গত কয়েক বছর ধরেই একজনের দেওয়া একটা ভিজিটিং কার্ড সময় সময় খুঁজি। কিন্তু ভিজিটিং কার্ডটি আর খুঁজে পাচ্ছি না। সেই ভিজিটিং কার্ডটির সাথে রয়েছে চলতিপথে জীবনের একটি ঘটনা। যেই ঘটনার কথা মনে পড়লে আমি আজও সেই ভিজিটিং কার্ডটি খুঁজে মরি। কিন্তু ভিজিটিং কার্ডটি হয়তো মহান সৃষ্টিকর্তার ইশারায় চিরতরে হারিয়ে গেছে। তা আর কোনদিনই হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু সেই দিনের সেই ঘটনা আজও আমাকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তোলে। ঘটনাটি ছিল, এক অসহায় মহিলাকে ১০০ টাকা দান করে নিজে ঢাকা থেকে শূন্য পকেটে পায়ে হেঁটে নারায়ণগঞ্জ আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘটনা। কিন্তু মহিলার হাতে মাত্র ১০০ টাকা দিয়ে আমার আর পায়ে হেঁটে নারায়ণগঞ্জ আসতে হয়নি। আমি একজন স্বর্গদূতের সহায়তায় খুবই আরাম আয়েশে নারায়ণগঞ্জ পৌঁছেছিলাম। আজ সেইদিনের সেই ঘটনা সবার মাঝে শেয়ার করে স্মৃতি করে রাখতে চাই। আশা করি সবাই সাথে থাকবেন।

আমার ছোট ছেলে যখন এসএসসি পরীক্ষায় পাস করল, তখন পাস করার আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ভীষণভাবে বায়না ধরলো বোনের বাড়ি বেড়াতে যাবে। যাবে তো যাবেই, তা আর ওঁর মুখ থেকে ফিরিয়ে নিচ্ছে না। আমি তখন অসহায়ত্বের মতো দিন যাপন করছিলাম। চাকরি নেই। ঘরে তিনবেলা খাবারের মধ্যে কোনও কোনও দিন দুইবেলা খাবার জুটে। সময়টা তখন ২০০৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে হবে। মেয়ে বিয়ে দিয়েছিলাম ২০০৭ সালের মে মাসে। মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পর থেকেই আমি বেকারত্বের মতো জীবনযাপন করছিলাম। তবে কোনরকম সংসার চালানোর মতো বিভিন্নধরনের দিনমজুরের কাজ করতাম। কখনো রাজ যোগালির কাজ। কখনো জ্বাল মুড়ি বিক্রি। কখনো লেইচ-ফিতাওয়ালা সাজতাম। কখনো বা রিকশাও চালাতাম। এসব করে দিন বাদে এক সন্ধ্যা খেয়ে-না-খেয়ে সে-সময়ের দিনগুলো অতিবাহিত করছিলাম। ঠিক তখনই ছেলেটা মেয়ের বাড়িতে যাবে বলে বায়না ধরে বসলো। ভেবেচিন্তে দেখলাম কী করা যায়!

ভেবেচিন্তে ছেলেটাকে আশ্বস্ত করলাম, ‘তুমি দুইদিন পরে তোমার বোনের বাড়িতে যাবে।’ আমার কথা শুনে ছেলে খুশি হলো ঠিকই, দুঃশ্চিন্তায় পড়লো আমার সহধর্মিণী। আমার সহধর্মিণী দুঃশ্চিন্তা গ্রস্ত হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘ছেলেকে মেয়ের বাড়ি পাঠাতে হলো অন্তত ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার দরকার। অভাবের সংসারে এতগুলো টাকা তুমি এখন কোথায় পাবে?’ বললাম, একটা ব্যবস্থা তো করতেই হবে।’ এই বলেই চলে গেলাম আমি যেই মালিকের রিকশা চালাই, সেই মালিকের কাছে। রিকশা মালিকের কাছে গিয়ে সব বৃত্তান্ত খুলে বলার পর রিকশা মালিক আমাকে ৫০০ টাকা হাওলাত দিলেন। শর্ত থাকলো, যে পর্যন্ত এই ৫০০ টাকা শোধ না করতে পারি, সেই পর্যন্ত একদিনের জন্যও রিকশা চালানো বন্ধ করতে পারবো না। যদিও একদিন বিরতি দিতে মন চায়, তো আগেরদিন রিকশা মালিককে অবহিত করতে হবে। নাহয় সেদিনের এক বেলার রিকশা ভাড়া আমাকে গচ্চা দিতে হবে। শর্ত মেনে ৫০০টাকা নিয়ে বাসায় গেলাম। ছেলের মায়ের হাতে ৫০০ টাকা বুঝিয়ে দিয়ে সব বৃত্তান্ত খুলে বললাম।

দুইদিন পর ছেলেকে মেয়ের বাড়ি পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়ে ছেলে-সহ ঢাকা সায়দাবাদ বাসটার্মিনাল গেলাম। ছেলেকে নিয়ে আসার সময় ছেলের মা মনে হয় গোপনে ছেলের হাতে সামান্য কিছু টাকা দিয়েছিল। যেহেতু মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পর এই প্রথম মেয়ের ভাই মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে যাওয়া, তাই। তো ছেলের মা ছেলের হাতে কী দিয়েছে-না-দিয়েছে সেটা আমি দেখিনি ঠিক, কিন্তু অনুভব করতে পেরেছি হয়তো কিছু দিয়েছে। যাইহোক, আমি ছেলেকে নিয়ে বাসা থেকে রওনা দেওয়ার সময় রিকশা মালিকের কাছ থেকে হাওলাত করা ৫০০ টাক-সহ নিজের আগের দিনের রোজগার করা ৮০ টাকা থেকে ৩০ টাকার মতো সংসারে খরচ করে বাদবাকি ৫০ টাকাও সাথে করে সায়দাবাদ বাসটার্মিনাল পৌঁছালাম।

সায়দাবাদ বাসটার্মিনাল গিয়ে ছেলেকে গোপালগঞ্জের বাসে উঠিয়ে সিটে বসিয়ে দিলাম। তখন ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জের বাস ভাড়া ছিল জনপ্রতি ১৬০ টাকার মতন। বাস কন্ট্রাক্টরের কাছে বাস ভাড়া বুঝিয়ে দিয়ে ছেলের আরও ২৫০ টাকা দিয়ে দিলাম। ছেলেকে সব দিকনির্দেশনা বুঝিয়ে দিয়ে বললাম, ‘তুমি এখন ঠিকমত গিয়ে পৌঁছাতে পারবে তো?’ ছেলে বলল, ‘অবশ্যই পারবো বাবা। তুমি আমার জন্য কোনও চিন্তা করবে না। মা-ও যেন কোনও চিন্তা না করে।’ ছেলের কথা শুনে আমি নিশ্চিন্ত হলাম। সায়দাবাদ বাসটার্মিনাল থেকে বাস চেড়ে যাবার পর আমি নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হলাম। সায়দাবাদ বাসটার্মিনালের ভেতর থেকে পায়ে হেঁটে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রোডের দিকে এগোচ্ছিলাম। আসার সময় রাস্তার পাশে থাকা ভাসমান একটা চা দোকান দেখে সেখান থেকে এক কাপ চা পান করে দুইটা স্টার সিগারেট নিলাম। চা দোকানদারকে চা সিগারেটের দাম দিয়ে দেখি এখনো আমার কাছে একশো চার টাকার মতো অবশিষ্ট আছে। ভাবলাম, ছেলেটাকে তো আরও ৫০টাকা দিয়ে দিতে পারতাম! কিন্তু দেইনি।

এই ভেবেই নিজে নিজে কিছুক্ষণ আফসোস করে আবার নিজের গন্তব্যের উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করলাম। একটু সামনে এগুতেই আমার মেয়ে বয়সী একজন মা সাথে দুটো ছোট শিশু নিয়ে আমার সামনে হাত পেতে দাড়ালো। আমি থমকে দাড়ালাম! জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ব্যাপার? কী চান?’ কান্নাভেজা চোখে বলল, ‘ভাই আমি রংপুর থেকে ওঁদের বাবার খোঁজে ঢাকা এসেছিলাম আজ দুইদিন হলো। ঠিকানা ঠিকমতো বলতে পারছি না। একবার শুনেছিলাম মিরপুর থাকে। সেখানে গিয়ে গতকাল সারাদিন ঘোরাঘুরি করেও স্বামীর সন্ধান পাইনি। রাতে এক রাস্তার পাশে কোনরকমভাবে থেকে রাত কাটিয়েছি। ভোর না হতেই ছেলে দুটোকে সাথে হাঁটতে হাঁটতে এই পর্যন্ত। এখন রংপুর যাবার ভাড়াও আমার কাছে নেই। মানুষের কাছে হাত পাতলে কেউ এক টাকা, কেউ দুই টাকা দেয়। ওঁদের মুখেও কিছু তুলে দিতে পারিনি। যদি পারেন আমাকে রংপুর যাবার একটা ব্যবস্থা করে দিন।’

মেয়ে বয়সী মহিলার কথা শুনে আমি যেন মেয়েটির মতনই মুহূর্তে অসহায় হয়ে পরলাম! ভীষণ মায়া লেগে গেলো। অথচ তখন আমিও কিন্তু তাঁর মতনই একজন। তবুও কেমন যেন মায়ার জালে জড়িয়ে পরলাম! আমি আমার নিজের মেয়েকে চোখের সামনে দেখতে লাগলাম। তখন আমার কাছে এমন লাগছিল, যেন আমার মেয়েই আমার কাছে ওঁর কষ্টের কথাগুলো বলছিলো! তখন আমি নিজের পকেট থেকে ১০০ টাকা বের করে মহিলার হাতে দিয়ে বললাম, ‘দেখুন, আমিও তো আপনার মতো একজন কাঙাল। এই ১০০ টাকা ছাড়া এই মুহূর্তে আপনাকে সাহায্য করার মতো আমার কাছে আর তেমন কিছুই নেই। আর এখান থেকে রংপুরের কোনও বাস ছাড়েও না। রংপুর যেতে হলে আপনাকে যেতে হবে কমলাপুর রেলস্টেশন, নাহয় গাবতলি বাসটার্মিনাল। আপনি এই ১০০ টাকা থেকে খরচ করে সোজা কমলাপুর, নাহয় গাবতলি বাসটার্মিনাল চলে যান। সেখানে গিয়ে কোনও হৃদয়বান মানুষের হাতে-পায়ে ধরে নিজের গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হোন। এই বলেই মহিলার সাথে থাকা ছোট দুটো শিশুর মাথায় হাত বুলিয়ে আমি আমার পথে হাঁটতে লাগলাম।

তখন আমার সাথে অবশিষ্ট আছে মাত্র পাঁচ টাকা। সেসময় সায়দাবাদ থেকে নারায়ণগঞ্জের বাস ভাড়া ১০ টাকা। ভাবছি পায়ে হেঁটেই নারায়ণগঞ্জ চলে যাবো। এই ভেবেই হাঁটতে শুরু করলাম। চিন্তায় পড়লাম, সাথে সিগারেট নেই! হেঁটে যাওয়া যাবে ঠিক, কিন্তু সিগারেট ছাড়া তো মহা মুশকিল! ২.৫০ টাকা দিয়ে এক প্যাকেট আকিজ বিড়ি কিনে নিলাম। সায়দাবাদ থেকে হাঁটতে হাঁটতে যাত্রাবাড়ি আসলাম। হঠাৎ একজন লোক আমার বামপাশ দিয়ে হাঁটছে, আর বলছে, ‘কেমন আছেন দাদা? কোথা থেকে আসলেন?’ লোকটির দিকে ফিরে তাকালাম! শত চেষ্টা করেও ঠিকমতো চিনতে পারছিলাম না। লোকটি অচেনাই রয়ে গেল! লেকটি বললো, ‘আরে দাদা আমি তো আপনার শিষ্য রহিম। মনে পড়লো একসময় রহিম নামে আমার এক সাগরেদ ছিল। তবুও আমি তেমন একটা নিশ্চিত হতে পারলাম না। তারপরও বললাম, ‘আপনি কোথায় যাচ্ছেন।’ উত্তেজিত হয়ে বললো, ‘দাদা, আপনি আমাকে আপনা-আপনি করে বলছেন কেন? আমি তো আপনার শিষ্য। আপনার কাছ থেকে টেক্সটাইল মিলে কাজ শিখেছি। এখন সেই কাজ না করলেও কিন্তু আপনি আমার কাছে সারাজীবনের জন্য ওস্তাদই হয়ে থাকবেন। আর আপনি আমাকে বলছেন আপনা-আপনি করে?’ থতমত খেয়ে বললাম, ‘আচ্ছা ঠিক আছে! তো তুমি এখন এই মুহূর্তে এখানে কেন? যাবে কোথায়? আর বর্তমানে কী কাজ করছো?’ বললো, ‘দাদা, আমি বর্তমানে গার্মেন্টসের জুটের ব্যবসা করি। ভালো আছি! তো আপনি কী করেন?’ পুরানো সাগরেদের কাছে বর্তমান সব কিছু না বলে বললাম ভালো আছি, বেশ আছি!

তখন সাগরেদ লোকটি চা পান করানোর জন্য খুবই টানাটানি করছিল। আমি না না বলার পরও আমাকে জোর করে টেনে নিয়ে গেল এক হোটেলে। তখন দুপুরের খাবারের সময়। সাগরেদ হোটেলে গিয়ে চা’র পরিবর্তে ভাত খাওয়ানো পরিকল্পনা নিচ্ছিল। আমি সাগরেদ লোকটার ভাব দেখে হাত জোর করে বললাম, ‘চা ছাড়া আমার পক্ষে আর কিছুই গ্রহণ করা সম্ভব হবে না। শুধু এক কাপ চা হলেই হবে।’ সাগরেদ লোকটি মনে হলো খুবই কষ্ট পেলো। মুখ কালো করে আবার হোটেল থেকে বের হয়ে ছোট একটা চা’র দোকানে আমাকে নিয়ে গেল। আমি গেলাম। চা পান করলাম। জিজ্ঞেস করলো, ‘দাদা কী সিগারেট?’ আমার সাথে কিন্তু আকিজ বিড়ি ছিল। তারপরও বললাম, ‘আমার স্টার সিগারেট হলেই হয়। না হলেও সমস্যা নেই, আমার সাথে সিগারেট আছে।’ আমার কথা শুনে দোকান থেকে এক প্যাকেট স্টার সিগারেট চেয়ে নিয়ে আমার হাতে ধরিয়ে দিল। আমি সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে বাদবাকি সিগারেট-সহ প্যাকেটটা দোকানদারের কাছে দিতে গেলেই বিপত্তি। বললো, ‘দাদা পুরো প্যাকেটটাই আপনার জন্য।’ না না-এর মাঝেও জোর করে আমার জামার পকেটে সিগারেটের প্যাকেটটাবভরে দিল।

তারপর বললো, ‘দাদা, আপনি এখন কোথায় যাবেন?’ বললাম, ‘আমিতো নারায়ণগঞ্জে থাকি। যাবো তো নারায়ণগঞ্জেই।’ সাগরেদ লোকটি বললো, ‘আমি দাদা বর্তমানে নরসিংদী থাকি। এখন যাচ্ছিও নরসিংদী। তো আমি ডাইরেক্ট নরসিংদীর বাসে না গিয়ে একই বাসে করে আপনার সাথে চিটাগং রোড় পর্যন্ত যাবো। চিটাগাং রোড আপনার সাথে নেমে আপনাকে নারায়ণগঞ্জের বাসে উঠিয়ে দিয়ে তারপর আমি নরসিংদীর উদ্দেশে রওনা হবো।’ আমি বললাম, ‘আমার চিন্তা না করে তুমি সোজা নরসিংদীর বাসে উঠে চলে যাও!’

সাগরেদ আমার বারণ আর শুনলো না, আমাকে সাথে নিয়ে দাউদকান্দির এক লোকাল বাসে উঠলো। বাসে উঠে সিটে বসে শুধুই ভাবছি! ব্যাপারটা কী? আমিতো এখনো পুরোপুরিভাবে শিওর হতে পারছি না, এই লোকটা আমার সাগরেদ সেই ছোট ছেলেটি কিনা। ১৯৮৬ সালের কথা। সেসময় আমি কিল্লার পুল নামক সাথে ফাইন টেক্সটাইল নামে একটা মিলে কন্ট্রাকে কাজ করি। তখন আমার এক ছোট সাগরেদ ছিল রাহিম নামে। এই লোকটাই কি সেই রহিম? চলন্ত বাসে বসে বসে কিছুতেই হিসেবে-নিকেষে মেলাতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পরই বাস পৌঁছে গেল আমাদের গন্তব্য চিটাগং রোডে। বাস থেকে দুইজনে নামলাম।

সাগরেদ লোকটি আবার টানাটানি করতে শুরু করলো, চা বিস্কুট খাওয়ানোর জন্য। লোকটি নাছোড়বান্দা। শতবার না না বলার পরও জোর করে নিয়ে গেল রাস্তার পাশে থাকা ভাসমান চা দোকানে। দোকানে গিয়ে দুটি কাচ্চাবিস্কুট হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিজেও একটা বিস্কুট খেতে শুরু করল। তারপর দুইজনে দু’কাপ চা। সিগারেট দিতে চাইলে আমি আগের দেওয়া স্টার সিগারেটের প্যাকেটটা দেখিয়ে বললাম, ‘সিগারেট তো এখনো পুরো নয়টাই মজুত আছে।’ তাই সিগারেট আর নিলাম না, দোকান থেকে বের হলাম। আমার গন্তব্যের বাস অথবা টেম্পোগুলো রেডি থাকে চিটাগং রোডের দক্ষিণপাশে। উত্তরপাশ থেকে দক্ষিণপাশে আসতে হবে ফুটওভার ব্রিজ পাড় হয়ে। সাগরেদ লোকটি বললো, ‘দাদা, আপনার যাবার বাস তো ওপাশে!’ বললাম, ‘হ্যাঁ!’ হ্যাঁ বলার সাথেই বললো, ‘চলেন আপনাকে নারায়ণগঞ্জের বাসে উঠিয়ে দিয়ে আসি।’ না বলার পরও লোকটি আমাকে নিয়ে ফুটওভার ব্রিজ পাড় হয়ে নারায়ণগঞ্জ শীতলক্ষ্যা পরিবহনের সামনে আসলো। লোকটি নিজেই শীতলক্ষ্যা পরিবহনের টিকেট কাউন্টার থেকে একটা টিকেট কিনে আমার হাতে দিয়ে বললো, ‘দাদা বাসে উঠে বসেন!’ আমি বাসে উঠে বাসের মাঝামাঝি জানালার সাথে থাকা একটা সিটে বসলাম।

আমার সাথে সাথে সাগরেদ লোকটিও। লোকটি ডানহাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘দাদা, এবার তাহলে আসি! হ্যাণ্ডশেক করতেই বললো, ‘দাদা, ‘আপনার সাথে মোবাইল আছে?’ আমি বললাম, না!’ তখন দেশে মোবাইলের ছড়াছড়ি থাকলেও আমার কাছে মোবাইল ফোন ছিল না। যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যায়, সেখানে আবার মোবাইল ফোন কী করে থাকে? না বলার পর সাগরেদ লোকটি তাঁর ফুল প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে ছোট একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে আমার হাতে দিয়ে বললো, ‘মাঝে মাঝে কারোর মোবাইল দিয়ে আমাকে ফোন করবেন। আপনার ফোনকল পেলে আমি অন্তত খুশি হবো দাদা। এই বলেই সাগরেদ লোকটি শীতলক্ষ্যা পরিবহন থেকে নেমে নিজের গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হলো। আমি বাসে বসে অবাক দৃষ্টিতে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকটি যেন দিনের আলোর সাথে মিলিয়ে গেল।

আমি বাসে বসে তখনও ভাবছিলাম, লোকটি সত্যিকারের সেই রহিম কি না! নাকি মহান সৃষ্টিকর্তার পাঠানো স্বর্গদূত? এসব ভাবতে ভাবতে সায়দাবাদ বাসটার্মিনাল থেকে আসার পথে সেই অসহায় মেয়েটির কথাও মনে পরতে লাগলো। ভাবতে লাগলাম মেয়েটি এখন কোথায় আছে? গাবতলি বাসটার্মিনাল? নাকি কমলাপুর রেলস্টেশন? যেখানেই থাকুক, মহান সৃষ্টিকর্তা যেন মেয়েটি-সহ ওঁর দুটো শিশু বাচ্চাকে সুন্দরভাবে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দেয়! এসব ভাবার মাঝেই একসময় পৌঁছে পেলাম নিজের গন্তব্য চৌধুরীবাড়ি বাসস্ট্যান্ডে।

বাস থেকে নেমে বাসায় গিয়ে সাগরেদ লোকটির দেওয়া ভিজিটিং কার্ডটি কাঠের আলমারির ড্রয়ারে স্বযত্নে রেখে দিয়েছিলাম। তখন দুপুর গড়িয়ে বিকাল ৪টার মতো হয়েছিল প্রায়। তাড়াতাড়ি করে ঘরে থাকা কিছু খাবার খেয়ে কোমড়ে গামছা বেঁধে রওনা হলাম রিকশার গ্যারেজে। গ্যারেজে গিয়ে দেখি আমার পার্মানেন্ট রিকশাটা আমার দেরি দেখে অন্য একজন চালককে চালাতে দিয়েছে। রিকশার মালিক তখনো গ্যারেজেই ছিল। আমাকে দেখে হেসে বললো, ‘বাবু তোমার দেরি দেখে তো রিকশাটা অন্যজনকে চালাতে দিয়েছি। এই বলেই রিকশা মালিক পকেট থেকে ১০টাকার একটা নোট বের করে আমার হাতে দিয়ে বললো, ‘এটা তুমি খরচ করবে। ফেরত দিতে হবে না। বাসায় গিয়ে আজকে বিশ্রাম করো।’ কী আর করা! মালিকের দেওয়া ১০ টাকা হাতে নিয়ে হেলেদুলে হাঁটছি, আর ভাবছি! ঘরে চাল-পাত আছে কিনা? যদি না থাকে, তাহলে এই ১০ টাকাই গিন্নির হাতে দিয়ে বলবো, আজকের সম্বল আমার এই ১০ টাকাই। যা করার করতে পারো।

গ্যারেজ থেকে গেলাম বাসায়। বাসায় যাবার পর সহধর্মিণী গিন্নী বুঝতে পেরেছে ঘটনা কী হয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘রাতের খাবারের ব্যবস্থা আছে?’ গিন্নী বললো, ‘সমস্যা নেই, এক ব্যবস্থা তো হবেই। ঠিক, হয়েছেও তা-ই। কোনও সমস্যাই হয়নি। পরদিন সকালের নাস্তাও দেখি রেডি হয়ে আছে। সাথে দুপুরের খাবারের আয়োজনও চলছিলো। দুপুরের খাবার খেয়ে আবার কোমড়ে গামছা বেঁধে চলে গেলাম তল্লা নামক স্থানে রিকশার গ্যারেজে। গ্যারেজ থেকে রিকশা বের করে শুরু করে দিলাম নারায়ণগঞ্জ শহরের আনাচে-কানাচে, অলিতে-গলিতে ট্রিং ট্রিং।

সেই ট্রিং ট্রিং শব্দ আমার মনের ভেতরে আজও মাঝে মাঝে বেজে উঠে। যখন সেই ট্রিং ট্রিং শব্দ মনের মাঝে বেজে উঠে, তখন নিজে নিজেই ভাবতে থাকি, অসহায়ের সহায় হলে মহান সৃষ্টিকর্তার তরফ থেকেই সহায়তা পাওয়া যায়। তাই আমি বর্তমানে কোনও মন্দিরে, গির্জায় অথবা কোনও মাজারের দান বাক্সে সমতে যা পারি দেই। অনেক সময় আর দেওয়া হয় না। কোনও পূজাপার্বণে কেউ চাঁদার রশিদ জোর করে ধরিয়ে দিলেও কিছু পারলে দেই, না পারলে আর দেই না। তবে রাস্তা-ঘাটে বা চলার পথে কোনও অসহায় ব্যক্তি যদি হাত পেতে কিছু চায়, তাহলে আর কিছু না দিয়ে পারি না। এছাড়াও যখনই কিছু  দেবার মতো সামর্থ্য থাকে দেখে-শুনে অসহায় মানুষদের দিতে চেষ্টা করি।

২৬৪জন ৮৩জন
21 Shares

৩০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য