সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

আজ অপুর বিয়ে

মোঃ মিজানুর রহমান সুমন ২৮ জানুয়ারী ২০২০, মঙ্গলবার, ০৯:০০:৪১অপরাহ্ন ছোটগল্প ২৩ মন্তব্য

আজ অপুর বিয়ে

তার সব বন্ধু বান্ধব মোটরসাইকেলের সামনে মশাল জ্বালিয়ে ঘুরছে পুরোটা শহর, দেখতে অনেকটা পাহারাদারের মত, কিংবা শহুরে নেতা।
সবগুলো মানুষ যখন ঘুমিয়ে পরবে তখন ই জেগে উঠে এরা, হু হু হাহা কিংবা হৈ হৈ শব্দে মাতিয়ে রাখে গোটা শহরটাকে, ঘুমন্ত শহর জাগ্রত হয়ে উঠে। আশাহতরা ফিরে পায় তাদের আশা।

প্রথম সাড়িতে থাকে তিনটা মোটর সাইকেল, সেগুলোকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তিনজন চালক। এরা অনেকটা ভ্যান চালক কিংবা রাখাল ছেলের মত। ভ্যান চালকরা মালবোঝাই ভ্যানটিকে যেভাবে ঠেলে কিংবা টেনে, চালিয়ে নিয়ে যায় সামনের দিকে অথবা বাধা গরু গুলোকে সন্ধার আগে দড়িতে টেনে ধরে যেভাবে নীড়ে নিয়ে যায় রাখাল ছেলেটি, ঠিক তাদের মত। শহুরে এই পাহারাদার গুলোকে টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছে পুরোটা শহর।

তাদের পেছনে একজন করে বসে থাকা মানুষগুলো আটকে ধরছে সময়কে, আমার দৃষ্টিতে তারা ফটোগ্রাফার কিংবা জেলে…
সময়কে আটকে ধরার যন্ত্রগুলো কাধে কিংবা হাতে নিয়ে বসে আছে। ঠিক যেমন জেলে তাকিয়ে থাকে তার জালের দিকে কিংবা পুকুরে বড়শি ফেলে পাড়ে চুপটি করে বসে থাকা মানুষটির মত। বড়শি ফেলে একনজরে তাকিয়ে থাকে তারদিকে। হঠাৎ কোন মাছ এসে কামড় বসালেই টুপ করে আটকে ধরবে। এ মানুষগুলোও তেমন। বড়শি ফেলে তাকিয়ে থাকে সময়ের দিকে। টুপ করেই আটকে ফেলে একটুকরো সময়। মুহুর্তেই বন্দি হয়ে যায় মায়াজালে। এ মানুষগুলো সময়ের দৃষ্টিতে অনেকটা জল্লাদের মত কিংবা শহুরে পুলিশ অথবা জেলখানা।
জল্লাদেরা যেমন দড়ি নিয়ে দাড়িয়ে থাকে রুমালের দিকে, মাটিতে পরা মাত্রই টেনে ধরবে রশিটি। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে মাটিতে ঝুলে পরবে লাশ কিংবা শহুরে পুলিশ গুলো ধরে ফেলে আসামিকে অথবা জেলখানা গুলো আটকে রাখবে সময় গুলোকে। সময়রা একসাথে যাবে, মাঝে মাঝে ভয়ে আতকে উঠবে তারা, শহুরে পুলিশ কিংবা জেলখানা গুলোর কথা ভেবে। তাদের দৃষ্টিতে এ ফটোগ্রাফার গুলো অনেকটা ডানা ওয়ালা দৈত্যের মত, উড়ে এসে ধরে নিয়ে হারিয়ে যাবে শূন্যে কিংবা মহাশূন্যে…

পেছনের সাড়িতে থাকা পাহারাদার গুলোর অপেক্ষায় বসে প্রহর গুনে ঘুমন্ত মানুষগুলোকে বুকে নিয়ে জাগ্রত থাকা শহরটা। এখানে আমার দৃষ্টিতে ঘুমন্ত মানুষগুলো জাগ্রত শহরের আদুরে সন্তানের মত। যেন চোখ বন্ধ করে শত বিশ্বাস বুকে নিয়ে মষ্তিষ্কটাকে কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম দিয়ে আরামে ঘুমোচ্ছে। আর শহরটা কোন গহীন গ্রামে বৃষ্টির দিনে বাচ্চা গুলোকে বুকে আগলে ধরে ঘরের এক কোনে বসে কাঁপতে থাকা মুরগির মত।

লাইনের পর লাইন, সাড়ির পর সাড়ি…
একটার পেছনে অন্যটা কিংবা এটার পাশে ওটা।
সবার গাড়ির সামনে মশাল জ্বলছে ধাও ধাও। কিছু সময় পর পর হুহু হাহা কিংবা হৈ হৈ শব্দ

অপু বসেছে বিয়ের পীড়িতে, মুখে রুমাল, মাথায় টুপি অআর গায়ে শেরওয়ানি
অপুকে দেখে আমার অনেকটা মুখোশধারী মনে হয়। কিংবা খোলস পড়ে বসে থাকা কোন গিরগিটির মত,
আপাতত এ মুখোশটা বউ শিকারের।
বিয়ের আগে অপু যখন প্রেম করতো তখনও সে মুখোশ পরিধান করতো, এ মুখোশ আর সে মুখোশের মাঝে কোন মিল আমি খুজে পাচ্ছিনা। হয়ত এটা আমার ব্যর্থতা, নয়ত অপুর স্বার্থকতা।
তবে মুখোশটা আমার চোখে স্পষ্ট…

তার পাশেই বসে আছে নতুন বউ, তাকেও কেন জানি আমার মুখোশধারীনি বলে মনে হচ্ছে। হয়ত এই মেয়েটারো কোন প্রেমিক ছিল বিয়ের আগে, প্রেমিকার মুখোশ পড়ে দেখা করতে যেত সে। আজ সে মুখোশটা আমি খুজে পাচ্ছিনা কোথাও। তার মানে খোলসের সাথে মুখোশটাও পাল্টিয়ে নিয়েছে। লজ্জায় কেউ কারো দিকে তাকাতে পারছেনা। আমি এ লজ্জাবোধের ভেতরেও একটা মুখোশ দেখতে পাচ্ছি। লুকায়িত মুখোশ…
বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেলে তারা আলাদা রুমে ঢুকে পরবে, লজ্জায় দুজনই লাল হয়ে থাকবে। তবে এ লজ্জাবোধের স্থায়িত্বকাল খুব বেশি সময় নয়। দুজন দুজনার হয়ে যাবে, নিভে যাবে আলো, ভেঙ্গে যাবে লজ্জাবোধ, খুলে যাবে মুখোশ

৪০৯জন ২৬৮জন
15 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য