অর্থ অনর্থের মূল???

নীলাঞ্জনা নীলা ১৮ এপ্রিল ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ১২:৪৮:৫৬পূর্বাহ্ন বিবিধ ২১ মন্তব্য

টাকা মানুষকে বদলায়, নাকি মানুষ টাকাকে বদলায়? যেভাবেই বলা যাক না কেন, অর্থ যে সকল অনর্থের মূল, চিরন্তন এই বাণীই কঠিন সত্য। হঠাৎ যারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়, তারাই পাল্টে যায়। এ জীবনে তো কম দেখা হলোনা! যে একসময় হৃদয়ের খুব কাছের ছিলো, সে-ই একসময় অর্থের অহঙ্কারে তার পা ফেলেনা। বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তরা নিজেদের বদলে ফেলে অর্থের কারণে। তারা হাত পাততে দেরী করেনা আর একসময় তাদের হাতে যখন অঢেল সম্পদ, তাদের থেকে কোনো সাহায্য পাওয়া যায়না। অনেক কথাই বলে ফেললাম। এবারে আসি কিছু উদাহরণে। নামগুলো ভিন্ন, কিন্তু কাহিনী সত্যি।

এক : অধরা এবং মেঘলা দুজনেই খুব ভালো বন্ধু। মেঘলার জীবন খুবই কষ্টের, খেটে খাওয়া জীবন। আর অধরা বড়োলোক না হলেও আর্থিকভাবে সচ্ছল। যদিও অর্থ তার জীবনে কখনো অনর্থ আনেনি। আর তাই সবসময়ই মেঘলার প্রতিটি কষ্টে অধরা পাশে থাকে। হঠাৎ ভয়ঙ্কর অসুখে শয্যাশায়ী হলো অধরা। তারপর ওর চাকরি চলে গেলো, তারপর থেকে একটু একটু করে বদলে গেলো মেঘলা। তার গাড়ী হলো, বাড়ী হলো, অর্থকড়ি হলো। কিন্তু অধরার জন্য তার আর সময় নেই। একটু মাথাব্যথা হলেই যে মেঘলা অধরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো, আজ চলৎশক্তিহীন অধরা একা, বড়ো একা।

দুই : হিমেলরা খুবই গরীব। তাদের অবস্থা এমনই যে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। পরিবারে ছয়জন সদস্য। চাকুরীজীবি একজনই হিমেলের বাবা। টানাপোড়েনের সংসার শুধু উনার আয়েই চলে। তো একদিন হিমেলদের বাসায় এসে ওঠে তার এক কাজিন অরূপা। অরূপা ওখানে একটা নামকরা কলেজে পড়ার জন্য সুযোগ পায়, কোনো হোস্টেল না থাকায় হিমেলদের বাসাতেই এসে ওঠে। অরূপার বাবা ওখানে থাকা-খাওয়ার জন্য হিমেলের বাবাকে টাকা দিতে চায়, কিন্তু উনি সে প্রস্তাব খুবই ভদ্রতার সাথে প্রত্যাখ্যান করেন। তাই অরূপার বাবা প্রতি সপ্তাহে এসে বাজার করে দিয়ে যেতেন। একসময় অরূপার কলেজজীবন শেষ হয়। অরূপা চলে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। ওদিকে হিমেলের হঠাৎই আমেরিকা প্রবাসী একটা মেয়ের সাথে পরিচয় থেকে প্রেম হয়ে যায়। বিয়ে করে হিমেল চলে যায় বিদেশ। দিনে দিনে হিমেলদের আর্থিক অবস্থা ফিরে যায়, সুদিন এসে পড়ে। কিন্তু হিমেল এবং তার পরিবারের মন-মানসিকতার একটুও বদল হয়নি।

তিন : চৌধুরী সাহেব এলাকার বেশ গণ্যমান্য একজন ব্যক্তি। আর্থিকভাবে তিনি আহামরি কিছু নন, সাধারণ একজন চাকুরীজীবি। তবে উনার ব্যবহার এবং সততার কারণে সকলেই উনাকে ভালোবাসেন এবং শ্রদ্ধা করেন। সকলেরই উপকার করেন, উনার দ্বারা কখনোই কারো অপকার হয়নি। সবসময়ই উনার বাসা ভরপুর থাকতো। কেউ না কেউ কোনো না কোনো সমস্যা নিয়ে আসতেন সমাধানের জন্য। এমনও হয়েছে নিজে ধার করে অন্যকে সাহায্য করেছেন। নিজে কখনো তোষামোদ করেননি, আর সহজ-সরল ছিলেন বলে বুঝতেও পারেননি উনাকে ঘিরে আছে তোষামোদকারীদের দল। একসময় চৌধুরী সাহেব চাকুরী জীবন থেকে অবসরে গেলেন। যারা উনাকে ঘিরে ছিলো, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করলো। শুধু তাই নয় যাদের উপকার করেছিলেন তিনি, সেসব মানুষরা চৌধুরী সাহেবের আর খবরই করেনি।

চার : বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব ভালো বিষয়ে সুযোগ পেয়েও পড়া ছেড়ে দিয়েছিলেন রূপক আহমেদ। নিজের ভাই-বোনকে পড়ালেখা করিয়ে মানুষ করবার জন্য কোনোভাবে একটা চাকুরী যোগাড় করলেন। একসময় ভাই-বোনেরা প্রতিষ্ঠিত হলো, কিন্তু রূপক আহমেদ দুঃসময়ে কোনোরকম সাহায্য তো পেলেনই না, বরং অপবাদ পেলেন। উনি নাকি বাবার টাকা-পয়সা, সম্পত্তি-জায়গাজমি করায়ত্ত করেছেন। আর ওসব দিয়েই ভাই-বোনকে লেখাপড়া করিয়েছেন। রূপক আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, সেই সময় যদি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করতেন, আজ অনেক ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারতেন।

পাঁচ : খুবই দরিদ্র পরিবারের মেয়ে উজালা। টানাটানির সংসার তার। লেখাপড়ায় বেশ ভালোই ছিলো, কিন্তু চালিয়ে যেতে পারেনি। উজালার বড়ো বোন একটা সম্বন্ধ নিয়ে এলো। বিয়ে হয়ে গেলো। পাত্র সচ্ছল, মানুষটাও ভালো। আস্তে আস্তে উজালার আর্থিক অবস্থা ভালো হলো। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে উজালার মন-মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি। সে আগের মতোই নিরহঙ্কারী, সহজ-সরল মনেরই থেকে গেছে।

এমন আরোও অনেকের ঘটনা আছে। যা লিখতে গেলে বিশাল বড়ো হয়ে যাবে। অর্থ কীভাবে একজন মানুষের চরিত্রকে বদলে দেয়, এই কয়েকটি কাহিনির মধ্যে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। সত্যি বলতে গেলে খুব কম মানুষ আছেন, অর্থ যাদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন করতে পারেনি।

☀🌞শুভ নববর্ষের শুভেচ্ছা সকলের জন্য।🙏🙏

হ্যামিল্টন, কানাডা
১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ইং।

২৯১জন ১২৪জন
17 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য