অপেক্ষা

ইকু ১২ মার্চ ২০১৪, বুধবার, ১১:৫৮:৪২পূর্বাহ্ন গল্প ১৬ মন্তব্য

সৈকত বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ করছে মেয়ে টা ভার্সিটির গেটের বাইরে দাড়িয়ে থাকে। সে কারো জন্য অপেক্ষা করছে? কাউকে খুজছে? এমন হাজারো প্রশ্ন আসে সৈকতের মনে। সাধারণত এত কৌতূহল তার নেই কিন্তু আজ কেন জানি মন বলছে মেয়েটা কোন সমস্যায় আছে এবং ওকে সাহায্য করা উচিৎ। সৈকত এগিয়ে যায়_
-এস্কিউজ মি! আপনি কি কাউকে খুঁজছেন? কিছু মনে করবেন না, বেশ কিছুদিন ধরে দেখছি একে তাকে কি কি যেন প্রশ্ন করছেন। তাই আজ আর কৌতূহল চাপাতে পারলাম না ।
-জী আমি আসলে একজনের খোঁজে এসেছি। মেয়ে টা মাথা নাড়ায়।
-এই ভার্সিটির কেউ? আমাকে বলুন আমি মোটামুটি সবাইকেই চিনি।
– আসলে আমি তার নাম জানিনা, শুধু বাবার নাম জানি আর জন্ম তারিখ জানি। ভার্সিটির রেজিস্টার এ অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু তাঁরা কোন তথ্য দিতে চাচ্ছেনা। আপনি কি আমাকে এই ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবেন?
– এই রকম উদ্ভট একটা কথা শুনে সৈকত মনে মনে কিছু টা অবাক হয়, কি কাণ্ড ! সাহায্য করতে চেয়ে পাগলের পাল্লায় পড়লাম নাকি? কি বলবে মেয়ে টাকে বুঝতে পারেনা।
– মেয়েটা বুঝতে পেরে বলল আপনি হয়ত ভাবছেন আমার মাথায় সমস্যা আছে?
– না না … সৈকত তাড়াতাড়ি বলে উঠে। আপনার নিশ্চয়ই কোন সমস্যা নাহলে তো এভাবে কাউকে খুজার কথা না । আপনি এক কাজ করুন আপনি বাবার নাম আর জন্ম তারিখ আমাকে দেন আর কালকে একবার আসুন এদিকে এই একই সময়ে। আমি দেখি কি করতে পারি।

নাম আর জন্ম তারিখ নিয়ে সৈকত সোজা চলে যায় ক্যান্টিনে। রেজিস্টার এর জাকির ভাই কে দেখে এসেছে সে একটু আগে, কেউ যদি এই ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে তাহলে সেটা জাকির ভাই ই পারবে।
-কি সৈকত! তোর না টিউশনি আছে, মাত্র চলে গেলি, আবার এখানে কি?
সৈকত কে দেখে জাকির ভাই জিজ্ঞেস করে।
এর পর জাকির ভাই কে পুরো ঘটনা খুলে বলে সৈকত। ঘটনা শুনে জাকির ভাই বল্লেন হুম এমন একটা মেয়ে এসেছিলো তো । ভার্সিটির স্টুডেন্ট এর ইনফো অচেনা একজন কে কিভাবে দেই বল?
-আরে জাকির ভাই, একটু ব্যাপার টা দেখেন না। মেয়ে টা কে তো ভালো বলেই মনে হল। তাছাড়া মেয়ে টা কোন বড় সমস্যায় পড়েছে বলেই তো মনে হচ্ছে।
-হুম! আচ্ছা ঠিক আছে। আমি বিকেলে খোঁজ নিয়ে তোকে ফোন দিবনে। এখন যা টিউশনি তে যা।

বিকেলের পর পর জাকির ভাই এর ফোন আসে-
ঐ সৈকত ! গত মাসে আমাদের ভার্সিটির ফার্মাসি ডিপার্টমেন্ট এর একটা ছেলে বাইক এক্সিডেন্ট এ মারা গেল না?
-কে এনামুলের কথা বলছেন জাকির ভাই?
-আরে হ্যাঁ! মেয়ে টা তো এই এনামুল কেই খুজছে রে। তুই কাল মেয়ে টাকে জানায়ে দিস। আমি এখন রাখি হাতে অনেক কাজ জমে আছে, ভালো থাকিস।

পরদিন ক্লাস শেষে সৈকত মেয়ে টাকে ঠিক আগের যায়গায় পায়। শুনুন আমি এই ছেলের খোঁজ পেয়েছি। কিন্তু তার আগে আপনি এই ছেলে কে কেন খুঁজছেন জানতে পারি? সৈকত জিজ্ঞেস করে।
ভাইয়া… আপনি যদি আমাকে একটু সময় দেন তাহলে আমি সবকিছু বলতে পারি আপনাকে।
-হুম চলুন না ক্যান্টিনে বসে চা খেতে খেতে শুনি আপনার কথা।

চায়ে চুমুক দিতে দিতে মেয়েটি বলে_ আমি যার খোঁজ নিতে এসেছি। সে আসলে আমার ভাই হয় কিন্তু আজ পর্যন্ত আমি তাকে কখনো দেখিনি। আমার মা এর প্রথম সন্তান, যদিও আমাদের বাবা আলাদা। আমার এই ভাই এর বাবার সাথে মা এর ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর মা কানাডায় চলে যায়। তার হাসবেন্ড অনেক প্রতাপশালী হওয়ার জন্য মা তার ছেলে কে রেখে চলে যেতে হয়, সে অন্য ঘটনা। মা পরবর্তী তে ছেলের সাথে যোগাযোগ রাখতে চাইলেও তার এক্স হাসবেন্ড এর জন্য রাখতে পারেননি। শুধু কিছুদিন আগে অনেক খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছিলেন যে তার ছেলে এই ভার্সিটি তে পড়ে। আমার মা দুরারোগ্য ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত, ডাক্তার দের ধারনা মা আর বেশীদিন বাচবেন না। মৃত্যুর আগে তার শেষ ইচ্ছা তার ছেলে কে শেষ বারের মত একবার দেখবে। আর সেই ইচ্ছা পূরণ করতেই আমার বাংলাদেশে আসা। জানেন ভাইয়া আমি প্রতিদিন ভার্সিটির সামনে দাড়িয়ে আমার এই ভাই কে খুঁজি, সবাই কে জিজ্ঞেস করি। কেউ আমাকে সাহায্য করতে চায়নি। আপনি ই একমাত্র এগিয়ে এসেছেন, আপনাকে যে কি বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব তার ভাষা আমার জানা নেই।
সৈকত কি বলবে ভেবে পায়না, কি করে এই সে এই মেয়ে কে তার ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ দিবে? আচ্ছা শুনুন অবশেষে সৈকত বলে,
আমি কাগজে সব কিছু লিখে দিচ্ছি। আমি চলে যাওয়ার পর আপনি কাগজ টি পরবেন। এ কথা বলে সৈকত একটি কাগজে লিখে মেয়ে তার হাতে দিয়ে উঠে যায়।
সৈকত হাটতে থাকে সামনের দিকে। পিছন ফিরে তাকালে হয়ত দেখত মেয়ে টা কাগজ খুলে হাতে নিয়ে অঝোর ধারায় কাঁদছে। কিন্তু সৈকত আর তাকায় না , সে হাটতেই থাকে, শান্তনা দেওয়ার ভাষা তার জানা নেই।

২০১জন ২০১জন
0 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য