আজ বিশ্ব অনুবাদ দিবস

নবকুমার দাস ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১, বৃহস্পতিবার, ০৯:০৩:৩২অপরাহ্ন সমসাময়িক ৭ মন্তব্য

গতবছরের (২০২০) সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়িনী লুইস এলিজাবেথ গ্লাক একজন আমেরিকান কবি।সুইডিশ অ্যাকাডেমির মতে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন মূলত তাঁর “প্রশ্নাতীত কবিকন্ঠের জন্য যা ব্যক্তিত্বের অস্তিত্বকে অনাড়ম্বর সৌন্দর্যে সর্বজনীন করে তোলে।”
শ্রীমতী গ্লাক ১৯৪৩ সালের ২২ এপ্রিল মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সিটিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং লং আইল্যান্ডে বড় হয়েছেন । তার বাবা এক্স-অ্যাক্টো ছুরি আবিষ্কার করতে সহায়তা করেছিলেন। লুইস এলিজাবেথ নিউ ইয়র্কের জর্জ ডাব্লু হিউলেট হাই স্কুল থেকে ১৯৬১ সালে পাশ করেন ও সারা লরেন্স কলেজ এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় পড়তে যান।
১৯৯৩ সালে The Wild Iris সংকলনের জন্য তিনি পুলিৎজার পুরস্কার পান। তিনি National Book Critics Circle Award (Triumph of Achilles), the Academy of American Poet’s Prize (Firstborn) এর পাশাপাশি অসংখ্য পুরস্কারে সম্মানিত । তিনি ম্যাসাচুসেটস এর কেমব্রিজে থাকেন এবং এর আগে ছিলেন উইলিয়ামস্টাউনের উইলিয়ামস কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের বর্ষীয়ান প্রভাষক ( সিনিয়র লেকচারার)। শ্রীমতী গ্লাক বর্তমানে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান, যেখানে তিনি Rosencranz Writer in Residence হিসাবে যুক্ত আছেন। পাশাপাশি তিনি বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃজনশীল রচনা প্রকল্পের সঙ্গেও সংযুক্ত আছেন। এছাড়া তিনি কিছুদিন আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদের সদস্য ছিলেন।
সন্ধানী পাঠক-পাঠিকারা তাঁর কবিতায় আত্মজৈবনিক উপাদানের সঙ্গে ধ্রুপদী মিথের গূঢ় র্সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন । তাঁর রচনায় অনেকেই রিলকে এবং এমিলি ডিকিনসনের উত্তরাধিকার খুঁজে পান। সেদিক থেকে বলা যায় গ্লাক, পশ্চিমি বিশ্বের মূল ধারার কবিতার সঙ্গে তার সম্পর্ক সুগভীর ।
লুইস এলিজাবেথ গ্লাক-এর ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত The Triumph of Achilles কাব্যটি বস্টন গ্লোব লিটারারি প্রেস অ্যাওয়ার্ড, জাতীয় বই সমালোচক সার্কেল পুরস্কার এবং আমেরিকার মেলভিল কেনের কবিতা সোসাইটির পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে । ১৯৯০ সালে প্রকাশিত Ararat কাব্যের জন্যে তিনি The Library of Congress’s Rebekah Johnson Bobbitt National Prize for Poetry পান। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত The Wild Iris কাব্যের জন্যে তিনি পুলিৎজার পুরষ্কার এবং আমেরিকার উইলিয়াম কার্লোসের কবিতা সোসাইটি পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত Vita Nova কাব্যটি The New Yorker’s Book Award in Poetry পুরস্কারে সম্মানিত।
১৯৯৪ সালে লুই গ্লাক-এর প্রবন্ধ সংকলন Proofs and Theories : Essays on Poetry প্রকাশিত হয়। কবিতা সম্পর্কিত এই প্রবন্ধ সংকলনটি ননফিকশন হিসাবে পেন (পি.ই। এন ) এবং মার্থা অ্যালব্র্যান্ড পুরস্কার জিতেছিল। ২০০১ সালে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় লুই গ্লাককে তাঁর আজীবন কৃতিত্বের জন্য Bollingen Prize in Poetry প্রদান করে। তিনি American Academy and Institute of Arts and Letters এর সদস্য এবং ১৯৯৯ সালে Academy of American Poets-এর চ্যান্সেলর নির্বাচিত হন । ২০০৩ সালে তিনি ইয়েল সিরিজে প্রকাশের জন্যে তরুণ কবিদের নতুন বিচারক হিসাবে নির্বাচিত হন এবং তিনি এখনও সেই পদে আসীন আছেন। বিলি কলিন্স-এর উত্তরসূরি হিসেবে ২০০৪ সাল থেকে লুই গ্লাক US Poet Laureate নিযুক্ত হয়েছেন।
আজ লুইস এলিজাবেথ গ্লাকের কয়েকটি কবিতার অনুবাদ পেশ করছি :

একটি উপকথা

দুই মহিলা এসেছিলেন
একই দাবি নিয়ে,
জ্ঞানী রাজার
দরবারে ।
দুজন মা
কিন্তু একটাই সন্তান।
বুদ্ধিমান সম্রাট জানতেন,
এদের একজন মিথ্যেবাদিনী।
তিনি বললেন বাচ্চাটিকে
কাটা হোক সমান দুই অর্ধে
তারপর দেওয়া হোক দুজনকেই
যাতে কেউ ই যাবেনা শূন্য হাতে।
যিনি প্রকৃত মা ছাড়লেন তাঁর দাবি :
এই ছিল সংকেত , শিক্ষা।
ধরো তুমি তোমার মাকে দেখছ
দুই মেয়ের মধ্যে দ্বিধান্বিতা :
তাকে বাঁচাতে
নিজেকে নিঃশেষ করা ছাড়া
তুমি কিই বা করতে পারো।
তিনি বুঝবেন
কোন সন্তান সঠিক,
যে সহ্য করতে পারে না
মায়ের ভাগাভাগি।

(A Fable কবিতার অনুবাদ ,অনুবাদক – নবকুমার দাস )

একটি কল্পনা

আমি তোমাকে কিছু বলব : প্রতিদিন
মানুষ মারা যাচ্ছে। এবং এটা একটা শুরু ।
প্রতিদিন,অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জন্মনিচ্ছেন নতুন বিধবা,
নতুন অনাথ। তাঁরা বসে আছেন হাত গুটিয়ে,
এই নতুন জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এরপরে গোরস্থানে এসেছেন ওরা, এদের ক’জন
এই প্রথম এসেছেন। তারা কাঁদতেও ভয় পাচ্ছেন ,
আবার না কাঁদতেও । কেউ ঝুঁকে পড়ে বলে দিচ্ছেন,
তাদের পরবর্তী কর্তব্য, যার অর্থ হতে পারে
কয়েকটি শব্দ উচ্চারণ,কখনো কখনো
ছুঁড়ে দেয়া টুকরো টাকরা খোলা কবরে ।
এবং তারপরে, সবাই ফিরে যায় ঘরে,
যেখানে হঠাৎ নেমেছে দর্শনার্থীর ঢল
সোফায় বসে সম্ভ্রান্ত একাকী বিধবা সুন্দরী,
তাঁর কাছে যাওয়ার জন্য লোকেরা সার দিয়ে দাঁড়িয়েছে তাই ,
কেউ তার হাত স্পর্শ করছেন, কেউ করছেন আলিঙ্গন।
সবাইকে কিছু না কিছু বলার চেষ্টা করছেন তিনি ,
ধন্যবাদ জানাচ্ছেন, আসার জন্য জানাচ্ছেন অসীম কৃতজ্ঞতা।
মনে মনে, তিনি চান যে তারা যেন চলে যায় দূরে।
তিনি ফিরে আসতে চান কবরস্থানে,
ফিরে যেতে চান সেই হাসপাতালে। তিনি জানেন
এটা সম্ভব নয় তবুও তাঁর একমাত্র আশা,
সরে সরে যাওয়া অনেক পিছনে। আরো একটু পিছনে ,
তাঁর স্মৃতিজুড়ে এখনো বিবাহের প্রথম চুম্বন ।

(A Fantasy কবিতার অনুবাদ ,অনুবাদক – নবকুমার দাস )

স্বীকারোক্তি

যদি বলি আমি নির্ভয়–
তাহলে তা সত্যি নয় ।
অসুস্থতা,অপমানকে আমি ভয় পাই।
সবার মত আমারও আছে স্বপ্ন।
তবে আমি এসব আড়াল করতে শিখে গেছি,
পরিপূর্ণতা থেকে নিজেকে
রক্ষা করার জন্য : সমস্ত সুখই
ভাগ্যের রোষ টেনে আনে ।
তারা যেন দুই বোন, বুনো —
আসলে ওদের মধ্যে
আবেগ নয় বরং আছে ঈর্ষা।

( Confession কবিতার অনুবাদ, অনুবাদক – নবকুমার দাস )

ভোর
(১)
অন্ধকার ঘরে ঘুম থেকে জাগছে শিশু
চেঁচিয়ে বলছে,”চই চই ফিরে চাই, চই চই ফিরে চাই”
সে যে ভাষায় বলছে তার একটুও বুঝছে না কেউ ? –
হাঁস নেই ।
তবে কুকুর, সাদা রঙের সব বিলাসী সারমেয় ?
ঘেউঘেউটি শুয়ে আছে ঠিক তার পাশের দোলনায় ।
বছরের পর বছর ? – ? একই ভাবে কেটে যায় কত যে সময় ।
সবই একটা স্বপ্নের ভিতর । কিন্তু হাঁস চই চই ? –
কেউ জানে না তার কোনো খবর ।

তারা আছে ? সবেমাত্র দেখা হয়েছে, এখন
একটা খোলা জানালার কাছে ঘুমাচ্ছে ওরা দুজন ।
একটুকু জাগাও ওদের, ওদের আশ্বাস্ত করো
জানো কি আছে ওদের মনে ? রাতটা বেশ,
খুব কি জরুরি ,এই ঘরে আলোর প্রবেশ ?
যে পরিস্থিতিতে এমনটা হচ্ছে তা তাদের দেখানো দরকার :
আধখানা মোজা ? লুকানো আছে নোংরা মাদুরের তলায় ,
সবুজ পাতা দিয়ে সাজানো লেপ কম্বল ? –
অরুন আলোয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সব কিছু
শুধু এগুলিই , নয় আর কিছু,
বোঝা যাচ্ছে সমস্ত সীমারেখা , নিশ্চিত ? এলোমেলো কিছু নয়,
তারপর লম্বা কাহিনী,প্রতিটি বিষয়ে
বিস্তারিত বিবরণী,খুঁতখুঁতে,ইংরাজী লেখার মতো,
হয়তো বা বিছানার চাদরে রক্তের ছিটে ? –

ওরা থাকে সারাদিন আলাদা,তারপরে।
আরো পরে, বাজারের একটা দপ্তরে , ,
তাঁর দেওয়া হিসাবে খুশি নয় সুচতুর ম্যানেজার,
বেরিগুলো পঁচা,উপরের সারির ঠিক নিচের তলার ? –
পৃথিবী থেকে সরে আসে কেউ একা একা
কেউ অব্যাহত রাখে, নেয় অন্যের ভূমিকা ? –
পঁচা ফলগুলোয় যখন তোমার নজর পড়ে ।
ততক্ষনে তুমি পৌঁছে গেছ বাড়ি,ঢের দেরী,অন্য কথায়।
যেন পলকের জন্য রোদ্দুর ধাঁধিয়ে দিয়েছে তোমায় ।

( শ্রীমতি লুইস এলিজাবেথ গ্লাকের Dawn কবিতার বাংলা ভাষান্তর, অনুবাদক – নবকুমার দাস )

১৫৫জন ২১জন
0 Shares

৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য