আজ ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। আব্বা মারা যাবার পর থেকেই প্রতিবছর এ দিনে আমি আমাদের থানার উপজেলা মাঠে যাই। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্মাননা দেয়া হয়। হোকনা একদিনের সম্মান তাতে কি? তবুওতো দেয়। এই একদিনের জন্যেতো সবাই মনে রাখে মুক্তিযোদ্ধাদের!!

আব্বু জীবিত নেই বলে আমিই যাই। অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে দেখা সাক্ষাত হয়, কুশল বিনিময় হয়। সম্মুখযুদ্ধের জীবিত নায়কদের দেখে শিহরণ জাগে প্রানে। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। বিশাল মাঠের মাঝখানে তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক কাতারে যখন দাঁড়িয়ে থাকি, তখন দর্শক গ্যালারী থেকে শত শত মানুষ- ভিআইপি কর্মকর্তাগনসহ সবাই আমাদের সম্মান জানিয়ে স্যালুট দেন। সে সময়ের সেই অনুভুতিটুকুই আমাকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। আমি গর্বিত একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলে।

আজ একজন মুক্তিযোদ্ধাকে যিনি পেশায় কৃষক, তাকে আমি একটা প্রশ্ন করেছিলাম- আপনি কি মূল্যায়িত হয়েছেন, কিংবা একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে কি কেউ কখনও মূল্যায়ন করেছে।
উত্তরে উনি সরাসরি বললেন- কখনও কোথাও সম্মানিত হয়েছি আবার কোথাও অপমানিত হয়েছি। কেউ মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে মুল্যায়ন করেছে আবার কেউ কৃষক বলে পেটে লাথি মেরেছে। একটা সময় ছিলো যখন আমাদের মূল্যায়ন দূরে থাক, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে পরিচয়ও দিতে পারতাম না।

এখনকার তরুন যুবকেরা যারা মুক্তিযুদ্ধের মানে জানে বোঝে, তারাই মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক মুল্যায়ন করে। আর বেশীরভাগ মানুষই আবেগে গা ভাসায়, কোন একটা ঘটনা বা দুর্ঘটনা হলেই বলে – এসব ঘটনা পাক বাহিনীর অত্যাচারকেও হার মানিয়েছে। আসলে তাদের কোন ধারনাই নাই মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের মানুষকে কতটা নির্মম অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কোন কিছুর সাথেই এর তুলনা হয়না, করা উচিত না।

বাহ্ আপনিতো সুন্দর করে কথা বলেন। উত্তরে তিনি বলেন- বাবারে, আমি আমি ১৯৬৮ সালে বি এ পাশ করা মানুষ। নিজের স্বাধীন করা মাটিকে শস্য শ্যামলা করবো বলে চাকরী করিনাই। আজ আমি কৃষক। এখন শরীরে বল পাইনা কিন্তু এ দেশের মাটির ঘ্রানকে যে ভুলতে পারিনা!

কিছুটা দুঃখের সাথে আমাকে বললেন, আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিলাম বলেই আজ তুমি এখানে আসতে পেরেছ। তারপর উনি কিছু উদাহরন দিয়ে বোঝালেন দেশ স্বাধীন হওয়ায় কি লাভ হয়েছে। কিন্তু দেশের বর্তমান অবস্হায় উনি খুব অখুশি, খুব অসন্তুষ্ট। উনি খুব আপসোসের সাথে বলেন এসবের জন্যে উনারা যুদ্ধ করেননি। উনারা যুদ্ধ করেছিলেন একটা সুখী সুন্দর শান্তিময় দেশ গড়ার স্বপ্নে, যে স্বপ্ন আজও সত্যি হয়নি।

তিনি সব শেষে বললেন- খুব খারাপ লাগে যখন দেখি রাজাকারের গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা লাগানো, যখন দেখি রাজাকাররা বাংলাদেশের মন্ত্রী। যখন দেখি মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এদেশের তরুন সমাজের প্রতিনিধিরা রাজপথে স্লোগান দেয়। আর এখন দেখছি রাজাকারের সন্তানেরা,তাদের সমর্থনকারী সাহায্যকারী দোসররা এদেশের সংসদে বসে দেশ শাসন করার জন্য নমিনেশন পেয়ে নির্বাচনের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়।

তার রক্ত টগবগ করে ওঠে। চিৎকার দিয়ে বলে – “হে পাকিস্তানি দোসররা মনে রাখিস দেশ স্বাধীন করে আমরা অস্ত্র জমা দিয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু ট্রেনিং জমা দেইনি। প্রয়োজনে আবার অস্ত্র হাতে নেব তবুও তোদের মত দেশদ্রোহী দু’মুখো সাপের কাছে নিজের দেশ নিজের সন্তানদের ভবিষ্যত তুলে দেবনা।”

২৫৬জন ২৫৩জন
0 Shares

৩২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য