আত্মজার চলতে শেখা

নোশীন নূফা ২৩ অক্টোবর ২০১৯, বুধবার, ০৯:০৮:২৬অপরাহ্ন গল্প ২২ মন্তব্য

বাবার হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে হেঁটে চলছিল লাল টুকটুকে জামা পরা ছোট্ট মেয়েটি। অবাক চোখ দু’টি বড় বড় করে দেখছিল সবকিছু। যদিও দেখার উপযোগী তেমন কিছুই নেই আশে-পাশে। তবুও সদ্য পৃথিবীকে চিনতে শেখা চোখ দু’টির কাছে সব কিছুই বড়ই নতুন। আর নতুনত্বই হল পরম সৌন্দর্য। হাঁটতে হাঁটতে গভীর মনোযোগের সাথে দেখছিল কচুরিপানা ভরা ডোবাটা,পাড়ার ময়লা ফেলার জায়গাটির আশেপাশে কিছু খাবারের আশায় ঘুরে বেড়ানো বিড়ালটিকে,পুরোনো দু’চাকার সাইকেলটি আর বড় বড় দাঁড়িওয়ালা তার দাদুর মত দেখতে বৃদ্ধলোকটিকে। যদিও বাবাটি দেখছিল শুধু চলার পথের প্রতিটি ধাপকে। কলার খোসা,পাথর আর ইটের টুকরোগুলোকে পাশ কাটিয়ে মেয়ের হাত ধরে এগিয়ে চলেছেন তিনি।

পাড়ার মধ্যে এ জায়গাটুকুই একটু অপরিষ্কার ও দুর্গন্ধময়। এটুকু পার হলেই একটা ফাঁকা জায়গা আছে। যেখানে বসে বিকেলবেলা শহরের এক কোণের এই পাঁড়ার সকল বয়সী নারী-পুরুষ অনেকটা গ্রামের মানুষদের মতই গল্প করে। বড় বড় স্বপ্নের দায়িত্ব ভুলে এখানে খেলায় মেতে থাকে ছোট শিশুরা। উপরতলার মানুষদের সেখানে খুঁজে পাওয়ার জো নেই। কয়েকটি সুপারি গাছ আর শিশুদের কোলাহলই বলে দেয় এসে গেছে অপরিসর মুক্ত উঠানটি।

বাবা এবার হাতের মুঠি আলগা করে দেয়। সদ্য নিজের পায়ে পুরাদস্তুর হাঁটতে শেখা বাচ্চা মেয়েটি প্রথমে নিজের অজান্তেই একাকী এগিয়ে যায় কয়েক ধাপ। তারপর হঠাৎ বুঝতে পেরে পিছন ফিরে তাকিয়ে ডেকে ওঠে তার বাবাকে। বাবা অনেকটা নিরাসক্ত ভঙ্গিতে মেয়েকে সামনে এগিয়ে যেতে বলে। অভয় দেয়,কাছেই আছে বলে। অভিমানী চোখে বাবাকে একনজর দেখে এগুতে শুরু করে বাচ্চাটি ধাপে ধাপে। কয়েক পা এগিয়ে যাওয়ার পর যখন বুঝতে পারে বাবার সাহায্য ছাড়াও দিব্বি এগুতে পারছে সে,তখন অতিউৎসাহী হয়ে দৌড়াতে শুরু করে দেয়। কিন্তু কয়েক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ একটা ফলের খোসায় পা ফেলায় পিছলিয়ে পরে যায় মেয়েটি। তেমন একটা ব্যথা না পেলেও পরে যাওয়ার দুঃখেই কি না- ঠোঁট উল্টিয়ে,গাল ফুলিয়ে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে নিমিষেই। কয়েক মুহূর্ত পর বাবার হাতের ছোঁয়া পেতেই কমে যায় আহ্লাদী বাচ্চাটির অশ্রুবিহীন কান্নার তেজ। বাবা তাকে কোলে উঠিয়ে জামা থেকে ধুলো ঝেড়ে দিয়ে আবার মাটিয়ে নামিয়ে দেয় আদর করে। ‘দুষ্ট ফলের খোসাটি’-কে বকাবকি করে পথ হতে দূরে সরিয়ে ফেলে বাবাটি। এবার ধীরে ধীরে হাসি ফুটে ওঠে বাচ্চাটির মুখে।

এর মাঝে খেলারত কিছু বাচ্চার হৈ-চৈ শুনতে পেয়ে আবারো দৌড় দেয় বাচ্চাটি। সামনে এবার একটি কাগজের টুকরো পড়ে থাকতে দেখে কি মনে করে তার উপর পা না ফেলে পাশ কাটিয়ে যায় শিশুটি। সামনে নামবিহীন খেলায় মেতে থাকা ছোট-বড় কয়েকটি বাচ্চাকে দেখে একরাশ মুক্ত ঝরানো হাসি ফুটে ওঠে কচি মুখটিতে। পিছন ফিরে আর একবার দেখে নেয় বাবাকে। তারপর মিশে যায় খেলার সাথীদের সাথে। এই প্রথম হাসি ফুটে ওঠে কপালে ভাঁজ পড়ে থাকা বাবার মুখে। মেয়ে আর তার সাথীদের খেলার জন্য যথেষ্ট জায়গা দিয়ে,অদূরে গল্পরত কয়েকজনকে এক নজর দেখে নিজে একপাশে দাঁড়িয়ে দেখতে শুরু করেন নিজের আকাশটুকু।

কাছেই একটা বড় অশ্বত্থ বৃক্ষ,যার ছায়ায় জন্ম নিয়েছে অনেকগুলো চারা গাছ। সূর্য যখন মাঝ দুপুরে নিজের প্রবল তেজে ঝলসে দিতে চায় সবকিছু,তখন এই বৃক্ষ প্রবল মমতায় আগলে রাখে চারা গাছগুলোকে। কিন্তু এখন শেষ বিকেল। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে,সেই সাথে বটবৃক্ষের ছায়াটিও সরে গেছে এক পাশে। আর চারাগুলো মনের আনন্দে দুলছে মৃদ্যু-মন্দ বাতাসে।

#সোনেলাতে_প্রথম_লেখা

৪৭৬জন ৩৪৬জন
3 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য