অরনীর গন্তব্য//

বন্যা লিপি ৮ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার, ১১:৪৭:২৮অপরাহ্ন গল্প ১২ মন্তব্য

অনু গল্পঃ

বিকেল এখনো আসতে বেশ খানিকটা বাকি। মেঘলা আকাশ। অরণী’র মন ভালো নেই। ঘর ছেড়ে অনেকটা দূরে চলে এসেছে। অসংখ্য ইউক্যালিপটাস আর ঝাউ গাছের ভেতরের রাস্তায় আনমনে হাঁটছে। মনের সাথে বোঝাপরায় টান পড়লেই অরণী এখানে চলে আসে। একটু ভেতরের দিকেই ঝিলের ধারে পুরোনো কাঠের বেঞ্চিতে বসে বসে আপন মনে, কখনো কবিতা পড়ে, কখনো একা একাই সুর তোলে কন্ঠে। রবীন্দ্রগিতী আর রবী ঠাকুরের অমিত-লাবন্য’র প্রেমে ডুবে থাকর আমগ্ন। এখানে সচরাচর কেউ আসেনা। বেশ নির্জন পরিবেশে নিজেকে নিয়ে একা কাটানো।
গত তিন দিন আগে এখানে আরো কেউ ছিলো। পাশ কেটে কিছু সময় পরেই চলে গিয়েছিলো অরণী। দেখতে পায়নি অরণী, কেউ একজন লক্ষ করেছিলো আনমনা অরণী’কে।

ঝিলের একেবারে কাছ ঘেসে দুর্বাঘাসের গালিচায় আজ বসেছে অরণী। ছোট ছোট মাটির টুকরো জলে ছুঁড়ে মারছে। বুকের ভেতর কিছু জমানো কষ্টগুলো’কে ঢিল স্বরুপ ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারছে যেন ঝিলের বুকে।
মৃদু তরঙ্গায়িত ঢেউ এসে কিনারে এসে যেন প্রশ্ন করে অরণী’কে, আমার বুকে আঘাত করছো কেন?

-স্বাগতম, অরন্যের ভূবনে।
চমকে উঠে হাতের মাটির ঢিল লক্ষভ্রষ্ট হয়। আগন্তক’কে বুঝতে দেয়না। নিরাসক্ত মুখে বলে, –স্বাগতম, ধন্যবাদ।
কথা নেই বার্তা নেই দুম করে প্রশ্ন করে বসে। অরনীও নির্বিকার জবাব দেয়। আগ্রহ বা অনাগ্রহ কোনোটাই কাজ করেনা অরণীর।

-তুমি কোথায় থাকো?
–এইতো-কাছেই, অথচ কাছেও নয়।
পরিচয়ের তোয়াক্কা নেই। তবু যেন কতদিনের চেনা। ভাবটা এমন।
বনের মতো চুপচাপ। হলদে বিবর্ণ পাতারা বাতাসের জোড়ে উড়ে এসে পড়ছে। হলুদ বিবর্ণ পাতা এক সময় সবুজ ছিলো।
অরণীঃ তুমি কোথায় থাকো?
ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসির রেখা টেনে —
আমি অরন্য, অরন্যেই বসবাস!
অরণী হেসে উঠলো।
-তাই? তোমার বুঝি ঘর নেই?কেই নেই?
–আমি কারো যোগ্য না। জানো আমার সবচে প্রিয় কবিতা “কেউ কথা রাখেনি”।
– আচ্ছা!!মিলে গেলো তো! ওটা আমারো প্রিয়। ভালো লাগলো।
–চিমটি,
চমকে তাকায় অরণী, চোখে প্রশ্ন।
অরন্যঃ তোমার আমার পছন্দ মিলে গেলো তাই -চিমটি,
অরণীঃ হাইফাইভ।

অরন্যঃ মানে?

অরণীঃ চিমটি কেমন যেন আনইজি লাগলো শব্দটা। অস্বস্তি লাগলো।আজকালকালকার ফ্যাশন,হাইফাইভ।এতেই স্বস্তি।
অরন্যঃ আমি একটু মজা করে কথা বলি।মাঝে মাঝে।

অরণীঃ মজা করা আমিও পছন্দ করি।তবে বুঝে শুনে।

অরন্যঃ এত হিসেব করা হয়না আমার।

অরণীঃ স্বাভাবিক,হতেই পারে।

অরন্যঃ আমি খুব অস্বাভাবিক। সবাই যতটা অস্বাভাবিক, আমি তার চেয়েও অস্বাভাবিক।

অরণীঃ যেমন?

অরন্যঃ খামখেয়ালী
স্বেচ্ছাচারী
স্বার্থপর
অরণীঃ তুমি কবি। ছেলে কবি’রা অমনই হয়।

অরন্যঃ এলোমেলো
অগেছালো।
অরণীঃ বাপরে! বলো কি?

অরন্যঃ আমার মতো কেউ নয়।

অরণীঃ সব গুণই আছে দেখছি!!

অরন্যঃ সব তো বলা শেষ হয়নি!

অরণীঃ তাইতো মনে হলো। আরো আছে?

অরন্যঃ মনে যা হয়না,আমি তারচেয়েও বেশি অস্বাভাবিক।

অরণীঃ এ জন্যই বুঝি সঙ্গিহীন??

অরন্যঃ হু,

অরনী ঝুঁকে থাকে নিজ কোলের মধ্যে থাকা সাথে করে আনা ডায়রী’র পাতায়।
শাঁ শাঁ করে বাতাস বইছে। আপন সুরে বইছে,ঝিলের জলের তরঙ্গ।অরনী ঢিল ছুঁড়ছেনা, লিখছে। নানা রকম পাখির ডাক শুধু দুটি মানুষের মধ্যে কথা বলে যাচ্ছে।

অরন্য চলেও যাচ্ছেনা। মোটা কালো ফ্রেমের চশমার ভেতর থেকে দেখছে অরনী ‘কে। যেন এর আগে এমন নারী আগে কখনো চোখে পড়েনি। পড়নে ঢাকাই শাড়ি আর এলোখোঁপায় হলুদ অলকানন্দা ফুল।হাতে ক’গাছি রেশমি চুড়ি।কপালে খয়েরি টিপ।
মন খারাপ হলেই অরণী’র সাজতে ইচ্ছে করে।আয়নার সামনে সময় নিয়ে নিজেকে নিয়ে বসে।
কিছু বাদেই অরণী’র কন্ঠ বেজে উঠলো।

“হয়নি, ভেঙেচুরে গড়ে নেয়া হয়নি আজও।
সময়ের গিটারে এলোমেলো সুরের টানে
ছিঁড়েছে এক হলদে বিকেলের কাব্য।
তবু হয়নি ফেরা,
আপনভোলা পথ থেকেছে ধুলোয় ভরা।
ছন্দ আর কাব্যের ঘর বড্ড বেশি
স্বেচ্ছাচারি
অগোছালো
অহংকারি
সবটুকু গুণের বাপান্ত ধ্বজাধারী।
স্মৃতির ফোঁড়ন কাটা অথবা কিছুই না।
ভারী লেন্সের পর্দায় কেবল
বিবর্ণ সুখের আতশবাজি।
আদ্যপান্ত মুড়ে নেয়া যায় অবলীলায়।
আয়নাটা স্বদম্ভে উচ্চারন করে চলে
আপন পরিচয়ের ডঙ্কা।
এখানে একলা থাকার গুরুগাম্ভির্যে
ঝুলে থাকে হলুদ আলোর ল্যাম্প।
নিঃস্বর্গের কাছে আর্তি রেখে রেখে
চলে রোজকার রোজনামচা।

অরন্যের চোখে নরম স্নিগ্ধতা।
অরন্যঃ তোমার কবিতা?
অরণীঃ মাত্রই লিখলাম। তোমার কথা জেনে।

অরন্যঃ মেলালাম নিজের সাথে,
ভালো লেগেছে।

অরণীঃ কৃতজ্ঞ হলাম।

অরন্যঃ কৃতজ্ঞ তো আমার হবার কথা,
কেউ আমাকে ভেবেছে!

অরণীঃ তোমার ভালো লেগেছে জেনে কৃতজ্ঞ হলাম।

অরন্যঃ এটাতো আমার সৌভাগ্য!
অরণীঃ আমি অতি নগন্য।
অরন্যঃ আমি নিজেকে নগন্য ভাবতে ভালবাসি।
অরণীঃ এই ভালবাসাটুকু বড্ড স্বার্থপরের মতো আমার একার সম্পত্তি।

অরন্যঃ তোমারটা তোমার
আমারটা আমার।

অরণীঃ বেশ,তবে তাই হোক।
অরন্যঃ হু
অরনীঃ হু

অরন্যঃ হু
হা
হি
হে
এসব শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা।

অরণীঃ তুমিও তো তাই করো।

অরন্যঃ হ্যাঁ, করি, কিন্তু অন্যেরটা নিতে পারিনা। আসলে কথা ফুরিয়ে গেলে মানুষ, হু,হা,হু এসব বলে।

অরণীঃ আমারো তাই মনে হয়।

অরন্যঃকিন্তু মানুষ জানেনা, কথা হলো সমুদ্র।

ঃঅরণীঃ একদম।
অরন্যঃ হু

অরণীঃ হা হা হা,

অরন্যঃ তুমি থাকো কোথায়?

অরনীঃ এই তো কাছেই, আবার কাছেও নয়!!

অরন্যঃ বলেছিলে তো! আমি তো ভুলোমনা।

অরণীঃ বুঝলাম।

অরন্যঃ তুমি সব এত দ্রুত বুঝে যাও?

অরনীঃ যাইতো!!

অরন্যঃ তাইতো দেখলাম!

অরণীঃ কিছু তো আছে থাকার মতো!!
অরন্যঃ অনেক কিছু হয়তো আছের!
আমারতো সবই অজানা।
অরনী এবার উঠে পড়ে দুর্বাঘাসের গালিচা থেকে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আলো কমে আসছে। ফিরতে হবে। অরন্যের চোখে চোখ রেখে বললো “জানার মতো তেমন তো কিছু নেই আমার”
অরন্য অকাতরে বুভুক্ষের মতো বলে ওঠে “তবু কিছু তো বলো ”
অরনী পা বাড়ায় ফেরার পথে। পরিচিত হতে সময় লাগেনি যেমন। তেমনই পেছনে ফেলে সন্ধ্যার আলোছায়ায় নিজেকে সরিয়ে নিতেও সময় দিতে চায়না। পথ পেরোতে হবে একাই। না খুব দুরে, না খুব কাছে অরনী’র গন্তব্য।

১৮৮জন ৬৪জন
7 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ