স্কুল, কলেজ জীবন শেষে ইডেনে ভর্তি হয়ে দেখি, শেষ অবধি অবশিষ্ট রইলাম আমরা দু’জন। বাকি’রা বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছে। একই ডিপার্টমেন্টে, একই হোস্টেলে পারিবারিক গণ্ডির বাইরে শুরু হয় দুই বান্ধবীর অন্য এক সংগ্রামী জীবন।

সকালে ক্লাস শুরুর আগে খিচুড়ি-ডিমভাজি-আচার আমাদের নিত্য দিনের নাস্তা। কখনো বা পুরাতন হলে গিয়ে মামা’র দোকান থেকে পরোটা কিনে আনি। দুটো পরোটা বেশি হয়ে যায়। আবার একটি করে খেলে কম হয়। বিধায় আমরা তিনটি পরোটা কিনি। ভাগাভাগি করে খাই। সেই থেকে শুরু হয় আমাদের ভাগাভাগি’র জীবন। ভাগাভাগি হয় আমাদের সুখ-দুঃখ, ভাল-মন্দ। আমরা একই রকম জামা পরি, একসাথে গাওসিয়া, নিউমার্কেটে যাই। হরতালের বিকেলগুলোয় আজিমপুরের ফাঁকা রাস্তায় হেঁটে বেড়াই। জীবনের শ্রেষ্ঠ এক সময়। শেষে একদিন আটলান্টিকের এই পাড়ে নিউইয়র্কে আমি, আর ওই পাড়ে ইংল্যান্ডে বান্ধবী__ দুই দেশে আমাদের বসবাস।

দশটি বছর বাদে বিশ্বের রাজধানীখ্যাত নিউইয়র্ক শহরে আমাদের দেখা। ভোরের ম্যানহাটন শহর সবে ব্যস্ত হতে শুরু করেছে। আমরা ব্রডওয়ে, পার্ক এভিনিউ পেরিয়ে হেঁটে যাই। অনেক বছর বাদে ব্যস্ত নগরীর রাস্তায় বসে সকালের নাস্তা খাই। ট্রেনে চেপে শহর ঘুরি। টুইন টাওয়ার ধ্বসে পরার পর সেখানে তৈরি মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের আশেপাশে দেখি। সমস্ত দিন হাতে হাত রেখে হেঁটে যেতে যেতে পুরনো দিনগুলোতে হারাই। সন্ধ্যায় লং আইল্যান্ড সিটিতে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ওপারের আলো-আঁধারি’র ম্যানহাটন শহর দেখি। রাতে নিউইয়র্কের বাইরে অন্য শহরে যেতে যেতে গাড়িতে গান শুনি। গলা মিলাই। ওরা স্বামী-স্ত্রী, আর আমরা স্বামী-স্ত্রী চারজন মানব-মানবী হাসি গল্পে মেতে উঠি। বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বন্ধুদের একে, ওকে ফোন করি। আনন্দগুলো শেয়ার করি। অদ্ভুত ভালোলাগা’ময় সময় ! যা কেবলই অনুভবের। আবারও আমাদের একসাথে সময় কাটানোর সুযোগ দেয়ায় সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতায় নত হই।

সব আনন্দও একসময় ফুরায়। সব পাখি নীড়ে ফিরে যায়। আমাদেরও ফিরবার সময় ঘনায়। আমরা বিদায় নেই। একে অপরকে জড়িয়ে ধরি। ভর দুপুরে প্রকৃতির সুনসান নিরবতার মাঝে একে অপরের হৃদস্পন্দন শুনতে পাই। হৃদয় গহীনে কালবৈশাখী ঝড়ের শব্দ শুনি। দু’চোখ ভেসে যায় জলে। আমাদের দু’জনের স্বামী’রা স্তব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অদূরে। দুই বান্ধবীর বিচ্ছেদের সময়টাতে স্বামী’দের চোখে মুখেও এক আকাশ কালো মেঘ জমে, যেন এখনই ঝরে পরবে বৃষ্টি হয়ে।
গাড়িতে উঠে বসি। হাইওয়ে ধরে ছুটছে। অন্য শতশত ছুটে চলা গাড়িগুলোর ভিড়ে মিশে যায় আমাদের গাড়িটি। শাঁইজি লালন শাহ্‌ এর গান বাজছে___”হেলায় হেলায় দিন বয়ে যায়, ঘিরে নিলো কালে… ” এতো দরদী গান ! অশ্রুসজল হয়ে বাইরে চেয়ে থাকি। দীর্ঘ পথ এক নৈঃশব্দ্যে ছেয়ে থাকে।

জীবনের অনেকটা পথ এদেশ ওদেশ ঘুরে দু’টো দিন এক হয়ে থেমে ছিল আমাদের দুই বন্ধু’র পথ। সেইপথ আবারো দুইদিকে বেঁকে গেলো। ছোট্ট এই জীবনটাতে আবার কোনদিন আমাদের দেখা হবে কিনা জানিনা। শুধু জানি___

আত্নায় আত্নায় মিশে থাকা সম্পর্কগুলো এমন এক জিনিস, যা হাজার বছর পরে দেখা হলেও একই রকম আবেগ, অনুভূতি নিয়ে বেঁচে থাকে। বিচ্ছেদে একইভাবে জল ঝরায়।

রিমি রুম্মান
প্যানসিলভ্যানিয়া, যুক্তরাষ্ট্র
আগস্ট ২৭, ২০১৫

৩৪৪জন ৩৪৪জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ