অস্পৃশ্য

জাকিয়া জেসমিন যূথী ২ ডিসেম্বর ২০১৯, সোমবার, ০৮:৪৩:৫০অপরাহ্ন গল্প ২৫ মন্তব্য

কিছুদিন হলো একজন আমাকে ডিস্টার্ব করছে। কোত্থেকে আমার আইডি পেয়েছে জানিনা। জিজ্ঞেস করলে বলেও না। মেয়ে আইডি বলে মনে হয়। আমি অনলাইন এসে ঢুকতেই সেই মেয়ের কাছ থেকে আমার উইন্ডোতে ছুটে আসে, হাই, হেলো, কি করছেন? মেয়েটার যেন আর কোন কাজকর্মই নেই! সারাদিনই বোধহয় অনলাইনে থাকে।

কোত্থেকে আমার আইডি পেলো তা বলবে না। নিজের ছবি দেখাতে বললে শেয়ার করবে না! ফোন নাম্বার দিতে বললাম কথা বলবো তাও দিবে না। কথা বলতে চায় না। আজব এক চিজের খপ্পরে পরেছি যা হোক! আমি চ্যাট করতে চাই না। তবুও যেন জোর করে কথা বলতে হয়!

কয়েকদিন পর…

মেয়েটার অত্যাচারে কয়েকদিন মেসেঞ্জারে লগইন করিনি। অবশ্য কথাটি পুরোপুরি সত্যি না। অফিসের প্রচণ্ড ব্যস্ততা ছিলো। প্রাইভেট কোম্পানীর চাকরিগুলো সারাদিনের সবটুকু সময় নিয়ে নেয়। কয়েকদিন তো প্রায় মাঝরাতে বাড়ি ফিরলাম। আর তখন কি ল্যাপটপ খুলে বসবো? খেয়ে দেয়ে সোজা বিছানায়।

 

ব্যস্ততা একটু কমলে বেশ কয়েকদিনে খেয়াল করলাম মেয়েটি নেই! নতুন কোন মানুষকে খুঁজে নিয়েছে বোধ হয়! যাক, বাঁচা গেলো!

এরপর একদিন, অনেকক্ষণ ধরে বসে আছি। হাতে সামান্য কাজ ছিলো অফিসের। সেটা করে নিয়েছি অনেকটা আগেই। এর মধ্যে রাতের খাওয়া হয়ে গেছে। মায়ের ঘরে গিয়েও একটু কথা বলে এলাম। আবার ফিরে এলাম নিজের ঘরে। অনলাইন কানেক্ট করলাম আবারো। আজ আমার এখানে আর কেউ নেই যার সাথে কথা বলা যায়। আজ শুক্রবার। অফিস ছুটি। সেই সাথে আর সব ব্যস্ততারাও ছুটি নিয়েছে। সপ্তাহের এই একটি দিনই আমার আরামের দিন। আরাম করে ঘুমাতে পারি। নিজের মত করে সময় কাটানো যায়।

কি করা যায়! কি করা যায়! কি যেন নাম মেয়েটার! রুনিয়া ফারুক। এইরকমই তো মনে হয় কিছু একটা। ফেসবুকে লগইন করি। অনেকদিন নিজের এই প্রোফাইল দেখা হয় না।

একাউন্টে ঢুকতেই নজরে এলো বাম পাশে একটি নতুন বন্ধুতার অনুরোধ এসেছে। জায়গাটিতে ক্লিক করতেই চমকে গেলাম। রুমিন ফারুক! একটা পুতুলের ছবি দেয়া প্রোফাইলে। এখানেও তাকে চিনতে পারার কোন সুযোগ সে রাখেনি। ফেইক আইডি নাকি? চিনি না। অচেনা মানুষটিকে কি নিজের প্রোফাইলে ঢুকতে দেয়া ঠিক হবে? না, কিছুতেই না। কী উদ্দেশ্য তার কে জানে! সুতরাং, মেয়েটিকে গ্রহণ করা হলো না। “দুঃখিত!” বিড়বিড় করে বলতে বলতে ল্যাপটপ অফ করলাম। জুম্মার নামাজের প্রস্তুতি নিতে চললাম।

 

কিছুদিন পর…

ফুরফুরে এক বিকেল। ভালোই লাগছে আবহাওয়াটা। তবে, আকাশটা গুমোট অন্ধকার। ঝড় আসতে পারে। তবু ইচ্ছে করলো একটু ভার্সিটির বান্ধবী রুহীর ওখান থেকে ঘুরে আসি।

রুহীর বাসা থেকে ঘুরে এসেছি অনেকক্ষণ। আজ ও ডিনার করিয়ে তবেই ফিরে আসতে দিয়েছে। খুব ভালো কাটলো অনেক দিন পরে মিষ্টি মেয়েটির সাথে সময়। কতদিন আগের কথা! আমরা একসাথে কয়েক বন্ধু প্রায়ই টিএসসিতে আড্ডা দিতাম। ভার্সিটি পড়ার সময়। রুহীর ছিলো অসাধারণ গানের গলা। আমাদের আড্ডা মাতিয়ে রাখার জন্য অসাধারণ কণ্ঠস্বর। কোন গান ওর কন্ঠে শুনতে খারাপ লাগতো? আর সবাই মিলে অনেক ধরনের দুষ্টুমি চলতো। হেন বিষয় নেই যা আমাদের আড্ডায় উঠে আসতো না। রুহীর গায়ে লাগতো না কিচ্ছু। নারী-পুরুষের সব ধরনের কথাই আমরা এই কয় বন্ধু মিলে খুব আলোচনা করতাম।

 

এত কাছের বন্ধু ছিলাম পরস্পরের। অথচ, রুহী আর শিফাত পালিয়ে বিয়ে করে ফেলার আগে আমরা কিছু জানতেই পারলাম না। মেয়েটিকে এত ভালো লাগতো আমার। কিন্তু তখনো পড়াশুনা শেষ করিনি। তেমন কিছু হয়েও উঠিনি যে কাউকে প্রস্তাব দেয়া যায়। রুহী আমাকে ভীষণ টানতো। কি যেন একটা বিশেষ আকর্ষণ ছিলো ওর মধ্যে! পাতলা শ্যামলা! কি দারুন ফিগার! আর কী শৈল্পিক গড়ন! ওরকম খুব কমই নজরে আসে।

ওর বিয়ের পর আড্ডাটা আর জমলো না। আমিও ব্যস্ত হয়ে পরলাম পড়াশুনা তারপরে ক্যারিয়ার নিয়ে। মাঝে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। আজ আমি প্রতিষ্ঠিত। অনেক দিন পরে রুহীর দেখা মিললো। কিন্তু আজ যেন নতুন করে ওর প্রেমে পড়ে এলাম। এখনো সেই আগের মতই আকর্ষণীয়!

একা একা লাগছে খুব! বন্ধুরা সবাই বিয়ে করে ফেললো। দু’তিনটে করে বাচ্চাকাচ্চার বাবা হয়ে গেলো সব। রুহী-শিফাতেরও তিন ছেলে। আর আমি? এখনো কাউকে নিজের করে পেতে পারিনি!

পেরিয়ে গেছে আরও ছয়টি মাস। ব্যস্ততা বেড়েছে আগের চেয়ে বহুগুণ। এর মধ্যে কতকিছু হয়ে গেলো। ছোট ভাইয়ের প্রেম ছিলো। আমার কাউকে পছন্দ নেই। পারিবারিকভাবে দেখাদেখির বিয়েতেও মত দিচ্ছি না। মায়ের অনিচ্ছা সত্বেও ভাই আমার প্রায় জোর করেই বিয়ে করে বউ নিয়ে এলো। অবশ্য আমিও আপত্তি করলাম না। ইদানিং এসব হচ্ছেই। ব্যাপার না।

এদিকে একা নিঃস্বংগ আমি। আমার আছেই এক অফিস আর বাসা। অফিসে থাকলে অফিসের কাজ। আর বাসায় থাকলে সব শেষে একটুখানি ইয়াহু মেসেঞ্জারে লগইন করা। কেউ থাকলে টুকটাক কথা বলা। যদিও তেমন কেউ সময় দেয় না।

অনলাইনেই ছিলাম। ঘুম আসছে না! হঠাত খেয়াল করলাম মেয়েটি অনলাইনে আছে! এখন রাত দুইটার বেশি বেজেছে। এত রাতেও জেগে আছে! আমিও তো জেগে আছি। কই, আমাকে তো হেলো, হাই বলছে না! বলছে না কেন? আমাকে কি দেখতে পায়নি?

নিজেই আগ বাড়িয়ে আজ কথা বললাম, হাই, কেমন আছেন?

প্রায় সাথে সাথেই জবাব এলো, হ্যাঁ, ভালো।

এতদিন দেখিনি কেন? মেসেজটা সেন্ড করতে গিয়ে দেখলাম যাচ্ছেনা। ইন্টারনেট লাইনটা কেমন বেরসিক! এখনই কেটে যেতে হবে? আবার তড়িঘড়ি করে লাইনটা সংযোগ দিলাম। মেয়েটাকে অনলাইনে দেখে আজ ভীষণ ভালো লাগলো। তার মেসেজের অপেক্ষা না করেই তরিঘরি জিজ্ঞেস করলাম, এখনো জেগে আছেন?

হুম! কাজ করছি।

কাজ করছে। হাউ সেলুকাস! এত রাতে কি কাজ তার? আরো কিছুক্ষণ বসে রইলাম। ভাবলাম মেয়েটি কিছু বলবে। নাহ, মেয়েটি তো মোটেই পাত্তা দিচ্ছে না! ধুর! যাই-গে। ঘুমাই।

সন্ধ্যের অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে,

এখনো আলো জ্বলে ওঠেনি বাড়িঘরগুলোয়;

আমি বসে আছি নতুন জাজিম আর তোষকে মোড়ানো

উঁচু বিছানায়;

থাইয়ের লম্বা শার্শির পরদা গেছে সরে,

পিঠে এসে ওরা পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে

এলোমেলো হাওয়ায়;

পেছনের গলিতে ঘর ফেরত মানুষের হল্লা

ক্রিকেট খেলুড়ে ছেলেপেলেদের কথা

আসছে ভেসে ওই,

আমি কবে পাবো দেখা আমার প্রিয়ার

অন্ধকারের কাছে আর্তি জানাই!

 

ইদানিং বড় বেশি একা লাগছে। যতটা সময় ব্যস্ত থাকি অফিস আর কাজ নিয়ে ততটা সময়ই ভালো থাকি। ছোটকা বিয়ে করে ফেলায় যেন আরো একা হয়ে গেলাম। নাকি অন্য কোন কারণ? বুঝি না!

সেই মেয়েটিকে বড় বেশি মনে পরছে! আমি কি খুব খারাপ ব্যবহার করেছি মেয়েটির সাথে? বিরক্ত ছিলাম অবশ্য একটা সময়। কিন্তু, বকা দেইনি। চড়া ব্যবহার করিনি। আমাকে নিয়ে তার এত আগ্রহ ছিলো তখন। এখন নেই কেন?

রাত একটার দিকে দেখা মিললো, কাংখিত মানুষটার! কাংখিত! আআহ! কি বললাম আমি! মেয়েটি এত রাতে এখানে! আবার যদি চলে যায় তাড়াতাড়ি মেসেজ দিলাম, হাই! আর ইউ হট টুডে?

মেয়েটির দিক থেকে কোন সাড়া নেই। ধ্যেত! মাথায় আগুন ধরে যাচ্ছে! খুব আফসোস হতে লাগলো। একজন মেয়ে সংগী পেয়েছিলাম তাও নিজের হাতে সম্ভাবনাটা নষ্ট করলাম! উফ! আফসোস! অন্তত মেয়েটির সাথে বন্ধুত্ব থাকলে তো এখন এই সময়ে কাজে লাগতো। কথা শেয়ার করা যেত! মন খারাপ ভাবটা কেটে যেতো।

দেখি তো কে কে অনলাইনে আছে। আবার চেক করে দেখি। আর কারো সাথে যদি একটু কথা বলা যেতো! এরকম সময়গুলো পার করা সত্যি কঠিন! আমি আমার মেসেঞ্জারের এড্রেস বুক দেখতে থাকি।

নাহিন- অফলাইন। মেজবাহ- অফলাইন। শুরভী- নাই। মিতু-নাই। জোসেফ আরিয়া, ইশরাত, ইয়াসীন, মোহন, সাথী…  …কেউ নেই। সব ব্যস্ত! এই পৃথিবীর সবাই ব্যস্ত আমি ছাড়া। সব ঘুমিয়ে গেছে! সবারই কাল সকালে অফিস আছে। কাজ আছে। সব কাজ পাগল লোক ঘুমোতে চলে গেছে। রাত এখন তিনটারও বেশি! উফ! ঘুম, তুই কোথায়?

 

কদিন পর আবার সাপ্তাহিক ছুটি। আজ শুক্রবার নয়, শনিবার। সকাল সকাল ঘুম হতে উঠেই বাজার করে এনেছি। তারপরে আমি শাওয়ারে ঢুকে গেলাম। প্রচন্ড গরম লাগছে। ঢাকা শহরটা জ্যামের জন্য পৃথিবী বিখ্যাত হয়ে যাবে মনে হচ্ছে।

এখন তো আর কোন কাজ নেই। বসি আবার একটু অনলাইনে। আরে বাহ, আজ দেখি রুমিন ফারুক ও আছে অনলাইনে!

আজ মেয়েটাকে ডাকতেই বেশ খলখলিয়ে কথা বলতে লাগলো।

তাকে জিজ্ঞেস করি, কোথায় পেয়েছেন আমার ঠিকানা বলুন তো?

সেটা কি বলতেই হবে?

ওহ, বলতে চান না?

নাহ, চাইনা।

কেন?

কি হবে বলে?

মানে?

কোন মানে নেই!

 

এর মধ্যে আমার চোখ পরলো ওর প্রোফাইল ছবিটার দিকে। আরেহ, আজ দেখি মেয়েটি ছবিও লাগিয়েছে। দারুন চোখ তো মেয়েটির! মৃদু মৃদু হাসছে যেন ছবিটা আমার দিকেই চেয়ে। ছবিটা ছোট্ট হলেও চোখ দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। সাথে সাথে মনের মধ্যে গান বেজে উঠলো,

মেয়ে তুমি তো আমার নও চেনা, পলক তবু কেন আর পরেনা…

এক মুহুর্তে খুশীর আতিশয্যে আমিই যেন গায়ক হাবিব হয়ে গেলাম। গান যেন সুরের মূর্ছনা ছড়িয়েছে আমার দেহ মনে। জিজ্ঞেস করলাম, ছবিটা কার?

রুমিন উত্তর দিলো, কোন ছবিটা?

মনে হয় বুঝতেই পারেনি! এহ, কত ঢঙ! জিজ্ঞেস করলাম, আপনার প্রোফাইলে যাকে দেখতে পাচ্ছি।

ওহ, ঐটা কে হতে পারে? আমার প্রোফাইলে যেহেতু আমারই ছবি! এবার সাথে একটা হাসিমুখের ইমোটিকনও উপহার দিলো মেয়েটি। খুব ঢংগী একটা মেয়ে যা হোক!

 

এরপরে কেটে গেছে অনেক দিন। এখন আমার সাথে ভালোই বন্ধুতার সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে। এখন ওর সম্পর্কে অনেক কিছু জানাও হয়েছে আমার। ও কি পড়ে। কি করে। বাসা কোথায়। ফ্যামিলিতে কারা আছে না আছে যাবতীয় সবকিছু। অবশ্য এখনো আমাদের দেখা হয়নি। এমনকি ভিডিও চ্যাট করবো করবো করে সেটাও করা হয়নি।  ওটাই বাকী আছে।

রুমিনের কথাতে তো মনে হয় আমাকে ওর খুবই পছন্দ। আমি প্রায়ই চাইছি ওকে আমার মনের কথাটা জানানোর। কিন্তু, একটু আয়োজন করে যদি বিষয়টা জানাই মন্দ হয় না। সামনাসামনি মুখোমুখি বসে হাতে হাত রেখে উপরে থাকবে নীল আকাশ, আর আমাদের চারপাশে পানির রাজত্ব! এরকম একটা কল্পনা আমার মনে বাসা বেঁধেছে। তবে এবার খুব বেশি দেরী করবো না। আর ভুল করতে চাই না। একবার দেরী করে রুহীকে হারিয়েছি। আর সে ভুল করা যাবে না। চল্লিশ পেরিয়ে গেছে। চুলে পাক ধরতে শুরু করেছে। এদিকে মনও বেশ উদাস হয়ে যায়। এক ছাদের নিচে একটা প্রিয় সংগ খুব প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। আসছে সপ্তাহে শুক্র বা শনিবার ওকে আশুলিয়ায় আসতে বলেছি। জায়গা ঠিক হয়ে গেছে কোথায় আমাদের দেখা হবে।

শুধু ও আগের রাতে কনফার্ম করবে শুক্র নাকি শনি। সেদিন ওকে আমি চমকে দেবো। আমি জানি ও অনেক খুশি হবে অনেক।

 

আর মাত্র দুটো দিন পরেই আমাদের দেখা হবে। উত্তেজনায় আমি ঘুমাতে পারছিনা ঠিকমত। কবে আসবে সেই সময়টা। সেই কাঙ্ক্ষিত অসাধারণ মুহুর্তটা। আমি প্রতিটি সময়ের হিসেব করে স্বপ্নপূরণের ভাবনায় নিমজ্জিত।

 

অবশেষে এলো সেই দিন। নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করলাম। আজকে বিশেষ মানুষের সাথে দেখা আমার। মাঝে তৃতীয় কাউকে না আনাই ভালো মনে করলাম। তাছাড়া একটা অজানা উত্তেজনা কাজ করছে। কী দেখবো? কেমন দেখবো তাকে? আচ্ছা ওরও কি এমনই অনুভূতি হচ্ছে? ও কি আগেই এসে গেছে? এসে পৌছে যাবার কথা।

সে বলেছে সে আগে আসবে। তাছাড়া ওর বাসা বেলাই বিল থেকে কাছেই। গাজীপুরের চেলাই নদীর সাথেই বেলাই বিল বেশ মনোরম একটা জায়গা। ইঞ্জিনচালিত আর ডিঙ্গি নৌকা দুটোরই ব্যবস্থা থাকলেও আমাদের ইচ্ছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা সারাদিনের জন্য ভাড়া করে নিয়ে আমরা হারিয়ে যাবো নিজেদের স্বপ্নরাজ্যে।

আমাকে নাকি ও অপেক্ষার কষ্ট দিতে চায় না। এত ভালোবাসা নিয়ে অপেক্ষায় থাকবে মানুষটা। আমাকেও তো সঠিক সময়েই পৌছুনো প্রয়োজন। কথাটা মনে আসতেই গাড়ির স্পিড ক্রস করে ফেললাম কিছুটা।

 

প্রায় পৌঁছে গেছি এমন মুহুর্তে দেখি তীব্র জ্যাম। মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। দশ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে আছি একটা জায়গাতেই। রাস্তাটা সামান্য খারাপ। সেটাই আসলে জ্যামের মূল কারণ। যাহোক জ্যাম ছাড়তেই আমি এগোলাম। মুহুর্তেই ধুলোর ঘুর্ণি সৃষ্টি করে উপরে উঠে গেলো দোলনার মতোন কিছু একটা। তারপরেই আবার নেমে এলো নিচে। মুহুর্তেই লোকজনের ভিড় জমে গেলো। কী হলো ব্যাপারটা? সব আমারই গাড়ি ঘেরাও করছে নাকি?

মিনিট কয়েক পরেই সব পরিস্কার দেখা গেলো। সামনে আর এগোন যাচ্ছে না। লোকজন সব ছুটে আসছে। ব্যাপার কী? একে জ্যাম তার উপরে এই উটকো ঝামেলা। কী হলো আবার?

বেশ বিরক্তি নিয়েই আমি সামনের জটলা পরিস্কার হওয়ার অপেক্ষা করছি। রুমিনের পৌঁছে তো ফোন করার কথা। ফোনটা চেক করে দেখি কোন কল আসেনি। আমি গাড়ির গ্লাস সামান্য নামাতেই লোকজনের মুখ থেকে বিচ্চিন্নভাবে কথা ভেসে আসতে শুরু হয়েছে, “আল্লাহ গো, দুইজনেই যেমনে পড়ছে, মইরা ছাফ!”

“মৃত্যুটা এমনেই আইয়া পরলো!”

 

এখানেই ওর অপেক্ষা করার কথা ছিলো। বের হয়ে দেখা প্রয়োজন। জায়গাটা আমার অত ভালো চেনা নেই। গাড়ি থেকে বের হয়ে এলাম। যে লোকগুলো কথা বলছিলো, তাদের দিকেই ফিরে জিজ্ঞেস করি, “কী হয়েছে এখানে?”

“আরে ভাই আর কইয়েন না। রিকশা ওয়ালা নিচ্চয় কানা আছিলো। নাইলে এই সোজাসাপটা রাস্তায় কেউ যাত্রী লইয়া উস্টা খায়? আর খাইছোস তো খাইছোস ঠ্যালা দিয়া এক্করে আকাশে উডায় লাইলি। তারপরে আর কি? নাইম্মা ফটাশ! মানে মইরা গেছে দুইজনেই!”

 

লোকটার লেকচার মোটেই কানে যাচ্ছে না আমার। এদিক সেদিক তাকিয়ে ওকে খুঁজে না পেয়ে জটলার ভেতরেই মন ফিরলো।

এগিয়ে গিয়ে “ওহ গড! একি দেখছি এ কি রুমিন? আমার রুমিন !!” বলে দু পা পিছিয়ে এলাম। রক্তের স্রোতে শুয়ে আছে নীল আকাশ জড়িয়ে এক নারী। নীল সাদা শাড়িতে সাদার ওপরে নীল বুটিদার ব্লাউজ পরার কথা ছিলো ওর। আর ওই ব্যাগটা। যেটা ওর জন্মদিনে এপেক্স থেকে কিনে আমি পাঠিয়েছিলাম! কনুইয়ের সাথে জড়িয়ে রাস্তার ধুলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে ব্যাগটা। আবার এগিয়ে গেলাম। মুখ দেখা যাচ্ছে না। সম্মোহিতের মত হাঁটু মুড়ে বসে গেছি আমি। আমি হাত বাড়ালাম। চুলে ঢেকে থাকা ওপাশে মাথা ঘুরানো মুখটা দেখতে চাই। আমার হাত কাঁপছে! চাইছি সব মিথ্যে হোক। এ যেন কিছুতেই আমার রুমিন না হয়! কাঁপা হাতেই পালস চেক করলাম। ওহ নো! মারা গেছে অনেকক্ষণ আগেই। চেহারাটা পাশ ফেরালাম। একি? কিভাবে সম্ভব? চুলে পাক ধরা বয়েসের ভাঁজ পরা চেহারায় চোখ পরতেই ভুত দেখার মত চমকে বোবা হয়ে গেলাম। ভীষণ বড় একটা ধাক্কা লাগলো।

এ আমি কাকে দেখছি? এটা কি রুমিন ফারুকের মা? নাকি বড় বোন? কম করে হলেও এই ভদ্রমহিলার বয়েস ষাট পেরিয়েছে। ব্যাপারটা কী হলো তাহলে? সারপ্রাইজ দিতে এসে দিতে এসে সারপ্রাইজড হয়ে গেলাম নিজেই। রুমিন ফারুক এ কেমন প্রহসন রেখে গেলো! অধরা এ নারী কোন প্রশ্নের জবাব না রেখেই যে চলে গেলেন!

 (সমাপ্ত)

২৫৪জন ৮৮জন
7 Shares

২৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য