অবরোধ ।

প্রিন্স মাহমুদ ২৭ আগস্ট ২০১৪, বুধবার, ১১:২০:২১অপরাহ্ন গল্প ১২ মন্তব্য

১.

ঘটনাটা কিছুদিন আগের । ফেসবুকে এক মেয়েকে দেখলাম । কখনো কথা হয়নি । নেটে এলেই নানা দিকে ঝুঁকে পড়ি । তার আইডিতে আগে কখনো ঢুকা হয়নি । কিভাবে যেন তার একটি ছবি আমার চোখে পরল । তারপর যা হল তা দুঃস্বপ্নের মতো । আমি মেয়েটিকে সাথে সাথে বললাম ” আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই তবে রাজি হলে তার আগে চার বছর প্রেম করতে চাই ” । মেয়েটি ভ্যাবাচেকা খেয়ে আমাকে রিমুভ করে দিলো । আমাকে প্রেমের কুত্তায় কামড়াল । জীবনের প্রথম কোন মেয়ের ছবি ডাওনলোড করলাম । মোবাইল – পিসির ওয়ালে আসে ছবি আছে । কি সুন্দর মুখ ! হাতের আঙুল গুলো ধ্রুপদী কবিতা যেন ! ডান হাতে একটা চুড়ি । চুলগুলো সূর্যাস্তের মতো জড়িয়ে নেমেছে বুকে । আমার আম্মা সে ছবি দেখে বলল,মেয়েটা কে ? আমি গম্ভীরভাবে বললাম ,আমার ক্লাসমেট । ঈদে কক্সবাজারে ডুবে মারা গেছে । চেহারা ভুলে যাব এই কারনে ছবি ঝুলাই রাখসি । মেয়েটা আমারে লেখাপড়ায় খুব হেল্প করত । আম্মা বিশ্বাস করছে নাকি জানিনা । করার কথা না ।

আমি অবশ্যই জীবনের কিছু সময় ঘুম থেকে উঠেই এই মুখ দেখতে চাই । আমার খাওয়াদাওয়া উঠে গেছে , ঘুম নেই । ক্লাসে যাই – সবাই ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকায় । আমি তাকাই মোবাইলের দিকে । ওয়ালপেপারে তার ছবি । বিশ্রী অবস্থা ।স্যার দেখে বলল , মেয়েটা কে ? আমি বললাম কেউ না । তারপর বলল এখন কি তাকে নিয়ে লিখছ ? দেখি সবাইকে শুনাও । অন্য সময় হলে লজ্জা পেতাম । কেন জানি পেলাম না । গম্ভীর ভাবে বললাম –

তুমি যদি নদী হও
আমি হবো জেগে থাকা চর
তুমি যদি গতি হও
আমি হবো অনন্ত পথ
আমার চাতক চোখে
তুমি হবে দূরের আকাশ ।

সে দেখা করার সময় দিয়েছে । যে কোন সময় ফোন আসবে । একটা ফোনের অপেক্ষায় কাটছে সময়গুলো । দেখা হলেই আমি ওর নিঃশ্বাস চুরি করে নেব । সোনালি কাবিনে জমাব ওর প্রতি মুহূর্ত । স্ফটিক দাঁতের আস্ফালন । ঠোঁটের উন্মাদনা । বুকের আকাশ । সবকিছু । সবকিছুই । আজ তার জন্য ।

২.

সেদিন তার আসার কথা ছিল । সে বলেছিল সে কথা দিলে কথা রাখে । সুনীলের কবিতা কীভাবে যেন আমার জীবনে বারেবার সত্যি হয়ে যায় । টানা দুঘণ্টা আমি দাড়িয়ে ছিলাম । এই সময়গুলোতে আমি ৯০ টাকার গোল্ড লিফ টানলাম , মানে ১৫টা সিগারেট । তারপর প্রচণ্ড বুক ব্যথা নিয়ে ফিরে এলাম । গভীর রাতে তার প্রথম ফোন পেলাম । সে বলল ‘সরি’ । আজকালকার মেয়েরা জন্ম থেকে সরি শব্দটা শিখে আসে । এই শব্দ কথায় কথায় ব্যবহার করতে না পারলে তাকে গ্রাম্য বলে ধরে নেয়া হয় । আরও কিছু শব্দ আছে । যেমন – ওএমজি ( ও মাই গড ) , কিউট , সুইট , অসাম । সে কারন হিসেবে বলল , তার ছোট বোন খুব কান্না করছিল । ছোট বোনকে ছাড়া সে থাকতে পারেনা । আমি বললাম , তোমার কাছে তো কিছু জানতে চাইনি । সে বলল , কিছু একটাতো বলতে হবে । তাই বলছি । তুমি রাগ করোনা । আমি বললাম , যাকে ছাড়া মানুষ থাকতে পারেনা তাকে ‘তুমি’ বলা উচিত । তোমার ছোট বোনকে তুমি বলো , আমাকে না ।

– রাগ কি খুব বেশী ?
– না । রাগ করলে কথা বলতাম না । আমার রাগ সময়ের সাথে বাড়ে , কমে না ।
– আমি ‘তুমি’ করেই বলবো
– বলো । কে সারা সারা !
– আচ্ছা ,তুমি কি কবিতা লিখো ?
– না । সাহিত্য আমার পছন্দের বিষয় না ।
– পছন্দের বিষয় হলে ভালো হতো , রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা কিনেছি তোমাকে দেয়ার জন্য ।
– এটা কি তোমার পড়া প্রথম উপন্যাস ?
– তুমি কি করে বুঝলে ?
– যার প্রথম উপন্যাস শেষের কবিতা দিয়ে শুরু হয় । সে আশেপাশে থাকবে , ধরা দেবে না । এই কারণে বললাম । বৃত্ত একে বৃত্তর বাইরে থাকা এই উপন্যাসের মুল চাবিকাঠি ।
– তোমার কি এই উপন্যাস ভালো লাগেনি ?
– বুঝতে পারছিনা । আমার ও প্রথম পড়া উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’ । ভালো লাগেনি বললে রবীন্দ্রনাথকে ছোট করা হয় । আমি অভদ্র না ।
– আজকে অনেক বড় চাঁদ উঠেছে ।
– এখন কি তুমি রবীন্দ্রনাথের ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে’ বনে শুনাবে ?
– আমার গলা তোমার ভালো লেগেছে এটা বললেইতো হয় । গান শুনতে চাও , তাইতো ?
– হু
– একটু যদি তাকাও তুমি মেঘগুলো হয় সোনা,
আকাশ খুলে বসে আছি তাও কেন দেখছো না?
একই আকাশ মাথার উপর এক কেন ভাবছো না?

আসবে বলে ঐ যে দেখো মেঘেরা দাঁড়িয়ে,
আকাশটাকে দেখি চলো মেঘটাকে তাড়িয়ে!
মেঘের মতো হাটবো দুজনহাত কেন রাখছো না?

চলো দুজন স্বপ্ন দেখি এক অনুভব নিয়ে,
যা কিছু আজ মনের মতো আনব যে ছিনিয়ে!
আমার মতো কেন তুমি মন খুলে রাখছো না?

– ভালো ।
– শুধু ভালো ? আর কিছু না ?
– না
– গানটা শুনলেই ইদানিং তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে ।
– শুধু এই একটা গানে ?
– হ্যাঁ , গানটা জাতীয় সঙ্গীত করা উচিত ।
– আচ্ছা
– ‘ বরফ গলা নদী’ পড়েছ ?
– জহির রায়হানের ?
– হ্যাঁ ।
– গল্পটা কি বলো তো ওখানে
– মনে নেই । আমার উপন্যাস- গল্প মনে থাকেনা ।
– বুঝছি
– হু
– তুমি নাম মুখস্থ করে রাখো । না পড়ে বল পড়েছি ।
– হু
-ফেসবুকে নতুন ছবি দিয়েছি । দেখেছো ?
– হু
– আমি সুন্দর না ?
– কমেন্ট জানতে চাচ্ছ বললেই তো হয় ।
– হ্যাঁ কমেন্ট জানতে চাচ্ছি ।
– ‘পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রুপ নিয়ে দূরে’
– এই ফাজিল , তুমি জীবনানন্দ দাশ পারো , আগে বলনি কেন ?
– নাতো । এটা জীবনানন্দ দাশের কবিতা আজই প্রথম জানলাম । উনি কে ?
– তুমি এত দুষ্ট কেন ? বললেই হয় । আমার সাথে মজা নিচ্ছ শুধু ।
– আমাকে কেউ কখনো দুষ্ট বলেনি ।
– সত্যি ? তুমি কিন্তু খুব দুষ্ট ।
– কীভাবে বুঝলে ?
– সেদিন আমাকে নিয়ে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলে । ওটা দেখেই । সেখানে লিখেছিলে ‘ তুমি যদি নদী হও , আমি হবো জেগে থাকা চর ‘ । এটা কি তোমার লেখা ?
– না । আমি লিখতে পারিনা । লিখলে তোমাকে নিয়ে এসব লিখতে হতো না ।
– আচ্ছা , তুমি সত্যি আমাকে পছন্দ কর ?
– হু
– হু’টা কি ? বলোনা । ফোনে চার্জ শেষ হয়ে যাচ্ছে ।
–   তুমি আমার একটু চাওয়ার
অনেকখানি পাওয়া
তুমি আমার খর রোদে
মিষ্টি হিমেল হাওয়া
তুমি আমার সূর্যাস্তের
ঝিকিমিকি বালুকা বেলা ।

তুমি আমার মরু প্রান্তে
ঘন সবুজ বন
তুমি আমার তপ্ত বুকে
ঝরঝর আষাঢ় শ্রাবণ
তুমি আমার হৃদয়ে
হাজার তারার মেলা ।

৪৯৫জন ৪৯৪জন
0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ