অবন্তী বলেছিল কাল এসো ( ম্যাগাজিন)

রাফি আরাফাত ৯ মে ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ১১:৫৪:৫০অপরাহ্ন গল্প ১৫ মন্তব্য

স্মৃতির শহরে হাজারো স্মৃতির ঢেউের মাঝেও কিছু স্মৃতি বারবার আমাদের শান্ত মনকে অশান্ত করে তুলে। সে অশান্তিতে নেই কোন বিরক্তির আভাস,নেই কোন অভিযোগ, নেই কোন ক্লান্তুি। আচ্ছা আসল কথায় আসা যাক,আজ আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন। অনুভূতিটা ছিলো সপ্নে কোন দেশের রাজা হওয়ার মতো। তবে এই রাজার ভাব বেশীদিন থাকলো না। কাধে বিভিন্ন দায়িত্ব এসে পরতে লাগলো। সেগুলো সামলাতে গিয়ে মাঝে মাঝে নিজেকে পৃথিবির সবচেয়ে শক্তিশালী ইঞ্জিন মনে হতো। এভাবেই কাটতে লাগলো দিন।

..
ও হ্যা আমার একটা কাছের মানুষ হইলো, তবে সে জানতো না যে সে আমার কাছের মানুষ। কি একটু অবাক হলেন তাইনা। ওকে একটু পিছনে ফিরে যাই তাহলে। আমার একটু আট্টু গান বলার অভ্যাস ছিলো। সেদিন সন্ধ্যায় বন্ধুরা সবাই আড্ডা দিচ্ছিলাম টি এস সির সামনে। মাঝে মাঝে গান বলে নিরস আড্ডাটাকে জমিয়ে তুলছিলাম আমি। মাঝে মাঝে ভাবতাম আড্ডা জমানোর জন্য যদি কোন চাকরি থাকতো তাহলে হয়তো আজ আমি সেই চাকরির বিভাগীয় প্রধান পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হইতাম। এভাবেই জীবন চলছিলো তার গতিতে,আর আমি জীবনকে বুজে তার সাথে তাল মিলায় চলার এক আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম।
..
প্রতিদিনের মতো সেদিনও আড্ডা দিয়ে আমি বাসায় ফিরতেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলো। চারদিকে অন্ধকার ছিলো। আমি হাটতেছিলাম অজানা কিছু আবেগ নিয়ে ঠিক সেই সময়ে পিছন থেকে কেউ একজন মেয়ের কন্ঠে বললো, “এইযে শুনছেন?” পিছনে ফিরে তাকালাম।কাউকে পেলামনা। আবার সামনের দিক ঘুরতেই সেই কন্ঠ, “এইযে শুনছেন?” আবার পিছনে তাকালাম। এবারো কাউ কেই পেলাম না। কিন্ত নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বের হয়ে আসলো, “জি কাকে বলছেন?”সেই অন্ধকারকে ছেদ করে অসম্ভব মায়া ভরা একটা কন্ঠ আমার কানে এসে বাজলো, ” জি আপনাকে বলছিলাম”। হাজারো কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো। কিছু বলার আগেই অপার থেকে একটি কথা ভেসে আসলো,”আপনার গাওয়া গান আমার অনেক ভালো লাগে!”এই কথা শুনার পর টানা ৫ মিনিট আমি চুপ করে ছিলাম। কেন ছিলাম জানিনা। হঠাৎ চমকে উঠে ছুটে গেলাম সামনের দিকে,যেদিক থেকে আওয়াজ আসতেছিলো। গিয়ে দেখি কেউ নেই,তাহলে কি স্বপ্ন দেখতেছিলাম। নাকি আমার কল্পনা। নাকি সত্যি কেউ ছিলো।
..
সেদিনের পর আর কাউকে এমন করে রাস্তায় কিছু বলতে না দেখলেও ব্যাপারটা কেন জানি কিছুতেই মাথা থেকে তারাতে পারছিলাম না। এমনকি রাতের স্বপ্নেও ব্যাপারটা আড়াল থাকলো না। হঠাৎ অসুস্থ হওয়ার কারণে দুইদিন আড্ডায় যেতে পারলাম না।তিনদিন পর যখন আড্ডায় গেলাম সেদিন বাসা আসার পথে আবার সেই আওয়াজ, “এই যে শুনছেন?” আমি কিছু না বুজেই বললাম তুমি কে?এতদিন কথায় ছিলে?তুমি কি আমার স্বপ্ন ?এতগুলো প্রশ্নের একটাই উত্তর পেলাম, “আপনি দুইদিন আসেননি কেন?” অন্ধকারকে হার মানিয়ে খুব চেষ্টা করছিলাম অপারের মুখটা দেখার জন্য।কিন্তু কিছুতেই পারছিলাম না। তার প্রশ্নের উত্তরে আমি বললাম,অসুস্থ ছিলাম তাই। তাকে কিছু বলার সুযোগ দাওয়ার আগেই আমি আবার বললাম,তুমি কে?তোমার নাম কি?কথায় থাকো?এরপর আর কোন পুর্ন বাক্য আমি শুনতে পেলাম না। শুধু ছোট্ট একটা শব্দ শুনতে পেলাম,”অবন্তী “। এরপর সে আবার মিশে গেলো। মনে হচ্ছিলো অন্ধকারের সাথে তার যেন দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব। তাই খুব সহজে অন্ধকারে হারিয়ে যেতে পারে।
..
এরপর প্রতিদিন আড্ডায় গেলেও আমার মন শুধু তাকেই খুজে বেড়াতো।”এই যে শুনছেন”এই শব্দটা শুনার জন্য সবসময় অস্থির হয়ে থাকতাম। এরপর রোকেয়া হলের পাশে রাত ৭ঃ০০-৯ঃ০০ টা পর্যন্ত নিয়মিত কতদিন যে তার খোজে দারিয়ে ছিলাম কিন্তু কিছুতেই তার কন্ঠের সাথে চেহারার সন্ধান পেলামনা। দিনটা ছিলো সোমবার। ক্লাস শেষ করে বসে ছিলাম ক্যাম্পাসে। কেউ একজন পিছন থেকে ভাইয়া বলে ডাক দিলো,আমি পিছনে ফিরিয়ে তাকায় দেখলাম একটি মেয়ে,আমি বললাম জি বলুন। মেয়েটি বললো আজ রাতে হলের সামনে না দাঁড়িয়ে প্রথম আপনার আর অবন্তীর যেখানে কথা হয়েছিলো সেখানে থাকিয়েন। বলেই চলে গেলো সে। এরপর মাথায় কত কি যে ঘুরতে লাগলো। এতদিন কথা বললো না কেন সেটা জিজ্ঞেস করবো, নাকি অন্য কিছু। এমন হাজারো কথা মাথায় আসতে লাগলো।
..
সময় যেন সেদিন কিছুতেই যাচ্ছিলো না। অবশেষে সেই সময় চলে আসলো। আমি খুব অস্থির ছিলাম।কখন দেখবো তাকে। সকল বিভ্রান্তি, অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সে এলো, সাদা সারি পরে। অমায়িক তার চেহারা। তবে সেদিন সে একা আসেনি। তার সাথে তার মা ছিলো। কিছু বলতে চেয়েও যেন বলতে পারছিলাম না। মৃদুস্বরে সে বললো, কেমন আছো? আমি বললাম জি ভালো,তুমি?সে বললো, হুম ভালো আছি! এই প্রথম সে আমাকে তুমি করে বললো। কিছুক্ষণের নিরবতা। এরপর একটা মোটা কাগজ আমাকে দিয়ে সে বললো,আর ৩ দিন পর আমার বিয়ে। তুমি আসলে আমি খুশি হবো। কথাটা আমার কাছে কেমন লাগলো সেটা বুজে উঠার আগেই কাগজটা আমার হাত থেকে পরে গেলো। নিজের অজান্তেই চোখের এক কোনায় পানি জমে গেলো। চিৎকার করার খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো কয়েক বছর ধরে ওর সাথে আমার ভালবাসার সম্পর্ক। অথচ সেদিনি ছিলো আমাদের প্রথম দেখা। আমি তাকে আনমনা হয়ে বললাম,এইসব কি?সে বললো,আমি নিরুপায়।আমি বললাম,আমি কি নিয়ে থাকবো?কোন উত্তর পেলাম না। শুধু শুনতে পেলাম ভালো থেকো। এরপর আর তাকে দেখতে পেলাম না।।অন্ধকারে আবার হারিয়ে গেলো।
..
সেদিনেই ছিলো তার সাথে আমার শেষ দেখা। তার দাওয়া কাগজটা নিয়ে বাসায় গেলাম। কেমন আছি এখন আমি জানিনা। কিন্তু এতটুকু জানি জীবনটা এখন খুবই বিরক্তিকর লাগছে আমার কাছে। এইভাবে কেটে গেলো ৪ বছর। এখন আমি চাকরি করি। যদিও বিয়ে করিনি। অবন্তীর সাথে এরপরে আর কোন যোগাযোগ হয়নি। আজ কেনো জানি খুব তার দেওয়া সেই দাওয়াতের কাগজটা পড়ার ইচ্ছে করছে। অনেক খুজে বার করলাম। এরপর খুলেই দেখি একটা সাদা কাগজে হাতে লিখা কিছু আছে।

সেখানে লিখা আছে,

[আমি জানিনা আমাদের সম্পর্কটাকে কি বলে?আমরা কেউ কাউকে চিনিনা,জানিনা,তারপরও মনের মাঝে একটা শব্দ খুব তাড়া করে,কখন তুমি আসবে আর আমি তোমার গানের সুরে হারিয়ে যাব। হয়তো এটাই ভালবাসা। কাল সন্ধ্যায় এখানেই থেকো আমি আসবো। দূরে কথাও চলে যাবো।যেখানে আমাদের আর কেউ আলাদা করতে পারবে না। মা আমার সাথে থাকার কারনে কথাগুলো মুখে বলতে পারলাম না। কাল এসো]

এটা পরে আমি কি করবো বুজতেছিলাম না।নিজেকে ভুল বুজবো? ভাগ্যের দোষ দিবো? নাকি অবন্তীকে ধোকা দিয়েছি এটা ভাববো??আমি আর থাকতে পারলাম না। চলে গেলাম অবন্তী দের বাসায়। তার মা আমাকে দেখেই বসতে দিলো। আমি কিছু না বলেই বললাম অবন্তী কথায়। তিনি কিছু না বলে বললো বাবা বসো আমি নাস্তা নিয়ে আসি।আমি আবার বললাম অবন্তী কথায়। একটা ছোট্ট মেয়ে আসে বললো, এইতো অবন্তী আমি এখানে। আমি চমকে গেলাম কিছু বুজলাম না।
..
এরপর অবন্তীর মা আমাকে ছাদে নিয়ে গেলো। আমি কিছু বলার আগেই তিনি শুরু করলেন অবন্তী মারা যাওয়ার ১ বছর হচ্ছে। আমি কিছু বললাম না। বিয়ে হওয়ার পর অবন্তীর পেটে যখন তার সন্তান, তখনই তার স্বামি তাকে তালাক দেয়। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে ও মারা যায়। তাই ওর নামে ওর মেয়ের নাম রাখছি অবন্তী। অবন্তী মারা যাওয়ার ঠিক কিছুদিন আগে আমি ওর রুম একটা ডায়রী পাই। সেখানে তোমাদের সব লিখা ছিলো। সেদিন সন্ধ্যায় অবন্তী গিয়েছিল তোমার জন্য। কিন্তু তুমি কেন আসনি সেটা আমিও জানিনা। এরপর আমি অবন্তীকে অনেক বার বলছি তোমার সাথে যোগাযোগ করতে কিন্তু সে করেনি। আমি আর কিছু বললাম না। শুধু এতটুকু বললাম আমাকে ওর কবরে একবার নিয়ে যাবেন। হুম সেদিন আমি অবন্তীর কবরে গিয়েছিলাম। জানিনা নিজে কে খুব পাপী মনে হচ্ছিলো কেন। সেদিনের পর থেকে ছোট্ট অবন্তী আমার কাছে থাকে। সে এখন বেশ বড় হয়েছে। এখন সেও অন্ধকারে গিয়ে বলে,এই যে বাবা আমি এখানে?

আমি জানিনা জীবনের কোন ভুলের জন্য আমি এই শাস্তি পেলাম। আর ছোট্ট অবন্তী হয়তো সেই কষ্ট সহ্য করার একমাত্র ঔষধ।

কিছু ভুল, ভুল করেও ভুলা যায়না।

২৬৭জন ১২৫জন
6 Shares

১৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য