার থেকে সাক্ষী এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আত্মহত্যার অনুমোদনের জন্য যুক্তি ও প্রকৃতির ভিত্তিতে আর্গুমেন্ট উপস্থাপন করেছিল ।

 

আত্মহননের সময় শুরু হওয়া সমাজের সেক্যুলারিজম আত্মহত্যার প্রতি ঐতিহ্যগত ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল এবং বিষয়টি নিয়ে আরও আধুনিক দৃষ্টিকোণ নিয়ে এসেছিল। ডেভিড হিউম অস্বীকার করেন যে আত্মহত্যা একটি অপরাধ ছিল কারণ এটি কোনও ব্যক্তিকে প্রভাবিত করেনি এবং সম্ভাব্য ব্যক্তিটির সুবিধার জন্য ছিল বলে তিনি মনে করেন। তার ১৭৭৭ প্রবন্ধে আত্মহত্যা এবং আত্মার অমরত্ব নিয়ে তিনি নিখুঁতভাবে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ” কেন আমি একটি করুণ অস্তিত্বকে দীর্ঘায়িত করবো, কিছু অসার সুবিধা যা জনসাধারণ হয়তো আমার কাছ থেকে গ্রহণ করতে পারে,?” পাবলিক মতামত এছাড়াও উপলব্ধ করা যেতে পারে; ১৭৮৬ সালে টাইমস পত্রিকায় “আত্মহত্যা কি সাহসের কাজ?” এর উপর একটি প্রবল বিতর্ক শুরু হয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর দিকে ইউরোপে আত্মহত্যার ঘটনা পাপ থেকে উন্মাদনার কারণে সৃষ্ট ঘটনায় স্থানান্তরিত হয়েছিল । যদিও এই সময়ের মধ্যে আত্মহত্যা বেআইনি ছিল, এটি ক্রমশ উপহাসমূলক মন্তব্যের লক্ষ্য হয়ে ওঠেছিল, যেমন গিলবার্ট এবং সুলেভান বাদ্যযন্ত্র মিকডো দিয়ে যিনি ইতিমধ্যেই নিজেকে হত্যা করেছিল এমন ব্যক্তিকে উপহাস করেছিল ।

 

১৮৭৯ সালের মধ্যে ইংরেজরা আত্মহত্যা ও হত্যাকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য করতে শুরু করেছিল, যদিও আত্মহত্যার ফলে সম্পত্তি জব্দ করা হত। ১৮৮২ সালে মৃত ব্যক্তিদের ইংল্যান্ডে দিনের বেলা দাফন করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল এবং বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিমা বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে আত্মহত্যা বৈধ হয়ে উঠেছিল । আত্মহত্যা শব্দটি প্রথম আত্মত্যাগের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিল ১৭০০ সালের পূর্বেই যা প্রায়ই পশ্চিমে আত্মহত্যার একটি রূপ হিসেবে চিহ্নিত ছিল।

সূত্রঃ গুগল উইকিপিডিয়া। 

 

আমরা এতক্ষণ জানছিলাম আত্মহত্যা বিষয়ে, এখন জানি এর ফল কি?

সত্যিকার অর্থে আত্মহত্যা কোনো সলিউশন কি, নাকি সব কিছু থেকে পালিয়ে বাঁচা? 

আমার মতে যে আত্মহত্যা কখনোই কোনো সলিউশন হতে পারেনা, এতে না আত্মহত্যাকারীর লাভ, না তার পরিবারের লাভ, বরঞ্চ একটি পরিবারের আজীবনের কান্না হয়ে থাকে। 

আত্মহত্যাকারী তো সবকিছু থেকে পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে থেকেই নিজেকে নিজে খুন করে, এতে কি সে লাভবান হয়েছে?

না প্রশ্নই উঠেনা, এ জীবন ত্যাগ করে সে যে অন্য পাড়ে পাড়ি জমালো, সে কিভাবে ওখানে ভালো থাকবে, মুসলিম ধর্ম সহ অনেক ধর্মেই মহা পাপ, যদি মহা পাপই হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চয় সে অন্য পাড়েও ভালো নেই তা বলাই বাহুল্য। 

 

আবার যে আত্মহত্যা করেছে, সেকি চিন্তা করেছে যে মা  তাকে পেটে ধরেছে, মৃত্যুর সামিল যন্ত্রণা সয়ে জন্ম দিয়েছে, যে মা সন্তানকে মাটিতে রাখেনি পিঁপড়ায় ধরবে বলে, সারাক্ষণ কোলে পিঠে রেখেছে, তার গু, প্রস্রাব নিজ হাতে পরিস্কার করেছে, নিজের বুকের দুধ খাইয়ে বড় করেছে, সেই মা কিভাবে সহ্য করবে সন্তানের পালিয়ে যাওয়া?

যে বাবা সন্তানকে বড় করার জন্য নিজের সকল সুখ স্বাচ্ছন্দ বিসর্জন দিয়েছে, সেই বাবা কি ভাবে সহ্য করে সন্তানের অকাল মৃত্যু?

হয়ত একটি পরিবারের শেষ ভরসা ছিলো সেই আত্মহত্যাকারী, তার পালিয়ে যাওয়াকে সেই পরিবারের কি অবস্থা হবে, সে কি একবার ভেবেছে?

ভাবলে হয়ত আত্মহত্যা সে করতোনা। 

 

সুতরাং অনুরোধ করবো, প্লিজ আত্মহত্যাকে কখনোই সলিউশন ভাববেন না, আত্মহত্যার কথা মাথায় আসলেই ঝেড়ে ফেলে দিন, ভাবুন আপনি বেঁচে থাকলে কিভাবে সমস্যার সমাধান করতে পারেন, নিশ্চয় পথ বেরুবেই।

আত্মহত্যা মহা পাপ, আত্মহত্যা যে করে সে জানেনা, তার সাথে সাথে তার পরিবারও খুন হয় তারই হাতে। 

সুতরাং আত্মহত্যার কথা মাথায় এলে নিজের জন্মদায়িনী মার কথা ভাবুন, বাবার কথা ভাবুন, ভাই বোনদের কথা ভাবুন, ওদের কাছে যান, মাকে, বাবাকে জড়িয়ে ধরে রাখুন কিছুক্ষণ, নিশ্চয় আপনার ভুল ভাঙ্গবেই। 

ভালো থাকবেন সবাই, সুস্থ এবং সুন্দর থাকবেন। 

 

সমাপ্ত। 

ছবিঃ গুগল।

৪৪১জন ৫৮জন
0 Shares

৪৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ