৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অত্যুজ্জ্বল মাইলফলক স্বরুপ। বঙ্গবন্ধু এদিন তাঁর সর্বশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করবেন একথা পয়লা মার্চ পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করার পরই সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণা করেছিলেন। ফলে ৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসভার জন্য সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী যেমন, তেমনি পাকিস্তানের সকল রাজনীতি সচেতন মানুষও উৎকণ্ঠচিত্তে অপেক্ষা করেছিলেন।

যদিও ৩ মার্চ তারিখে পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগ-শ্রমিক লীগ আয়োজিত সভাতেই বঙ্গবন্ধু তাঁর চূড়ান্ত কথা- বাংলার স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন। ৩ মার্চেই তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, ভাষণের পরপরই তাঁকে সম্ভবত গ্রেপ্তার করা হতে পারে। এজন্যই বঙ্গবন্ধু শেষ নির্দেশনাবলি ঘোষণা করে ” আমি যদি নাও থাকি” কথা ক’টি উচ্চারণ করেছিলেন।

৭ মার্চ সকাল থেকেই রেসকোর্স ময়দান লোকারণ্য হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ শোনার জন্য আগমন করেন। এদিন বঙ্গবন্ধু ছিলেন দৃঢ়চিত্ত। তিনি মঞ্চে উঠেই সরাসরি মাইক্রোফোন এর কাছে যান এবং বলেন- “আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি”।

এরপর বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সাল থেকে আজকের দিন পর্যন্ত পাকিস্তানের রাজনীতিতে বাঙালিদের ওপর পরিচালিত নির্যাতনের ইতিহাস বর্ণনা করেন। ২৫ তারিখে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার নতুন প্রস্তাবিত পরিষদ অধিবেশন বসা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শর্তারোপ করে বলেন-

১. সামরিক আইন মার্শাল ল’ Withdraw করতে হবে,
২. সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ভিতরে ঢুকতে হবে
৩. যে ভাইদের হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে
৪. আর আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত দৃঢ় কন্ঠে আরো বলেন, “আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাইনা। দেশের মানুষের অধিকার চাই।”

তিনি নির্দেশ দেন-

“এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারী, আদালত- ফৌজদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরীবের যাতে কষ্ট না হয় সেজন্য… রিক্সা, গরুর গাড়ি, রেল গাড়ি চলবে। কিন্তু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি গভর্ণমেন্ট দপ্তর, ওয়াপদা কোনকিছু চলবে না।

তিনি প্রতি মাসের ২৮ তারিখে গিয়ে কর্মচারীদের বেতন নিয়ে আসতে বলেন। বঙ্গবন্ধু ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন- রেডিও-টেলিভিশন যদি আমাদের খবর না দেয় তাহলে কোন বাঙালি সেখানে যাবে না। তিনি ২ ঘন্টা ব্যাংক খোলা রাখার নির্দেশ দেন।

এরপর বঙ্গবন্ধু সর্বশেষ দু’টি বাক্য উচ্চারণ করেন যা পরবর্তী সময়ে বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার চূড়ান্ত সংগ্রামে অমূল্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। বঙ্গবন্ধু বলেন- ” রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর বজ্রকন্ঠে স্বাধীনতার কথা ৮ মার্চ ঢাকা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি নিজের কানে শুনতে পায়। ৭ মার্চের ভাষণের একদিন পর অর্থাৎ ৮ মার্চ থেকেই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন সহায়ক বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক তৎপরতা কার্যকর হতে শুরু করে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে নিরপেক্ষতার অন্যতম একটি মূল্যায়ন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে- “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” বলাটাই যুক্তিযুক্ত ছিল। পাকিস্তানের নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে তিনি যদি সেদিন সরাসরি বলতেন, “আজ হতে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র’ এবং এটা তিনি বলতে পারতেন। কিন্তু বাংলার জনগণের তরফ থেকে তার প্রতিক্রিয়া হতো একই রকমের যার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল- “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” এই উচ্চারণ ও ঘোষণা থেকেই। জনগণের কাছে এই দু’টি বাক্যের পার্থক্য অন্তত সেদিন হয়নি। যদিও এ নিয়ে এখন রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে।

৭ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও পরবর্তীকালে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন। মার্কিন সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরে অর্থাৎ ১৯৭২ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেন-

৭ মার্চ যখন আমি ঢাকা রেসকোর্স মাঠে আমার মিটিং শেষ করি, ওই মিটিং-এ উপস্থিত দশ লাখ লোক দাঁড়িয়ে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানকে স্যালুট জানায় এবং ঐ সময়ই আমাদের জাতীয় সংগীত চূড়ান্তরুপে গৃহীত হয়ে যায়…

আমি জানতাম কি ঘটতে যাচ্ছে, তাই আমি ৭ মার্চ রেসকোর্স মাঠে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করেছিলাম এটাই স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য যুদ্ধ করার মোক্ষম সময়।…

আমি চেয়েছিলাম তারাই (পাকিস্তানি সেনাবাহিনী) প্রথম আঘাত করুক। আমার জনগণ প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত ছিল।

৭ মার্চে ” জাতীয় সংগীত চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়ে যায়” বঙ্গবন্ধু এই উচ্চারণগত স্বীকৃতিতেই প্রমাণিত হয়, সেদিন থেকেই স্বাধীনতা অর্জন সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম শুরু হয়ে গিয়েছিল। এদিন স্বাধীনতা ঘোষণার কোন কার্যক্রম আর বাদ থাকেনি বঙ্গবন্ধুর ভাষ্যেও তা প্রমাণিত হয়। এভাবে ৭ মার্চের ভাষণ সারাদেশের মানুষের মনকে রোমাঞ্চিত করে তোলে। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস বঙ্গবন্ধুর এই ৭ মার্চের ভাষণই প্রতিদিন বাজিয়ে শোনানো হতো বাঙালির মনোবলকে অটুট রাখার জন্য।

কৃতজ্ঞতা –

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস- ডঃ মোহাম্মদ হাননান কর্তৃক লিখিত বই থেকে লেখার তথ্য বর্ণিত।

তথ্যসূত্র-
=======

১. দৈনিক আজাদ ও দৈনিক ইত্তেফাক, ৭ মার্চ ১৯৭১

২. বজ্রকন্ঠ (পুস্তিকা) বাংলাদেশ সরকারের তথ্য দফতর কর্তৃক প্রচারিত, ১৯৭২

৩. মার্কিন সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের সাথে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সাক্ষাৎকার, বাংলাদেশ ডকুমেন্টস, ২য় খন্ড থেকে অনূদিত।

৪৩৩জন ১৮৯জন
57 Shares

২৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ