ভোরের শহর...
ভোরের শহর…

এক নতূন সকাল। বাপি ঘুমোচ্ছে ১১০২ নম্বর রুমের কেবিনে। আমি জানালা দিয়ে ঢাকা শহর দেখছি। অনেক ভোরে ঢাকা শহরটাকে অনেক দূরের লাগতো একসময়। বরং ব্যস্ত শহরটাকে নিজের মনে হতো। হাসপাতালে আজ প্রথম সকাল। সেই রাতে আমি আর মামনি ছিলাম।  সারারাত ঘুম হয়নি। জেটলগ যে কি জিনিস, তা হাড়ে হাড়ে বুঝেছি জীবনে বহুবার। ভোর পাঁচটায় টম এন্ড জেরী কার্টুনের টমের মতো ঢুলে পড়ছি। চোখের সামনে বিছানা, ইস একটু যদি ঘুম। কিন্তু তা কি আর হয়! যাক বাপির চোখ খুললো, চেয়ে দেখছে। বললাম কি? ওয়াশ রুমে তো যেতে পারবেনা, ডাকতে গেলাম ওয়ার্ড বয়কে। দেশের হাসপাতালে ওয়ার্ড বয়দের যা বসিং, নিজেকে মনে হয় উনাদের দয়ায় চলছি। তবুও ডাক্তার বোনের কল্যাণে কিছু সুযোগ-সুবিধা তো উপরি। তার উপরে ডাঃ কৈরীর একজন স্পেশাল রোগী। এছাড়া বাপির মেয়ে কানাডা থাকে, তিন সপ্তাহ পর চলে যাবে। একটা হেভি দাম আছে না? এগারো তলার সব নার্স-ওয়ার্ড বয়-খালা আমায় ভালোই চেনে। হায়রে বিদেশ। তাছাড়া এখানে আমি হেলথে আছে, সেও ডাঃ কৈরীর সৌজন্যে জেনে গেছেন অনেকেই। নার্স এসে বলবে, “দিদি এই দেখুন ঠিক আছে না?” কি যন্ত্রণা!

যাক তারপর হাসপাতালের সেই প্রথম সকালে ডাক্তারের অপেক্ষায়। সারারাত একজনও ডিউটি ডাক্তারের মুখ দেখিনি। আমারও সমস্যা ছিলোনা, তাই খবর করিনি। জেটলগের কল্যাণে একদিকে ভালো হয়েছিলো, সারারাত স্যালাইনের দিকে চোখ রাখতে পেরেছি। সকাল আটটার দিকে জয়ী এলো সকালের খাবার নিয়ে। আহ ক্ষিদে, পাতলা রুটি, সব্জী, ওমলেট। আর প্রিয়র চেয়েও প্রিয় কফি। উফ এখনই খেতে ইচ্ছে করছে যে! সকালের খাবার শেষ করার পর জয়ী চলে গেলো। অবশেষে প্রফেসর ডাক্তার এলেন, পেছনে পেছনে ডিউটি ডাক্তার। যাক ডিউটি ডাক্তারের চেহারাটা দেখলাম। সাথে নার্স। বললেন বাপির ব্লাড সুগার নরমাল না। সময় লাগবে অপারেশনে। সব রিপোর্ট দেখার পর বেশ কিছু সাজেশন দিয়ে গেলেন। ইনসুলিন দেয়ার আধ ঘন্টা পর খাবার খাওয়াতে হবে।

মামনি বললো বাপিকে খাইয়ে দেবে। আমি বললাম না আমি-ই খাইয়ে দিই। যখন খাবার খাওয়াতে গেলাম রুটি এমনই শক্ত আমি হাত দিয়ে ছিঁড়তেই পারছিলাম না। এ জীবনে এমন রুটি খাওয়া তো দূর হাতেই নিইনি। আর হাসপাতালের রুটি এমন হয়, হতে পারে! যাক ডালের ভেতর ডুবিয়ে কোনোভাবে নরম করে টুকরো টুকরো করে বাপিকে খাইয়ে দিলাম। মানুষ যখন দূর্বল হয়ে যায়, তখন সে তার মন-মানসিকতার পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এই আমার বাপি একটু যদি রুটি ঠান্ডা এবং মোটা-শক্ত হয়েছে, খাবার টেবিল থেকে উঠে যেতো। সময় আমাদের কি থেকে কি যে করে ফেলে! যাক এসব খাবার রোগীদের জন্যে, আর কি যে জঘণ্য, সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে যাবে। একদিন আমি টেষ্ট করেছিলাম। আজকাল দেশে তেলের ব্যবহার অনেক কম হয় রেষ্টুরেন্টে, আর অন্যদিকে হাসপাতালে তেল ভাসতে থাকে। আমার কাছে মনে হলো তখন, ডাক্তারদের তো বেঁচে থাকতে হবে। ওরা তো রোগীদের উপর নির্ভর করে। যতো অসুস্থ, ততো অর্থ। আর বাইরের খাবার খাওয়ানো যাবেনা বাপিকে, তাই বাধ্য হয়ে কি আর করা! এ জীবনে প্রচুর হাসপাতাল দেখা হয়ে গেছে, তাই হাসপাতাল সম্পর্কে বিশেষ ভাবে অভিজ্ঞ  :p  আমি।

বড়ো মামা-মামী...
বড়ো মামা-মামী…

বিকেলে সবাই এলো। মাসী-মেশো-মামা সকলেই এলো। বিপদে পড়লে মানুষ চেনা যায়। আমার বড়ো মামা আর মামী যা করেছে, তার ঋণ এ জীবনে শোধ হবার নয়। বাপির হিপ জয়েন্ট ভাঙ্গার পর থেকে সেই ছোট্ট ফাঁড়ি বাগান থেকে আমাদের গ্রামের বাড়ীতে আসতো। ছুটি না পাওয়ায় ঢাকাতেও নিয়ে যেতে পারেনি। বাপির অনেক আদরের আমার বড়ো মামা। মামার নাম খোকন। মামাকে ছোট ভাইয়ের মতো ভালোবাসে। এখনও দুজনের খুব ভালো আন্ডারস্ট্যান্ডিং। বাপি রাগ করলে চুপ করে শোনে, আমায় বলবে, “চুপ করে থাক। বুঝিস না সেঝদা তো এমনই। রাগ বেশীক্ষণ থাকেনা। একটু সহ্য কর।” মামাও তেমন সুস্থ না। কিন্তু মামীকে বললো ঢাকায় থাকতে বাপির কাছে। অবশ্য মামীও অতুলনীয়া। প্রতিটি মুহূর্তে আমায় অনেক শক্তি দিয়েছে। মাঝে-মধ্যে ভেঙ্গে পড়তাম, কাউকে যে বলবো সেও পাড়তাম না। মামী বুঝতো। “মামনি যাও বাসায় খেয়ে রেষ্ট নাও।” এই মামীর শরীরও ভালো না। মানুষগুলোর বয়স তো হচ্ছে, সেসব মনে থাকেনা। কারণ আজও ওদের সামনে গেলে হয়ে যাই একেবারে বাচ্চা। যেনো অবুঝ শিশু। মজা হলো বাপি সবচেয়ে খুশী হতো মামনি আর মামী রাত-দিন থাকলে। বাপি খাওয়া-ঘুম নিয়ে খুব জ্বালাতো। কিন্তু আমি থাকলে সেটা করার সুযোগ ছিলোনা। মামনি একদিন বললো চুপ করে, “তোর বাপি বলেছে তোর রেষ্ট দরকার। হাসপাতালে এসে ঘুমাতে পারিসনা তুই। অনেক কষ্ট করিস দেশের বাইরে। আসলে কি জানিস?” বললাম কি? মামনি-মামী থাকলে মেজাজ দেখাতে পারে। আর আমি থাকলে বাপি ঠিকমতো খায়, ঘুমায়। যা তার ইচ্ছে করেনা, কিন্তু আমার ভয়ে করে। বাচ্চা নয়তো কি আমার বাপি? যা তার সবচেয়ে দরকার, সেটাই করি। মজা পেলাম শুনে কথাটা। বাপিকে গিয়েই বললাম, ওহ তুমি চাওনা আমি থাকি? ঠিক আছে তাহলে আর থাকবোনা, যদি কিছুর দরকার পড়ে জানিও। অমনি মাথা দোলানো, হাত দিয়ে ডাকা। গেলাম সামনে, হাতটা উঠিয়ে চড় দেখালো। হাসলাম। বললাম ঠাকুমার লম্বা ডগা কবে তুমি বড়ো হবে?

পদ্মমাসী-ভাগ্যবতী
পদ্মমাসী-ভাগ্যবতী

আমাদের বড়ো মামী এমন একজন মানুষ, যে প্রতিটি মানুষের বিপদের দিনে থেকেছে পাশে। অনেক সমস্যা বলে কখনো পাশ কাটিয়ে যায়নি। আমার বড়ো মামার চরিত্রের কিছুটা পেয়েছি আমি। আর তাই হয়তো কিছুটা ভালো আমার মধ্যে আছে। তো মামা ঢাকা থেকে চলে গেলো, কারণ ছুটি নেই। মামী থেকে গেলো। মামনি বললো হাসপাতালে মামী আর সে-ই থাকবে। আমি আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকবো। বললাম কথা কম বলো। আমি যা বলছি সেটা শোনো। যাক তারপর রাত আমার দখলে। আমি-মামনি, নয়তো আমি-পদ্ম মাসী, মামনি-মামী, মামনি-পদ্ম মাসী। ঠিক এভাবেই চলছিলো। পদ্ম মাসীর কথা বলি। মহিলাকে মামা বাগান থেকে পাঠিয়েছে। পদ্ম মাসীর সাথে রাতে বেশ ভালো লাগতো। গল্প হতো অনেক। মাসীকে বললাম বিছানায় এসে শুতে। নাহ সেই ব্রিটিশ আমলের সংস্কার, নীচেই বিছানা করে ঘুমাতো। বলতো বাংলা সিরিয়াল ছাড়তে। আমার ওসব প্যানপ্যানানি বিরক্তিকর। মিউজিক চ্যানেল ছেড়ে রাখতাম আসতে করে। বাপি বলতো ইশারায় গান গাইতে। সকালে মামী আর পদ্ম মাসী এলো। কিন্তু আমার যেতে যেতে সেই দুপুরই হয়ে গেলো। আমি মামনিকে নিয়ে গেলাম। গিয়ে ফ্রেশ হয়ে কিসের ঘুম, শুয়ে শুয়ে গান শোনা। আর টিভি ছেড়ে রিমোট নিয়ে খেলা।  😀

বিকেলেই আবার হাসপাতাল গেলাম। বাপি জানতে চাইলো তীর্থর কথা। চোখে জল। তীর্থ সেদিন রানার বাসায় গেছে রাইয়ের কাছে। সেখানে গিয়ে আসতেই চায়না। আসলে তীর্থকে নিয়ে আসা হয়নি, বাপি দেখলেই জোরে জোরে কাঁদে, আর শ্বাসকষ্ট হয়। তাতে ক্ষতি। কিছুটা স্বাভাবিক হলে তবেই আনবো এটা আমি ভেবে রেখেছি। মামী একটু আহ্লাদী বকা, কেন এখন এলাম? তিন/চার ঘন্টাও রেষ্ট নিইনি। কি করে বোঝাই আমার হাসপাতাল ছাড়া আর কোথাও ভালো লাগে না। সেই রাতে বাপি ঘুম, পদ্ম মাসীকে বললাম তুমি টিভি দেখো, বলেই করিডোরে পায়চারী। কি শান্ত চারদিক! পাশের কেবিনের একজন এসে কথা বলতে চাইলো। আমি আসলে সবার সাথে কথা বলতে পারি, তবে নিজের থেকে নয়। তো মেয়েটির বেশী বয়স না, চাইতেই বললেন(কথাটি মনে আছে। আসলে মানুষ সেটা ভুলতে পারেনা, কে তাকে ভালো আর খারাপ বললো), “আপা আপনার অনেক সাহস। দেশের বাইরে থেকে এসে সব করতেসেন।” বললাম এখানে সাহস কি? আপনিও তো আছেন! আপনার উনি কি মা? বললেন, “জ্বি আমাদের মা।” গ্রাম থেকে আসা একটি মেয়ে, যার কোনো শিক্ষাগত ডিগ্রী নেই তার থেকে “আমাদের মা” কথাটি শুনে অনেক কিছু শিখলাম। আসলে উনি মেয়েটির শাশুড়ী। মানুষের স্বস্তি তার চোখে-মুখেই ভাসে, আমি মেয়েটিকে স্বস্তিহীন দেখিনি। রাতের পর রাত জেগেছি, সেই মেয়েটিকে দেখেছি বসে আছে শাশুড়ীর পাশে। শাশুড়ী  একটু জায়গা করে দিয়ে এমনও বলেছেন কেউ দেখবেনা, বিছানায় শুতে উনার সঙ্গে।

হাঁটছি, হঠাৎ দেখি একজন নার্স চেয়ারে শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। উনি আবার সাথে কাঁথাও নিয়ে এসেছেন। আসলেই দেশে কতো যে সুবিধা! এখানে নার্সিং ডেস্কে চেয়ার থাকে না। সারারাত পায়চারী করে। শোয়া তো দূর, বসার ভাগ্যও কম। আমি হোম হেলথে চাকরী করি। বসার জন্যে কেউ একটা টুলও রাখেনা। কেউ কেউ বলবে বসতে, কিন্তু বসা হয় কই? যখন ক্লিনিক্যাল করি, তখন লাঞ্চ ব্রেকের অপেক্ষায় থাকতাম। মনে হতো স্বর্গ-সুখ। হোম হেলথে একটাই সুবিধা, পাঁচ/দশ মিনিট দেরী হলেও সমস্যা হয়না যদি ক্লায়েন্টকে ম্যানেজ করা যায়। যাক এর মধ্যে দেখি ওয়ার্ড বয় দুজন বিছানা-পত্র নিয়ে আসছে। আর ভিজিটরদের বসার জন্য যে চেয়ারগুলো সেসব জড়ো করে বিশাল বিছানা। চেয়ে চেয়ে দেখলাম। বাহ কি দারুণ! নার্স-ওয়ার্ড বয়-খালা সবাই ঘুম বিছানা-পত্র নিয়ে। একটু এগিয়ে গেলাম দেখি তো ডাক্তারদের কি অবস্থা! বাহ কেউ নেই। দরজা লাগানো, লাইট নেভানো। হাসপাতাল নাকি হোটেল, পায়চারী করতে করতে ভাবতে লাগলাম। ভেতরে গিয়ে দেখি বাপির ঘুম শেষ। বললাম ঘুমাও। জানো সবাই ঘুম? সব বললাম, বাপি আর আমার হাসিতে পদ্ম মাসীর ঘুম ভেঙ্গে গেলো। কষ্ট আর থাকলোনা, দিনের পর দিন একটু একটু করে আনন্দ ছড়াতে লাগলো। হাসপাতালের কেবিনে ১৫ মার্চ তারিখে বিশাল সারপ্রাইজ তীর্থর জন্মদিন। একমাত্র নাতির জন্মদিনে ভাইয়া-দিদিমনির আনন্দ কেমন সে আসবে পরের পর্বে।

এ জীবনের মধ্যে আমি গড়েছি আরেক জীবন
চোখের আলোয়, মনের ঝড়ে সাজানো এই ভূবন।
মন্ত্রমুগ্ধ আমি তোমাতে ওগো প্রাণের শহর
ইট-কংক্রিট তবুও যেনো তুমি-ই আমার ঘর।
কতো যে রঙ ছড়িয়ে আছে ফুলে এবং পাতায়
ভেসে উঠি, ডুবি আমি ঋতুর হাসি-খেলায়।
বেলাশেষের প্রান্তে এসে এখন অঝোর বৃষ্টি
প্রকৃতির কতো যে রূপ, কতো নানান সৃষ্টি।

ক্রমশ

হ্যামিল্টন, কানাডা
১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ইং।

৪৯৫জন ৪৯৫জন
0 Shares

৩০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ