অসীম এক শুন্যতা

রিমি রুম্মান ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৫, বুধবার, ০৭:৫৪:২০অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ৩১ মন্তব্য

এক দুপুরে বাবার বাসায় দক্ষিণের জানালায় দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে এখান থেকে বাইরের কোলাহল, রিক্সা কিংবা গাড়ির হর্ন, হৈচৈ শুনতে চমৎকার লাগে। হঠাৎ দেখি রিক্সায় মামা-মামী ! গ্রাম থেকে ঢাকায় যাবার পথে আমাদের বাসায় বেড়াতে আসা। কোলে ছোট্ট এক শিশু। নিঃসন্তান মামা-মামী’র কোলে ৫/৬ মাসের শিশুটিকে দেখে চম্‌কে উঠি। সিঁড়ি ভেঙে ঝড়ের বেগে নিচে গেইটে গিয়ে দাঁড়াই। ততোক্ষণে রিক্সাটিও এসে থামে। শিশুটি বড় বড় মায়াবী চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমাদের দেখে। কপালের একপাশে বিশালাকৃতির এক কাজল কালো ফোটা। এতো মায়া ! আমরা আনন্দে আত্নহারা। আনন্দের বন্যা বইলো আমার অন্য কাজিনদের মাঝেও। নাম রাখা হলো ” লিরা “। লিরা’কে নিয়ে আমাদের আহ্ললাদের শেষ নেই। কমতি নেই আদর ভালোবাসার। পরদিন ওরা ঢাকায় ফিরে গেলো।
পড়াশুনার সুবাদে আমারও একদিন ঢাকায় আসা। হোস্টেলে সিট পেতে দেরি হচ্ছিল। মামার বাসা থেকে এসে যেয়ে ক্লাস করি। যতক্ষণ বাসায় থাকি, ছোট্ট লিরা’কে গল্প বলি। ছাদে এটা সেটা দেখিয়ে ভাত খাওয়াই। গান শুনিয়ে ঘুম পাড়াই। ওর জন্যে আমাদের সবার অদ্ভুত এক টান। অস্বাভাবিক মমতা।
একদিন ঘটা করে লিরা’র জন্মদিন পালনের সিদ্ধান্ত হল। বাড়ি সাজানো হল। আত্মীয়দের নিমন্ত্রণ করা হল। কেউ কেউ আড়ালে তির্যক মন্তব্য করছিলো, পালিত কন্যা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি হচ্ছে বলে। কিন্তু সন্তানহীন দম্পতির ভেতরের ক্ষত, রাত গভীরে বুকচিরে বেরিয়ে আসা একাকি কান্না শুনবার কিংবা অনুভব করার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা সম্ভবত কাউকে দেননি। গহীনের কষ্ট’রা গহীনেই চাপা পরে থাকে রাতের আঁধারে।

 

লিরা আধো আধো উচ্চারণে কথা বলতে শিখে। হাঁটিহাঁটি পা পা করে এঘর ওঘর হেঁটে বেড়ায়। এক দুপুরে সকলের অগোচরে খেলতে গিয়ে রান্নাঘরে গরম ডালের উপর পিছলে পরে। নির্ঘুম রাত কাটে সকলের। ক্ষত যতটা না শারীরিক, তার চেয়ে বেশি মানসিক। ভয়ে আতংকে আচমকা ঘুমের ঘোরে কেঁদে উঠে লিরা। আমরা তীব্র মনখারাপের মাঝে দিন কাটাই। একটা সময় লিরা সুস্থ হয়ে উঠে ঠিকই, কিন্তু মানসিক ক্ষতিটা সামলে উঠতে পারে না। স্কুলে ভর্তি হয়। কয়েক ক্লাস অবধি গিয়ে আর এগোতে পারে না। পড়া মনে রাখতে পারে না। স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়।
অন্যের শিশুকে এমন নিঃস্বার্থ আদর ভালোবাসার জন্যে সৃষ্টিকর্তার পুরষ্কার স্বরূপ কিনা জানিনা, ক’বছর বাদে সবাইকে অবাক করে দিয়ে মামা-মামী’র আলোকিত ঘর আরো আলো করে দু’টি ছেলে জন্মায়। কিন্তু কোন এক দুর্বোধ্য কারনে লিরার প্রতি আমাদের সবার ভালোবাসা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়।
একদিন মামা অসুস্থ হয়। বেঁচে থাকবার শেষ সম্ভাবনাটুকুও শেষ হয়ে যায়। ক্ষণে ক্ষণে জ্ঞান হারায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে যায় জ্ঞানহীন। হঠাৎ হঠাৎ জ্ঞান ফিরে এলে কেবলই লিরাকে দেখতে চায়। আমি ফোন করলে ডুকরে কেঁদে উঠে। বলে, লিরা’র জন্যে বেঁচে থাকবার তীব্র আকাংখা তাঁর। হাজার মাইল দূরের এই শহরে ফোনের অন্য প্রান্তের আমি স্তব্দ হয়ে বসে থাকি। নয়ন জলে ভাসি। নৈশব্দ ঘিরে থাকে ঘরের আনাচ কানাচ। রাতের অন্ধকারের হাত ধরে ভোরের আলোর দিকে হেঁটে যাই একা, একেলা…

যমে-ডাক্তারে লড়াই শেষে প্রিয় মামা সব মায়া ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। বড় অসময়ে। বড় বেশি অবেলায় !

সময় গাড়ায়। আমরা নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠি। লিরা শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে এখন তরুণী। পৃথিবীতে কেউ কারো শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে না। লিরা’র সামনে তাঁর আব্বু’র জায়গাটায় অসীম এক শুন্যতা। দেশে গেলে প্রতিবার ওকে দেখতে যাই। বুকে টানি। জড়িয়ে ধরি। বলি, আমাকে চিন্‌ছো ? লিরা লাজুক হেসে বলে, ” তুমি রিমি আপু ” ভেতরটা কেঁপে উঠে। প্রাণপ্রিয় মামা’কে মনে পরে। হাসির আড়ালে কষ্ট লুকাই। লিরা এটা সেটা খাবার এগিয়ে দেয়। খাই। খেতে খেতে চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠে সেইসব দিন ___ যেখানে ছোট্ট লিরা’কে আমি ছাদে হেঁটে হেঁটে ভাত খাওয়াই আর গল্প বলি_____ “এক ছিল রাজকন্যা। সবাই তাকে অনেক ভালোবাসে। অ-নে-ক…”

৩৯৯জন ৩৯৯জন
0 Shares

৩১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ