অবাকের স্কুল ভীতি (শেষ পর্ব)

শাফিন আহমেদ ৩০ জুলাই ২০১৯, মঙ্গলবার, ১১:০২:১৭অপরাহ্ন গল্প ২৪ মন্তব্য

অবাকের আম্মুকে কাজে সাহায্য করার জন্য বাসায় এক আপু থাকে অবাকের, তার নাম রেহানা। অবাকের আম্মু অবাককে বলল যে, ‘’আজকে থেকে স্কুলে তোমার সাথে রেহানা আপু যাবে’’।

অবাক মনে মনে ভাবে যে স্কুল আসলে যেমনটা ভেবেছিলাম অতটাও খারাপ না, যেহেতু এতদিন হয়ে গেলো এখনো কেউ মুসলমানি করাতে আসছে না তাই একটু আশ্বস্ত হল আম্মুর কথায় । অবাকের সাথে এখন রেহানা আপু স্কুলে গিয়ে বসে থাকে । অবাকের ভয় আগের থেকে একটু কমেছে, রোল কলের উত্তর এখন নিজেই দিতে পারে ।

কিছুদিনের মধ্যে স্কুলের ১ম সাময়িক পরীক্ষা ঘনিয়ে এলো, এখন আবার নতুন আরেক কাহিনী । ভিজিটররা বলে গেলো যে, রেহানা আপাকে পরীক্ষার সময় আর বেঞ্চে বসে থাকতে দেয়া হবেনা, তাছাড়াও ব্যাপারটা কেমন না ! কোনো অভিভাবকই এরকম বেঞ্চে বসে থাকেনা অবাকের রেহানা আপা ছাড়া। কি আর করা , অবাকের সাথে চুক্তি হয়েছে রেহানা আপা একেবারে চলে যাবেনা তবে জানালার পাশে দাড়িয়ে থাকতে হবে তার। কেউ অবাককে মুসলমানি করিয়ে দিতে ছুরি নিয়ে আসলে অবাক যেনো তাকে ডাক দিতে পারে সেরকম পজিশনে জানালার পাশে থাকতে হবে তার।  অবাককে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রেহানা আপা গিয়ে দাড়ালো জানালার পাশে । অবাক উকি দিয়ে দেখলো ঠিক আছে সবকিছু, ভয়ের কোনো কারন নেই । এরকম করে ১ম সাময়িক পরীক্ষা দিলো তারপর ২য় সাময়ি্ক,‌ দুটো পরীক্ষাতেই অবাক ১ম স্থান অধিকার করার জন্য ওর বাবা-মা যেমন খুশি হল তেমনি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও।

সবশেষে বার্ষিক পরীক্ষা দিলো অবাক। আজকে অবাকের ফলাফলের পালা । ফলাফল ঘোষণা হল এবং বার্ষিক পরীক্ষাতেও  ১ম স্থান অধিকার করে শিশু শ্রেনী থেকে প্রথম শ্রেনীতে এখন অবাক। এতদিন অবাকের রোল ছিলো ৩৪ । এখন থেকে তার রোল হল ১ । এই রোল নিয়ে অবাকের মন খুবই খারাপ, তার অন্য বন্ধুদের রোল কারো ২ কারো আবার ১৫ কিন্তু তার রোল কেনো এত কম হবে। সবাই তাকে বুঝিয়ে বলল যে, ‘’রোল ১ তাদেরই হয় যাদের ফলাফল সবার থেকে ভালো হয়’’ । অনেক বুঝানোর পরে সে বুঝতে পারলো যে রোল ১ যারা পরীক্ষায় বেশি নম্বর পায় তাদেরই হয় তাই বলে অন্যরা যে খারাপ ছাত্র এমনটা নয়, শুধু বেশি নম্বর অনুসারে ১ তারপরে ২ এরকম ভাবে ক্রমানুসারে সাজানো হয় । ইতিমধ্যে অবাককে বাবা-মা অনেক কষ্টে বুঝিয়ে সুঝিয়ে সুন্নাতে খাতনার ব্যবস্থা করলো। ডাক্তারও অবাককে ভুলিয়ে ভালিয়ে এই অসাধ্য সাধন করল।

মুসলমানির (সুন্নাতে খাতনা) ১ সপ্তাহ পরে অবাক আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করলো, , , ,

এখনও রেহানা আপা গিয়ে অবাকের জানালার পাশে দাড়িয়ে থাকে কিন্তু অবাক একটি বারের জন্যেও তাকায় না এখন আর ওদিকে । অবাকের আম্মুর ধারণা অবাক হয়তো এখনও একা স্কুলে যেতে ভয় পায় তাই সে রেহানাকে আর নিষেধ করেনা ওর সাথে স্কুলে যেতে। অবাকের ভয় যে নিজের অজান্তেই কেটে গেছে অবাক টেরই পায়নি । এছাড়াও তার ভয়ের প্রধান কারন তো ছিলো মুসলমানি সেটাও এখন আর নেই। অবাক তার ক্লাসের বন্ধুদের সাথে হাঁসি ঠাট্টা করে আর রেহানা আপা ওর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে । রেহানা আপারও একটা ছেলে ছিলো অবাকের মতই দেখতে, নাম ছিলো তার ‘’মানিক’’, সে পানিতে ডুবে মারা গিয়েছে আরো ২ বছর আগে। বেঁচে থাকলে হয়তো তার ছেলেও এখন স্কুলে পড়ত, অবাকের মতই মিষ্টি করে কথা বলত , পরীক্ষায় ১ম হতো। এগুলো অবাকের দিকে তাকালেই তার চোখে ভেসে ওঠে আর কখন যে চোখের কোন থেকে টুপ করে এক ফোটা জল গড়িয়ে পরে টেরই পায়না রেহানা আপা, তখন সে সাথে সাথে চোখ মুছে এদিক ওদিক তাকিয়ে আবার জানালার পাশে দাড়িয়ে দেখতে থাকে অবাককে। রেহানা আপার মায়া জন্মে গেছে অবাকের জন্য, অবাককে না দেখে এখন আর সে থাকতে পারেনা। অবাককে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য সকাল সকাল বাসায় এসে বসে থাকে । বন্ধুরা অবাককে নিয়ে সবসময় মজা করে, অবাককে ভীতুর ডিম বলে ক্ষ্যাপায় বন্ধুরা, কারন তারা জানে যে অবাকের জন্য প্রতিদিন এক মহিলা এসে জানালায় দাড়িয়ে থাকে যেন সে ভয় না পায় এজন্য। অবাকের খুব রাগ হয় এজন্য। স্কুল ছুটি হলে অবাকের হাত ধরলে সে হাত সরিয়ে নিয়ে বলে, ‘’হাত ধরতে হবেনা আমি একাই যেতে পারবো বাসায়’’। রেহানা আপা কিছু না বুঝে অবাকের পেছন পেছন বাসায় আসে। এদিকে বাসায় এসেই অবাক আজকে একটা কথা বলে অবাক করে দেয় সবাইকে । অবাক বলে ‘’আম্মু আমার সাথে এখন আর কারো যেতে হবেনা আমি ভয় পাইনা এখন আর স্কুলে’’। আম্মু শুনে তো খুবই খুশি সাথে সাথে অবাকের বাবাকেও ফোন করে জানালো এই খুশির কথা। সবাই খুশি হলেও রেহানা আপার মুখ টা কালো হয়ে গেলো । সে যে অবাকের মধ্যে তার মৃত ছেলের ছায়া খুজে পেয়েছিলো । এতদিন তার মনেই ছিলোনা যে দু বছর আগে সে তার আদরের মানিক কে হারিয়েছিলো। রেহানা আপা তবুও তার অভ্যাস আর ছাড়তে পারেনা, সে চুপি চুপি যায় অবাকের স্কুলে, লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে অবাককে। হঠাত একদিন অবাক দেখতে পেল তার রেহানা আপাকে , দেখেই অবাকের মাথা প্রচন্ড গরম হয়ে গেলো তার উপর । অবাক এক দৌড়ে তার কাছে এসে বলল এই তোমাকে না বলেছি আমি আর স্কুলে ভয় পাইনা, যাও এখান থেকে চলে যাও আর কখনো আসবেনা । রেহানা আপা ‘’ঠিক আছে আব্বু’’  বলে কোনো শব্দ না করে মাথা নিচু করে চলে যায় সেখান থেকে। রেহানা আপা হেটে যাচ্ছে তবুও কেন যেন তার পা আজকে আর এগুচ্ছে না । তার বুক ফেটে কান্না চলে আসছে । সে একসময় একটা গাছের পাশে গিয়ে বসে পরে। তার বুকের বাম পাশটা আজকে খুব ব্যাথা করছে । হয়তো কাউকে তিনি বলতেও পারবেনা তার এই ব্যাথার কথা ।

অবাকের বাকি দিনগুলো দারুণভাবেই কেটে যেতে থাকে। প্রতিটা ক্লাসে ভালো ফলাফল করতে করতে একসময় সে অনেক বড় হয়ে যায়। তার ছোট বেলার পাগলামো গুলো মনে পরলে এখন নিজেই মনে মনে হাসে ।

এভাবেই অবাকেরা ছোটবেলা থেকে পরম স্নেহ আর ভালোবাসা নিয়ে অনেক বড় হয়ে যায়, শুধু সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে যায় রেহানা আপারা ।

 

২১৫জন ৪১জন
33 Shares

২৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য