আজ ২৪ জানুয়ারি, গণঅভ্যুত্থান দিবস। ১৯৬৯ সালের এ দিনে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার তথা পাকিস্তানি আমলা-সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে গণবিস্ফোরণ ঘটেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে পরপর তিনটি মাসই গুরুত্বপূর্ণ

ঐতিহাসিক তাৎপর্যে সম্পৃক্ত : জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থানের মাস, ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদের মাস এবং মার্চ স্বাধীনতা সংগ্রামের মাস। ষাটের দশকজুড়ে আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে এবং বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে যে বেগবান আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তারই প্রবল বিস্ফোরণ ঘটেছিল ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি। মূলত ২০ জানুয়ারিই গণঅভ্যুত্থান ঘটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদুজ্জামানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। আইয়ুব খান ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য একের পর এক দমনমূলক ও ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ নিতে থাকেন। ১৯৬২ সালে যে শিক্ষানীতি চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, তা ছিল বাঙালির মেধা ও মননকে পঙ্গু করে দেওয়ার পরিকল্পনা। বাংলাভাষাকে আরবি হরফে তারপর রোমান হরফে লেখার পাঁয়তারা করেছিলেন আইয়ুব। বাঙালি দালালদের সঙ্গে নিয়ে বাঙালি জাতির মগজে চাপাতে চেয়েছিলেন বাঙালি কালচারের পরিবর্তে পাক কালচার।

১৯৬৫ সালে আইয়ুব জনরোষকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করার জন্য পাক-ভারত যুদ্ধ লাগিয়ে দেন কাশ্মীরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। এটা হয়ে দাঁড়াল তার জন্য মারাত্মক বুমেরাং। পয়ষট্টির যুদ্ধের সময় পূর্ববাংলা ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। ব্যাপারটি লক্ষ্য কারছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ সূত্র ধরেই তিনি ১৯৬৬ সালে লাহোরে ঐতিহাসিক ৬ দফা পেশ করেন। ৬ দফা ত্বরিতগতিতে পূর্ববাংলায় জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ৬ দফা হয়ে দাঁড়ায় বাঙালির মুক্তি সনদ। অত্যন্ত সহজ, প্রাঞ্জল ভাষায় বঙ্গবন্ধু জনগণের সামনে ৬ দফার মর্মকথা তুলে ধরতে লাগলেন। ৬ দফাকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘স্বাধীনতার সাঁকো’, প্রয়াত জননেতা আবদুর রাজ্জাককে বলেছিলেন, ‘সাঁকো দিলাম’।

৬ দফার বিরুদ্ধে আইয়ুব খান অস্ত্রের ভাষা প্রয়োগ করেছিলেন। ভুট্টো চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধু সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন। মোনায়েম খান বলেছিলেন, শেখ মুজিবকে জেলে পচে মরতে হবে, তাকে সূর্যের মুখ দেখতে দেওয়া হবে না। ৬ দফার জনপ্রিয়তা ধ্বংস করার জন্য আইয়ুব খান তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করেন। এর এক নম্বর আসামি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর। মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। মামলাটির নামই ছিল স্টেট বনাম শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৬৭ সালেই আইয়ুব সরকারের তথ্যমন্ত্রী এলান জারি করেন যে, রবীন্দ্রনাথ যেহেতু হিন্দু, সেহেতু পাকিস্তান বেতারে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার করা হবে না। এটা পাকওয়াতানের জন্য খুব ক্ষতিকর। এ আক্রমণ রবীন্দ্রনাথের ওপর দ্বিতীয়বার হলো।

১৯৬১ সালে আইয়ুব সরকার রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন করা নিষিদ্ধ করেছিলেন, তাতেও নাকি পাকওয়াতানের ক্ষতি হতো। আইয়ুব-মোনায়েমের রবীন্দ্র উচ্ছেদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের শিল্পী-সাহিত্যিক কবি ও সাংস্কৃতিক যোদ্ধারা অত্যন্ত জোরালো প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেছিলেন।

মূলত ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ঘটে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে কেন্দ্র করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ঐতিহাসিক ১১ দফাও ৬ দফার মতো অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১১ দফাকে সমর্থন করেন মওলানা ভাসানী, পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও। এটা জনতার দাবিতে পরিণত হয়। এ সময় চলছিল ঢাকা কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টের সামরিক আদালতে আগরতলা মিথ্যা মামলার আসামিদের বিচারের প্রহসন। তাদের হত্যার নীলনকশা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু গোপনে মওলানা ভাসানীকে একজন সাংবাদিকের মাধ্যমে একটি চিরকুট পাঠিয়ে অনুরোধ করেছিলেন, ‘মওলানা সাহেব, আমরা সবাই কারাবন্দি, এই দুঃসময়ে আপনি আন্দোলনের হাল ধরুন।’

বঙ্গবন্ধুর চিঠি পেয়ে মওলানা লাফ দিয়ে ওঠে বলেন, মুজিব পাঠিয়েছে না? আমি জানি, আইয়ুব ওদের হত্যা করতে চায়।’ পরদিনই মওলানা পল্টন ময়দানে বিশাল জনসমাবেশে বললেন, জ্বালো জ্বালো আগুনে জ্বালো, জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো।’ আন্দোলন দমন করার জন্য আইয়ুব সরকার ১৪৪ ধারা জারি করেছিল। মওলানা ভাসানী তিনটি সেস্নাগান তুলেছিলেন, আগুন জ্বালো, লাটভবন ঘেরাও করো আর শেখ মুজিবকে মুক্ত কর। তাই করেছিল জনগণ, ঘেরাও, জ্বালাও, পোড়াও আন্দোলন শুরু হয়।

১৯৬৯ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন দুঃসাহসী ছাত্র ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে প্রতিবাদ সভা করেছিল, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শোভাযাত্রা বের করেছিল। কয়েক হাজার পুলিশ, ইপিআর ছাত্র মিছিলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সেই সাহসী তরুণেরা প্রত্যেকেই আহত হয়ে বন্দি হয়েছিল। ২০ জানুয়ারি ছাত্রজনতা ১৪৪ ধারা পদদলিত করে অকুতভয়ে পুলিশ-ইপিআরের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল। সেদিন জনতার মারমুখো প্রতিবাদের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। অকেজো হয়ে গিয়েছিল কাঁদানে গ্যাস। সব বাধা অতিক্রম করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল বিরাট শোভাযাত্রা শহীদ মিনারের দিকে, শহীদ মিনার হয়ে মেডিকেল কলেজের দিকে, সেই শোভাযাত্রার অন্যতম নায়ক আসাদুজ্জামানকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল মেডিকেল কলেজের সামনে। তারপর জনতা আসাদের লাশ ছিনিয়ে মুখোমুখি লড়েছিল সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে আসাদের রক্তাক্ত শার্ট নিয়ে।

২৪ জানুয়ারি প্রতিবাদ দিবস ছিল কিন্তু দিবসটি রূপান্তরিত হলো গণঅভ্যুত্থান দিবসরূপে, দেশব্যাপী হরতাল পালন হয়েছিল সেদিন, জনতার ওপর বার বার গুলিবর্ষণে ছাত্রসহ ৬ জন নিহত ও বহু আহত হয়েছিল। সেক্রেটারিয়েটের গেটে বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে নিহত হন শেখ রুস্তম আলী, মকবুল আর নবকুমার স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র মতিউর রহমান। বিক্ষুব্ধ জনতা শহীদ মতিউরের লাশ নিয়ে ঢাকার সর্ববৃহৎ শোভাযাত্রা বের করেছিল। … আর সেদিনই জনতার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল দৈনিক পাকিস্তান ও মর্নিং নিউজ পত্রিকা অফিস আরও পুড়েছিল আগরতলা মামলার প্রধান বিচারকের এস রহমানের বাসভবন, সরকারি অতিথিশালা, নবাব আসকারির বাড়ি, রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধকারী খাজা শাহাবুদ্দীনের আবাস।

লেখাটি রাসেল রহমান এর ফেইসবুক পোস্ট থেকে নেয়া

২২৯জন ২২৯জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য