তীর্থ, চশমা পড়া দাদার বড়ো ছেলে অর্ঘ্য-আগ্নিক এবং রানার মেয়ে রূপকথা রাই...
তীর্থ, চশমা পড়া দাদার বড়ো ছেলে অর্ঘ্য-আগ্নিক এবং রানার মেয়ে রূপকথা রাই…

১২ মার্চ বাপি-মামনির বিয়েবার্ষিকী। দুজনের এখনও যে প্রেম, তাই যতো ঝড়ই আসুক না কেন, নিজেদেরকে শুভেচ্ছা জানাবেই। অথচ এবার তেমন কিছু হয়নি। বাপির ব্লাড সুগার এই দেখা যাচ্ছে সকালে পনেরো তো বিকেলে সাত। আমার দিন গোণা, আর তো মাত্র কয়েকটি দিন। এর মধ্যে সব ঠিক হবে তো? নাহ সেভাবে চিন্তা করিনি, বরং মনে হচ্ছিলো সবই ঠিক হবে। বাপি ডেকে জিজ্ঞাসা করে “টাকা তোর আছেনি(আছে)? আমার ব্যাঙ্কে…।” বললাম টাকা নিয়ে ভাবতে হবেনা, আর যদি টাকার কথা বলো আর আসবোই না। চোখ থেকে আবারও জল। বললাম কাঁদছো কেন? রাধা বিরহে কাতর? আবার একটা ছোট্ট করে হাসি। বললাম শোনো উত্তম কুমার তোমার সুচিত্রা এলে উইশ করো। আমি নয় বাইরে থাকবো। কি টান দুজনের, মামনি দেখি চলে এলো। তাও পদ্ম মাসীকে নিয়ে। আমি তো অবাক! মামনি তুমি কি করে এলে? চিনলে কিভাবে? অমনি পদ্ম মাসী বললো, “মা গো তোমার মা খালি ডরায়। কইলাম চলো আমি চিনি। ভুল হইলে নীলা মায়েরে ফোন কইরা দিবো।” মামনি বলে, “শোন পদ্মর কথা। আচ্ছা ভুল রাস্তা হলে কিভাবে বুঝবো কোথায় আছি? হানিফ সঙ্কেতের সেই ইত্যাদির মতো হবে শেষে মাইক লাগিয়ে নিজের ঠিকানা খোঁজা।” হাসতে হাসতে শেষ। বাপি দেখি বেশ মিশ্র চোখে চেয়ে আছে। ব্যথা তো, না পারছে সেভাবে হাসতে। ভেতরে ভেতরে কষ্ট এবং রাগ। যা আমার হয়, সেটা বাপির সাথে মিলে যায়। বললাম ও মামনি আজ বলো তো কি? মামনি আছে শুধু ভাব ধরে। যেনো জানেই না কি! বললাম সব ভুলে যেতে পারো, আজকের তারিখ ভুলে যাবার কথা নয় মোটেই। তবে মামনি যখনই আসে হাসপাতালে, তখনই বাপির মাথায় একটা হাত বুলিয়ে দেয়। তারপর গালটা ঠেকায় বাপির মাথায়। আর আজ এসেও সেটাই করলো। যাক তখন মামনি বললো, “পুজা দিয়েছি। আর শোন আজ রাত আমি আর পদ্ম থাকবো, তুই বাসায় গিয়ে রেষ্ট নিস।” বললাম এভাবে বললেও তো পারো, একান্তে দুজন থাকতে চাও! মামনি অমনি বলে, “ধুর কি যে সব কথা বলিস! শুধু ফাজলামী করিস তুই।” বললাম তাহলে শান্ত হয়ে রাগ দেখাই, সেটাও তো নিতে পারোনা। মামনি বললো, “শান্ত থেকে রাগ? ওটা আবার কেমন! যা তুই।” বাপির দিকে চেয়ে বললাম, এতো প্রেম রাখো কি করে? কপাল আমার এমন প্রেমিক আমার জীবনে জুটলো না। মামনি বললো, “কি সব কথা বলিস! তরুণ কতো দেশ নিয়ে ঘুরিয়েছে তোকে?” হায়রে দেশভ্রমণে বুঝি প্রেম?

মৌয়ের বাসায় যাবো, ওই সময় জিসান নানার ফোন। “নাত্নী তুই কি হাসপাতালে? আমি আইসি।” অবাক হয়ে গেলাম হাসপাতালের নাম জেনে বাপির কেবিন নাম্বার বের করে ফেললো? কতোদিন পর নানাকে দেখবো। কি এক আনন্দ! বোঝাতে পারবো না। যে নীলাকে দেখেছিলো নানা, সেই নীলা যে আর নেই! কতো বদলে গেছি! নানা কি কষ্ট পাবে আমার এই বদলে? এলিভেটরের সামনে পায়চারি, কোনটায় আসবে! অথচ খুব ভালো করেই জানি এগারো তলায় মধ্যের লিফটটাই থামে। তাও অস্থিরতা। নানাকে দেখেই ছুটে জড়িয়ে ধরলাম। নানাও আগলে নিলো।
–নাত্নী বদলাস নাই।
–কি কও! সত্যি বদলাই নাই নানা?
–অখন ক কেমন আছিস?
–আইজ ভালো দিনে আসছো।
–ক্যান? কি আইজ?
–বাপি-মামনির এনিভার্সারি।
কেবিনের ভেতর গেলাম আবার নানাকে নিয়ে। বাপি-মামনি ঠিক চিনতে পারলো। নানাকে দেখে বাপির চোখের জল আবার গড়িয়ে গেলো। বাপি-মামনির সাথে নানার পরিচয় ২০১০ সালের ২০ আগষ্ট তারিখে “অহল্যা জীবন” বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে। সেদিন নানীও এসেছিলো। ২০১০ সালে যে বাপি স্পিচ দিলো, আজ সে বিছানায় শুয়ে। সময় কি করে ফেলে! যাক নানার সাথে তারপর বেশ গল্প। একটু শান্ত-শিষ্ট তো হতে হয়েছে, কিন্তু হাসিটুকুর বদল হয়নি। আমার কথা নয়, নানার কথা। জানি ওই বুড়োর কি এসব কথা মনে আছে? সেদিন ওভাবেই করিডোরে গল্প।
–নাত্নী চশমা পুরান ঢাকা থাইক্যা বানা।
–নানা তোমার মাথা খারাপ? কে যাইবো পুরান ঢাকা? কারে নিয়া যামু? কিচ্ছু চিনি না এখন আমি।
–শোন আমি তো আবার আসমু ঢাকায়, তখন তোরে নিয়া যামু।
যাক নানা আরেকদিন এসেছিলো, আর সেদিনের গল্প পরে। ওরই মধ্যে নানা চলে গেলো, নীচে গেট পর্যন্ত গেলাম। ওদিকে আবার মামনি ফোন দিলো, বুঝলাম কোনো দরকার। গেলাম আবার উপরে। দেখি গিয়ে হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় ওখানে। বাপির জন্য ব্রিফ-তুলা-ভেঁজা টিস্যু আনতে হবে। ঠিক আছে বলে বাইরে পা রাখতেই খালা এসে বললো আমায় একটা ভালো দেখে এয়ার ফ্রেশনার আনতে। গেলাম, মামনির আবার ফোন। “নীলা আমার জন্য Zantac নিয়ে আসিস।” সব কিনে নিয়ে গেলাম। আজকের দিনের জন্য কতো প্ল্যান ছিলো কানাডা থেকে আসার আগে। ভাবছিলাম রাস্তা পার হতে হতে ১২ মার্চ কি বাপি-মামনির হাসপাতালে থাকার কথা ছিলো?

ওভাবেই চলছিলো হাসপাতাল আর বাসা। দাদু-নাতির দেখাও হয়ে গেছে। বাপির সেই কান্না, তারপর হাসি। ওভাবেই চলছে। আমিও এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তবে কান্না আমার অসহ্য। চোখের জল আনন্দে ফেলি, কান্না সবার জন্যে নয়। দাদু-নাতির কিছু মুহূর্ত ছিলো এমন। বাপিকে ভ্যাঙচি কাটা, নকল করে কথা বলা আর বাপি যা যা করে সেভাবে করা। তীর্থ বেশ হাসালো। তবে বাপির মেজাজ গরম হলো একবার, অমনি তীর্থও দেখাদেখি। ওখানে যারাই ছিলো হাসতে হাসতে গড়াগড়ি। ১৫ মার্চ তীর্থর জন্মদিন ভুলেই গেছি। আসলে সেদিন অসম্ভব ব্যস্ত ছিলাম। তারপর প্রায় সারাদিন-রাত হাসপাতালেই, কি আর মনে থাকে! যখন মৌ বললো বললাম হায়রে আমি তো ভুলেই গেছি! বিকেলেই বললাম তীর্থকে আজ হাসপাতাল চল। ভাইয়া-দিদিমনি অপেক্ষা করছে তোর জন্য। আর সত্যিই তাই। তীর্থর সাত বছরের জন্মদিনে বাপি-মামনি কি স্ফূর্তি করেছিলো। কোথায় ২০০৯ সাল আর কোথায় ২০১৫! সময় কিভাবে ছোটে। তীর্থ যেতেই কি আদর বাপি-মামনির। মামনিকে বললাম যাবার সময় তীর্থকে নিয়ে যেও। মামনি বললো, “আজ তুই থাক তীর্থর সাথে।” বললাম না, আজ তুমি থাকবে। মনে মনে আমি অনুভব করছি মামনি আজ চাইছে তীর্থকে নিয়ে সময় কাটাতে। হঠাৎ দরজায় শব্দ। খুলে দিতেই তীর্থর সব কাজিনরা এলো। আমার বড়ো দাদার দুই ছেলে অর্ঘ্য-আগ্নিক, রানার মেয়ে রাই। আর ছিলো জয়ী, রানা, বড়ো বৌদি সোনালী(তীর্থর জন্মের পর প্রথম বৌদি-ই ওকে কোলে নেয়), রানা, বড়ো মামী তো ওখানেই ছিলো। আর এসেছিলো পদ্ম মাসী, ভাগ্যবতী। মানে বেশ জমজমাট আসর। অপু-মৌ কেক নিয়ে এলো। দাদা চলে যাবার পর বৌদির সাথে দেখা। ওই হাসিটুকু একেবারেই নেই। কেন মানুষের ভালোবাসা থেমে যায় মৃত্যুর কাছে? দাদার বড়ো ছেলে অর্ঘ্য ওর জন্মের সময় আমিও ছিলাম ধানমন্ডির কোনো একটা নার্সিং হোমে। ক্লাশ শেষ করে এসেই বসে থাকা ওটাকে নিয়ে। সেই অর্ঘ্যকে দেখলাম কত্তো বড়ো হয়ে গেছে। টেনে নিয়ে বললাম আয় আমার কোলে। বললো বড়ো হয়ে গেছে। তাও কোলে নিয়ে বসেছি, লজ্জ্বা কি! বললাম তুই আমার কাছে কোনোদিন বড়ো হবিনা। অনেক আদরের বাবাটা আমার। সেদিনটা কেটে গেলো। সময় ঘনিয়ে আসছে। কাউন্টডাউন শুরু কারণ দেশের সময়ের রাত্রির ঘুমে তখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আর মাত্র বারো দিন।

এই মেয়ে ডুবে যেওনা। ভেসে থাকো পদ্মপাতার মতো।
জল ছুঁয়েও জল ধারণ করোনা।
তুমি বড্ড একা, তবু একা রেখোনা
একাকী আকাশে আলো ছড়াও
নিজেকে আঁধারে ঢেকোনা।
এই মেয়ে ভালোবাসো? কাকে?
যাকেই বাসো, তোমার নিজস্বতাকে বিসর্জন দিওনা
বড্ড বোকা তুমি, কেউ জানেনা
এমনকি তুমি নিজেও না।
তাই সাবধান!
আটকে রেখো,
আবেগ কুড়িয়ে এনে আঁচলে জড়িও না।
এই মেয়ে তুমি কারো সম্পত্তি না।

**(গ্রীনলাইফ হাসপাতালে রাত জেগে বসে লিখেছিলাম “এই মেয়ে”)

ক্রমশ

হ্যামিল্টন, কানাডা
৬ অক্টোবর, ২০১৫ ইং।

তীর্থ ওর দিদিমনি-ভাইয়ার সাথে...
তীর্থ ওর দিদিমনি-ভাইয়ার সাথে…
পদ্মমাসী, ভাগ্যবতীর সাথে তীর্থ...
পদ্মমাসী, ভাগ্যবতীর সাথে তীর্থ…
নানা এবং নাত্নী...
নানা এবং নাত্নী…
৪৪৩জন ৪৪৩জন
0 Shares

৩৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ