অবনী

প্রিন্স মাহমুদ ৭ এপ্রিল ২০১৪, সোমবার, ১২:৫৪:২২পূর্বাহ্ন গল্প, সাহিত্য ৬ মন্তব্য

যখন কলেজে পড়তাম , কলেজ শেষে বিকেলে একটা দোকানে / ফুডশপে আড্ডা দিতাম । প্রতিদিন । বন্ধুদের নিয়ে । আমি সবসময় পা তুলে বসি । শার্টের হাতা তুলে দিয়ে গল্প বলতাম সবাইকে । তখন অনেক বেশী কথা বলতাম । এখন তাঁর পাচভাগের একভাগ বলি । একদিন বিকেলে দোকানের গ্লাস দিয়ে রাস্তায় দেখি এক বালিকা । ঘনকালো চুল , পাতলা ভ্রু , গোলাপি ঠোঁট । পাখির ঠোঁটের মতো । নাক চিকন । কাঁধে স্কুল ব্যাগ । হাতে পানির বোতল । বালিকার চেহারা হতাশ । স্কুল ছুটি দিয়েছে তাঁর । সাথে মা ও একটা লোক । বালিকাকে তাদের পাশে দিশেহারা দেখাচ্ছে । বালিকার বয়স আর কতো হবে ! ১২-১৩ ! ফাইভ সিক্সে পড়ে সম্ভবত ।
আমি তাঁর দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলাম । আমার কেন জানি মনে হল এই বালিকার মুখের কাছে চাঁদ-সূর্য সব ধুসর । বিকেল রোদ আমার কাছে জোছনা মনে হল । ঈশ্বরের অপার মহিমা বালিকার চোখে আমার চোখের দিকে পড়লো ।

বালিকা তাদের সঙ্গের লোকটাকে কি যেন বলল , সাথে সাথে লোকটা আমি যে দোকানে বসে আছি সেখানে ঢুকল । তাঁর মা সহ । মেয়েটি দোকানে ঢুঁকে আমার পাশের টেবিলে বসল । আড়ালে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । চোখের দৃষ্টি খুব ধার । কিছুক্ষন সে সাথে থাকা লোকটার কানে কানে কি যেন বলল । মানুষটা খুব গম্ভীর ভাবে আমার দিকে তাকাল এবং উঠে আমার টেবিলএর দিকে আসল । তারপর কেশে বলল – আমার ভাগনিটা আপনাদের সাথে বসতে চায় । কলেজের ছেলেমেয়েরা কীভাবে আড্ডা দেয় জানতে চায় । আপনাদের সাথে বসতে পারি ?

আমি বললাম বসেন মামা । বালিকা খুব লাজুক মুখ নিয়ে এসে আমার সামনের চেয়ারে বসল । আমার সাথে থাকা বন্ধুরা একবার আমার দিকে তাকায় , আরেকবার তারদিকে । এরপরের গল্পটা হল বালিকাকে মুগ্ধ করার জন্য কিছু না পেয়ে আমি একটার পর একটা জোকস বলা শুরু করলাম । সিক্সের একটা মেয়েকে নিশ্চয় আমার প্রিয় কবি শহীদ কাদরির কবিতা বললে বুঝবেনা । দেখি বালিকা একদমই হাসেনা । আমি শুধু হতাশ হতে লাগলাম । অবশেষে আমার একটা জোকস হিট করলো । তারপর আমি অদ্ভুত একটা জিনিস দেখলাম – এই বালিকার চোখের তারাও হাসে হাসার সময় ।

যাবার সময় বালিকার মামা আমাকে একটা কার্ড দিয়ে যায় তাঁর অফিসের । কার্ড দেবার সময় বলেছিলেন যদি কোনদিন দেখো খুব হেল্প দরকার , আমার কাছে চলে আসবে । কি আশ্চর্য ! কার্ডটা আমি পরের দিনই হারিয়ে ফেললাম ।

আমার কলেজ জীবন তখন শেষ । ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার সময় কলেজের সার্টিফিকেট তুলতে গেছি । আসার সময় দেখি সেই বালিকা । আমি ওকে খেয়াল
করিনি । ঐ আমাকে ডাক দিল ” ঐ অপরিচিত , ঐ অপরিচিত ” ।
কি হাস্যকর ডাক ! অন্যকেউ হলে নির্ঘাত হেসে দিতাম । বালিকার মা সিএনজী খুজছে । পাচ্ছেনা । আমি একটা ঠিক করে দিলাম । বালিকা সিএনজীতে উঠার
আগে আমাকে বলল ” একটা কথা বলব ? ” আমি বললাম – বল , সে বলল আমার পানি শেষ , একটা বোতল এনে দেন । রাস্তার পাশের দোকান থেকে একটা বোতল কিনে দিলাম , সেও আমার সাথে আসছে । তার মা গাড়ির ভেতর । ড্রাইভারের মুখে বিরক্ত কিন্তু সে কিছু বলছেনা । বালিকা বলল ,

” জানেন আমার যা মনে হয় তাই সত্যি হয় ”
আমি বললাম – আচ্ছা ।
আমি স্কুলের পেছনের রোড দিয়ে যাই , আজ আপনার সাথে দেখা হবে মনে হয়েছিল তাই এইআপনার কলেজের রোড দিয়ে যাচ্ছি ”

” একটা কথা বলি ? ”
হু
” আপনার সাথে আমার একদিন বিয়ে হবে ”

এটা বলেই বালিকা লাজুক মুখে সিএনজীতে উঠে গেলো । এরপর তাঁর সাথে আমার অনেকবার দেখা হয় । আমি কথা বলি । সে চুপ করে থাকে । এরপর দুজনেই চুপ করে থাকি । আমাদের দেখা মানে সামনা সামনি চুপ করে বসে থাকা ”
আমি কথা বলিনা এখন কম কথা বলি বলে । সে কথা বলেনা কারণটা জেনে বিরক্ত হয়েছি । সে নাকি আগামীদিনের জন্য জমিয়ে রাখছে ।

প্রায় রাতেই আমার ঘুম ভাঙ্গে । আমি দুসপ্ন দেখি । তখন একটা ডাক শুনি , এখনো ” ঐ অপরিচিত ! ঐ অপরিচিত ”

কেউ কি বলতে পারবেন ? এই বালিকাটা কে ? যাকে দেখলেই মনে হয় শার্টের হাতা গুটিয়ে পা তুলে গল্প বলি । আমাদের মাঝে একশো একটা জোনাকি ছেড়ে দিয়ে । তাঁর সাথে আমার অনেকদিন পর পর যোগাযোগ হয় । সেই করে । আমি তাঁর কোন কিছুই জানিনা । মোবাইল নাম্বার , কোন ক্লাসে পড়ে , কোন গ্রুপে পড়ে , ইদে কয়টা জামা কিনে , সময় কীভাবে কাঁটায় ” ।

গতঈদে খুব খারাপ অবস্থায় ছিলাম । বাসা থেকে শপিং এর টাকা পেয়েছিলাম । ধার শোধ করতেই সব শেষ । একটা লুঙ্গীও কিনতে পারিনি । একদিন সে বলল
আমার ঈদ উপহার কই ? আমি বললাম , কোরবানের ঈদে দেবো , কারণ ঐ ঈদে কেউ গিফট দেয় না । সে আমাকে একটা প্যাকেট দিল গিফট । বাসায় এসে খুলে দেখি সেখানে সাতহাজার টাকা । আমি তাঁকে পরের দিন ৫০ টাকা দিয়ে মধু গিফট করলাম । সে অবাক হয়ে বলল , এতো কিছু থাকতে মধু কেন ? আমি গম্ভীর হয়ে বললাম , তোমার জীবন যেন মধুময় হয় । এই জন্য ।

আমি আমার প্রায় লেখা ছিঁড়ে ফেলে দেই । বালিকা সেগুলো যত্ন করে তুলে রাখে । আমার ধারনা আমার প্রতিটি লাইন জঘন্য । তাঁর ধারণা আমাকে আমার প্রতিটি লাইনের জন্য সাহিত্যে নোবেল দেয়া উচিত ।

বালিকার নাম নাম – নাজিফাহ্‌ তাসনিম অবনী ।

দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে গেছে পাড়া
কেবল শুনি রাতের কড়া নাড়া
অবনী ! বাড়ি আছো কি ?
অবনী ! বাড়ি আছো কি ?

প্রিন্স মাহমুদ
৭/৪/২০১৪

 

কিছু লেখা কাউকে উৎসর্গ করতে মন চায় না , কাউকে পড়তে দিতেও মন চায় না । এটা সে ধরণের ।  অনেকদিন ব্লগে আসা হয়না বলেই আপনাদের জন্য দিলাম । আমার ক্ষুদ্রতা ক্ষমা করবেন । ভালো থাকবেন । শুভেচ্ছা ।

 

সৃষ্টিকর্মের পুরুস্কারে জোর আবেদন নয়

স্রষ্টার আশীর্বাদে সৃষ্টি যেন হয়

২০৯জন ২০৯জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য